একটা আন্তর্জাতিক সিরিজের আগে এমন পরিবারকেন্দ্রিক আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু আলোচনাটা প্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে ওই ছবিটার কারণেই, যেখানে তামিম বসে সাংবাদিকদের সিরিজ–পূর্ব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। পাশে দলের ম্যানেজারের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে বড় ভাই নাফিস।

গত নিউজিল্যান্ড সফর থেকেই জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার নাফিস নতুন ভূমিকায় বাংলাদেশ দলের সঙ্গে আছেন। কিন্তু তামিম দলের সঙ্গে নেই গত বছরের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত জিম্বাবুয়ে সফরের ওয়ানডে সিরিজের পর থেকে। জাতীয় দলে দুই ভাইকে দুই ভূমিকায় পাশাপাশি দেখাটা তাই কালই প্রথম। পুনর্মিলনীর ব্যাপারটা এসে যাচ্ছে এখানেই। সেটি নাফিস-তামিমের যেমন, তেমনি এই সিরিজে পুনর্মিলনী আছে আরও অনেক রূপেই।

default-image

করোনা নেগেটিভ না হলেও ১০ দিনের ঝুঁকিপূর্ণ সময় পার করে ফেলায় কাল দলের সঙ্গে অনুশীলনে যোগ দিয়েছেন জেমি সিডন্স। জাতীয় দলের সাবেক প্রধান কোচের ব্যাটিং কোচ হয়ে ফেরাটাও পুনর্মিলনের আবহসংগীতই বাজাল।

সিডন্স সেই আগের মতোই আছেন—চটপটে, চঞ্চল। এই ড্রেসিংরুমের সামনের নেটে মুশফিক-মাহমুদউল্লাহর ব্যাটিং দেখছেন তো একটু পরই থ্রোয়ার নিয়ে দ্রুত পায়ে চলে যাচ্ছেন মাঠের অন্য প্রান্তে নাজমুল হোসেনের নেটের দিকে।

সকালে ব্যাটিং অনুশীলনের পর সাকিব আল হাসানের বেশির ভাগ সময় কাটল সিডন্সের সঙ্গে। দূর থেকে দেখা দুজনের হাত নাড়ানাড়ি আর ‘শ্যাডো’র অনুমিত অনুবাদে মনে হলো সাকিব-সিডন্স আলোচনার বিষয়বস্তুতে ব্যাটিং যেমন ছিল, থাকতে পারে বাঁহাতি স্পিনের কলাকৌশলও। স্পিন বোলিং কোচ রঙ্গনা হেরাথ মাঝেমধ্যেই নেট ছেড়ে দুই পা সরে এসে আলোচনায় যোগ দেওয়ায় অনুমানটা জোর পাচ্ছিল আরও।

চোটে পড়ে তামিম যে সেই জিম্বাবুয়ে সফরের ওয়ানডে সিরিজের পর খেলা থেকে লম্বা সময়ের জন্য সরে গেলেন, তখন থেকেই বাংলাদেশের ক্রিকেট ছিল আরেকটা পুনর্মিলনীর অপেক্ষায়। দলের সব অভিজ্ঞকে একসঙ্গে পাওয়ার অপেক্ষা।

সিডন্সের উপস্থিতি দলে ডমিঙ্গোর গুরুত্বই–বা কতটা অটুট রাখছে? এই যে সবার আবার একই ছাদের নিচে ফেরা, সেখানে পুনর্মিলনের ঐকতান আসলেই থাকবে তো?

জিম্বাবুয়ে সফরেই মাহমুদউল্লাহ টেস্ট ছাড়ার ঘোষণা দিলেন। ওই সফরে তামিমের মতো মুশফিকও খেলেননি টি-টোয়েন্টিতে। এরপর নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোম সিরিজ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, পাকিস্তানের বিপক্ষে হোম সিরিজ এবং সর্বশেষ নিউজিল্যান্ড সফর পর্যন্ত কোনো না কোনো কারণে সব অভিজ্ঞকে একসঙ্গে পায়নি বাংলাদেশ।

default-image

টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ আর টেস্ট অধিনায়ক মুমিনুল হকের চেয়ে নিজেকে তাই ভাগ্যবান ভাবতেই পারেন তামিম। সাত মাসের বিরতির পর বাংলাদেশ আজ যে উপলক্ষে ওয়ানডেতে ফিরছে, তামিম যে উপলক্ষে নেতৃত্বে ফিরছেন; ঠিক সেই উপলক্ষেই বাংলাদেশ ফিরে পাচ্ছে পূর্ণ শক্তি।

এই পুনর্মিলনীর আনন্দটা তামিমও গোপন রাখতে পারেননি, ‘এটা সৌভাগ্য যে এই সিরিজে পুরো দল পাব। অধিনায়ক হিসেবে এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না।’

বাকি রইল সেই বিভাজনরেখা, যেটিকে চাইলে কেউ অনাহূত কল্পনা বলেও উড়িয়ে দিতে পারেন এবং সে রকম হলেই বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য মঙ্গল। গত বছরের জিম্বাবুয়ে সফর থেকে কিছু গুঞ্জন-ফিসফাস মাঝেমধ্যেই দেশের ক্রিকেট–আবহে অস্বস্তি ছড়িয়েছে। দলের ভেন্টিলেটরে কান পাতলে শোনা গেছে অভিজ্ঞদের ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বের কথা, বাতাসে তরঙ্গায়িত হয়েছে প্রধান কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর সঙ্গে বড় কারও সম্পর্কের অবনতির প্রচার।

default-image

এসব নেতিবাচক আলোচনার মোড়ে মোড়ে যে চরিত্রগুলো দাঁড়িয়ে ছিল, আজ থেকে শুরু আফগানিস্তান সিরিজে সেসব চরিত্রই আবার ফিরে এসেছে একই ছাদের নিচে।

সে কারণেই কৌতূহলী মন চাইলে কালকের অনুশীলনপর্ব থেকে কিছু ছবি আলাদা করে নিতে পারে। কই, নেটের পাশে মাহমুদউল্লাহ-সাকিবের অন্তরঙ্গ আড্ডা তো টেনে আনল না অনতিদূরেই বিক্ষিপ্ত পায়চারি করতে থাকা তামিমকে! সিডন্সের উপস্থিতি দলে ডমিঙ্গোর গুরুত্বই–বা কতটা অটুট রাখছে? এই যে সবার আবার একই ছাদের নিচে ফেরা, সেখানে পুনর্মিলনের ঐকতান আসলেই থাকবে তো?

অনুসন্ধিৎসু মনের কৌতূহল দূর করতে অধিনায়ক হিসেবে যা করার, তা অবশ্য করেছেন তামিম। দুটি বাক্যে বুঝিয়ে দিয়েছেন, সবার ওপরে দল, ‘যারা এই সেটআপে আছে, তারা মিলেই বাংলাদেশ দল।’ ডমিঙ্গো-সিডন্সের মিথস্ক্রিয়া থেকে শুরু করে কথাটা সত্যি হলে ভালো দলের অন্য মেরু অঞ্চলগুলোর জন্যও। পুনর্মিলনের সিরিজ ঢেকে দিক সব বিভাজনরেখা।

অথবা প্রমাণ করুক—বিভেদরেখা বলে আসলে কিছু নেই-ই।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন