পাকিস্তান-ইংল্যান্ড: ঘটনা, দুর্ঘটনা আর গৌরবের গল্প

বিজ্ঞাপন
default-image

ইংল্যান্ড-পাকিস্তান টেস্ট সিরিজ মানেই বাড়তি উত্তেজনা। বাড়তি রোমাঞ্চ। বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ, স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়ে পড়া, আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে মাঠ ত্যাগ—কত ঘটনাই না ঘটেছে ক্রিকেটের ধ্রুপদি সংস্করণে এ দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে। ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে আজ শুরু হচ্ছে আরও একটি ইংল্যান্ড-পাকিস্তান টেস্ট সিরিজ। করোনাভাইরাসের প্রেক্ষাপটে এবারের সিরিজটি কিছুটা ভিন্ন হলেও রোমাঞ্চের অপেক্ষাতেই আছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের মাটিতে টানা তিনটি সিরিজ জেতা পাকিস্তান গত ২৪ বছরে কখনোই অতীত সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করতে পারেনি। সময়ের স্রোতে দুই দলের মানে পার্থক্য দেখা দিয়েছে। ইংল্যান্ড এ সিরিজটা খেলতে নামছে পরিষ্কার ফেবারিট হয়েই, তারপরেও পাকিস্তান লড়াইটা ভালো করুক—ক্রিকেটপ্রেমীরা চাইবেন এটিই। সিরিজ শুরুর আগে এ দুই দলের টেস্ট লড়াইয়ের কিছু ঘটনার দিকে চোখ ফেরানো যাক, যেগুলো চির দিনের আলোচনা আর আড্ডার খোরাক হয়ে আছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে…

দীর্ঘস্থায়ী এক রেকর্ড
১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের ইংল্যান্ড সফর তুলনামূলক ঘটনাবিহীনই ছিল। তিন টেস্টের সিরিজটা ইংলিশরা জিতে নেয় ২-০ ব্যবধানে। দুটি জয়ই ছিল প্রায় একতরফা। তবে ওভালে তৃতীয় টেস্টটিতে ইংল্যান্ড ৮ উইকেটে জিতলেও পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংসে দলের বিপর্যয়ের মধ্যে আসিফ ইকবাল আর ইন্তিখাব আলমের মধ্যে গড়ে ওঠে ১৯০ রানের জুটি। নবম উইকেটে এ জুটিটি রেকর্ড হয়ে ছিল দীর্ঘ ৩০ বছর। আসিফ ইকবাল খেলেন ১৪৬ রানের দারুণ একটা ইনিংস। ইন্তিখাব করেন ৫১। ১৯৯৮ সালে এ জুটির রেকর্ড পাকিস্তানের বিপক্ষেই জোহানেসবার্গে ভেঙে দেন দক্ষিণ আফ্রিকার মার্ক বাউচার ও প্যাট সিমকক্স। বাউচার-সিমকক্স জুটি গিয়েছিলেন ১৯৫ পর্যন্ত।

default-image

ইংল্যান্ডের মাটিতে পাকিস্তানের প্রথম ও ফজল মাহমুদ
১৯৫৪ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলে পাকিস্তান। লর্ডসে অনুষ্ঠিত সে টেস্ট ম্যাচটি ছিল বৃষ্টি-বিঘ্নিত। প্রথম তিন দিন কোনো খেলাই হয়নি। টেস্টটির শুরুর তারিখ ছিল ১০ জুন। সে সময়ের নিয়মানুযায়ী ১৩ জুন ছিল বিশ্রামের দিন। কাগজে-কলমে চতুর্থ দিন বিকেলে বৃষ্টি কমলে টস করতে নেমেছিলেন ইংলিশ অধিনায়ক ও পাকিস্তানি অধিনায়ক আবদুল হাফিজ কারদার। প্রথমে ব্যাটিং করে সে বিকেলে ৩ উইকেটে ৫০ রান তুলেছিল পাকিস্তান। পরদিন বাকি ৭ উইকেট তুলে নিতে ইংল্যান্ডের লেগেছিল সর্বোচ্চ ৮০ মিনিট। এ ম্যাচে ওয়াকার হাসানের ৫৩ রানই ছিল পাকিস্তানের প্রাপ্তি। 

default-image

সে সিরিজের চতুর্থ টেস্টেই ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট জিতে হইচই ফেলে দেয় পাকিস্তান। ১২ উইকেট নিয়ে ফাস্ট বোলার ফজল মাহমুদ পরিণত হন জাতীয় বীরে। লো-স্কোরিং সে ম্যাচে প্রথমে ব্যাটিং করে পাকিস্তান গুটিয়ে যায় ১৩৩ রানে। জবাবে ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ১৩০ রানে। প্রথম ইনিংসে ৩ রানের লিড নিয়ে পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে অলআউট হয়ে যায় ১৬৪ রানে। জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের দরকার ছিল ১৬৮ রান। কিন্তু ফজল মাহমুদ ৪৬ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ১৪৩ রানেই শেষ করে দেন ইংল্যান্ডকে।

দুর্দান্ত ইয়ান বোথাম
১৯৭৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে লর্ডস টেস্টটি ইয়ান বোথামের টেস্ট হিসেবেই পরিচিত হয়ে আছে ক্রিকেট ইতিহাসে। ব্যাট হাতে দলের বিপর্যয়ের মধ্যে বোথামের দ্রুতগতির ১০৮ রানের ইনিংসটি ছিল দুর্দান্ত। বল হাতেও বোথাম তাঁর ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করেন এ টেস্টে - ৩৪ রানে নেন ৮ উইকেট। এ বোথামের হাতেই সে টেস্টে বিধ্বস্ত হয়েছিল ওয়াসিম বারির পাকিস্তান দল। 

default-image

মুশতাক আহমেদের ম্যারাথন স্পেল
১৯৯৬ সালে মুশতাক আহমেদের এক ম্যারাথন স্পেলে একটি টেস্টে জয় নিশ্চিত হয়েছিল পাকিস্তানের। ওভালের তৃতীয় টেস্টে পঞ্চম দিনের দশম ওভার থেকে একেবারে ম্যাচের শেষ পর্যন্ত এক প্রান্ত থেকে টানা ৩৭ ওভার বোলিং করেছিলেন মুশতাক। তাঁর লেগ স্পিনে ইংল্যান্ডের ব্যাটিং হয়ে পড়েছিল ছন্নছাড়া। সে দিন ইংল্যান্ড তাদের শেষ ৮ উইকেট হারিয়েছিল মাত্র ৭৬ রানে (২৭ ওভারে)। ৩৭ ওভার বোলিং করে ৭৮ রান দিয়ে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। 

default-image

স্বপ্নের মতো অভিষেক
১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ জেতার পর ইংল্যান্ড সফর করেছিল পাকিস্তান। সে সিরিজে হেডিংলিতে ইংল্যান্ড দলে ডাক পেয়েছিলেন সমারসেটের মিডিয়াম পেসার নিল ম্যালেন্ডার। কিন্তু এই মিডিয়াম পেসারই যে ঝড় তুলে ফেলবেন, সেটি কে ভেবেছিল। সে টেস্টে ম্যালেন্ডার ৫০ রানে ৫ উইকেট নেন। সেটি ছিল তার আগের ৯ বছরে ইংল্যান্ডের হয়ে সেরা অভিষেক। ম্যালেন্ডারকে অবশ্য ইংলিশ নির্বাচকেরা 'দলের প্রয়োজনে' ডেকে আবার ছুড়েও ফেলে দেন দ্রুত। এরপর আর মাত্র একটি টেস্ট খেলারই সুযোগ হয়েছিল তাঁর। 

default-image

বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ ও ইংল্যান্ডকে জয়ী ঘোষণা
২০০৬ সালে ইনজামাম-উল-হকের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড সফর করে পাকিস্তান। ওভাল টেস্টে এক ঘটনায় দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্কে ফাটল ধরে। ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দল মাঠে না আসায় জয়ী ঘোষণা করা হয় অন্য দলকে।

ওভাল টেস্টের চতুর্থ দিনে পাকিস্তান দলের বিপক্ষে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ আনেন দুই আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ার ও বিলি ডকট্রভ। সে কারণে পাকিস্তানের ৫ রান কেটে নেওয়া হয়। দেওয়া হয় নতুন বল। কিন্তু নতুন বলে খেলা শুরু হওয়া নিয়ে অসন্তোষ ছিল পাকিস্তান দলে। চা বিরতির পর খেলা শুরু হওয়ার সময়ই ঘটে বিপত্তিটা। বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগটিকে 'অপমান' হিসেবে ধরে নিয়ে পাকিস্তান দল আর মাঠে ফেরেনি। দুই ইংলিশ ব্যাটসম্যান মাঠে গিয়েছিলেন। অপেক্ষায় ছিলেন আম্পায়াররাও। কিন্তু পাকিস্তান দল ড্রেসিং রুমের দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। ইংলিশ ক্রিকেট বোর্ডের তরফ থেকে দেন দরবার হলেও তারা আর মাঠে ফেরেনি। এরপরপরই ক্রিকেটের আইন অনুযায়ী টেস্টটিতে জয়ী ঘোষণা করা হয় ইংল্যান্ডকে। 

default-image

স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারি
২০১০ সালে স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে কেঁপে ওঠে ক্রিকেট বিশ্ব। সেবার লর্ডস টেস্টটিকে মানুষ সারা জীবন মনে রাখবে, তবে অবশ্যই ক্রিকেটের জন্য নয়, স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য। জুয়াড়িদের কাছ থেকে টাকা খেয়ে পাকিস্তানের দুই পেসার মোহাম্মদ আমির ও মোহাম্মদ আসিফ ইচ্ছা করে নো বল করছিলেন সে ম্যাচে। নেপথ্যে ছিলেন অধিনায়ক সালমান বাট। এ ঘটনা প্রকাশ করে দেয় নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড নামের একটি ইংলিশ পত্রিকা। অনেকেই ঘটনাটিকে ক্রিকেট ইতিহাসের কালো দিন বলে থাকেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সালমান বাট, আমির ও আসিফকে নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি তাঁদের কারাভোগও করতে হয়। 

default-image

রিভার্স সুইং না বল টেম্পারিং
১৯৯২ সালে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের ইংল্যান্ড সফরে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ তোলে ইংলিশ মিডিয়া। অভিযুক্তরা ছিলেন ওয়াসিম আকরাম ও ওয়াকার ইউনিস। এ দুজন সে সফরে যেভাবে পুরোনো বলে রিভার্স সুইং করাচ্ছিলেন, তার কোনো উত্তর ছিল না ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের কাছে। ইংলিশ মিডিয়া অভিযোগ তোলে কোমল পানীয়ের বোতলের অ্যালুমিনিয়াম ক্যাপ ব্যবহার করে ওয়াসিম-ওয়াকার বলের এক পাশ অমসৃণ করে রিভার্স সুইং করাচ্ছিলেন। অবশ্য এ অভিযোগের কোনো সত্যতা কখনোই পাওয়া যায়নি। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবেননি ম্যাচ রেফারি। 

default-image
বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন