ক্রাইস্টচার্চে প্রথম টেস্টটা দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য ছিল এক কথায় দুঃস্বপ্ন।
প্রথম ইনিংসে ৯৫ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে আবার ১১১ রানে গুটিয়ে ইনিংস ব্যবধানে হারতে হয়েছিল।
আজ একই ভ্যেনুতে দ্বিতীয় টেস্টটা অন্যরকম এক প্রত্যয় নিয়েই শুরু করেছে প্রোটিয়ারা। টসে জিতে ব্যাটিং নিয়ে প্রথম দিনটা শেষ করেছে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই। স্কোরবোর্ডে তাদের সংগ্রহ ২৩৮, ৩ উইকেট হারিয়ে। নিঃসন্দেহে এটি তাদের ঘুরে দাঁড়ানোই।
টসে জিতে অধিনায়ক ডিন এলগার প্রথমে ব্যাটিং নিয়ে সবাইকে কিছুটা চমকে দিয়েছিলেন। হ্যাগলি ওভালে প্রথম টেস্টের যে শিক্ষা, তাতে টসে জিতে কীভাবে ব্যাটিং নেন তিনি। কিন্তু দেখা গেল এই টেস্টের উইকেট প্রথম টেস্টের মতো অতটা কঠিন নয়। হ্যাঁ, বল এদিক–ওদিক করছিল কিছুটা, সুইংও পাচ্ছিলেন নিউজিল্যান্ডের বোলাররা। কিন্তু দুই প্রোটিয়া উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান সারেল এরউই ও ডিন এলগার দেখে–শুনেই খেললেন। নিজেদের সামর্থ্যের প্রয়োগটা ঘটালেন। উদ্বোধনী জুটিতেই এল শতরান। শতক পেয়েছেন এরউই। এটি তাঁর প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। ২৯৩ মিনিট ব্যাটিং করে ২২১ বলে ১০৮ করেছেন, বাউন্ডারি মেরেছেন ১৪টি। এলগার ৪১ রান করেছেন ১০১ বল খেলে। ১১১ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙেন টিম সাউদি, এলগারকে বোল্ড করে।
আজ এরউই খেলেছেন তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট। এলগারের সঙ্গে তাঁর ১১১ রানের উদ্বোধনী জুটিটি ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসের পর টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার সেরা উদ্বোধনী জুটি। দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক এলগারও আজকে একটা অন্যরকম ঘটনারই জন্ম দিয়েছেন। হ্যাগলি ওভালে টস জিতে তাঁর আগে ব্যাটিংয়ে নামার ‘সাহস’ আর কোনো অধিনায়কেরই হয়নি। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিত সবশেষ ৪৫ টেস্টে টসে জিতে ব্যাটিং নেওয়ার চতুর্থ ঘটনা এটি। এলগারের সাহসী এ সিদ্ধান্তটা শেষ পর্যন্ত সফল।
নিউজিল্যান্ডের দুর্ধর্ষ ফাস্ট বোলিং আক্রমণ আজ ছিল কিছুটা নখদন্তহীন। উইকেটে সিম মুভমেন্ট প্রথম টেস্টের মতো ছিল না। আজ কিউই বোলাররা দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে বড় হুমকিও হয়ে উঠতে পারেননি সেভাবে। প্রোটিয়ারাও ছিল সতর্ক। গোটা দিনে সে কারণেই রান রেটটা তিন–এর আশেপাশেই ঘোরাফেরা করেছে। পুরো দিনে ৯০ ওভার খেলার মধ্যে ৩১ ওভার থেকেই কোনো রান করেননি দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটসম্যানরা। তবে সাউদি কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়েছেন। ডিন এলগারের বিপক্ষেই বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেছিলেন তিনি। বল এলগারের ব্যাটের কানায় বাতাস লাগিয়ে বিপদ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। দিনের চতুর্থ ওভারে তো ব্যাটে বল লেগে সেটি স্লিপেও গেল। কিন্তু সেটি ফিল্ডারের হাত অবধি যায়নি। এরপর ড্যারিল মিচেলও দুই–একটি সুযোগ তৈরি করেছিলেন।
এরউই নিজের ইনিংসটি শুরু করেছিলেন আরও ধীরলয়ে। নিজের খেলা প্রথম ২৫ বলে তিনি রান করেছিলেন মাত্র ৫। এ সময় তিনি সাউদির ইয়র্কারে বোল্ড হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যান। কাইল জেমিসনকে স্কয়ার লেগের ওপর দিয়ে মেরে তিনি আত্মবিশ্বাস পেয়ে পান। এরপর প্রচুর ড্রাইভ খেলেছেন তিনি। কলিন ডি গ্র্যান্ডহোমকে পয়েন্টের ওপর দিয়ে মেরে তিনি নিজের পঞ্চাশ পূরণ করেন। সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহ ছিল ৮০। হ্যাগলি ওভালে সবশেষ ১১ টেস্টে আজকের দিন নিয়ে কেবল দুইবারই আগে ব্যাটিং করা দল কোনো উইকেট না হারিয়ে মধ্যাহ্ন বিরতিতে যেতে পেরেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী জুটি শতরান পূরণ করার মধ্য দিয়ে স্পর্শ করেছে ১৭ বছরের পুরোনো এক রেকর্ড। এর আগে ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি ওভালে সবশেষ কোনো সফরকারী দলের উদ্বোধনী জুটিতে শতরান এসেছিল ২০০৪ সালে, সেটিও দক্ষিণ আফ্রিকারই। হার্শেল গিবস ও গ্রায়েম স্মিথের সেই জুটির রেকর্ডের পাশে আজ বসলেন এরউই আর এলগার।২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অ্যাডিলেড টেস্টের পর বিদেশের মাটিতে কোনো টেস্টে এটি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম শতরানের উদ্বোধনী জুটি।
এলগার ৪২ রানে ফেরার পর উইকেটে এসেছিলেন এইডেন মার্করাম। তিনিও ৪২ রান করেন। এউইর সঙ্গে বাঁধেন ৮৮ রানের একটা জুটি। প্রথম ১০ রান করেছিলেন ৪৭ বল খেলে। ৬ রানে থাকার সময় তিনি একটা সুযোগ দিয়েছিলেন। নিল ওয়াগনরের বলে স্লিপে ক্যাচ তুলেছিলেন। কিন্তু এটিও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা ড্যারিল মিচেল অবধি যায়নি। শতরান করা এরউইকে দারুণ সহায়তা দিয়েছেন তিনি। তবে এরউই ৬৮ রানের সময় ফিরতে পারতেন। ম্যাট হেনরির বলে আবারও বল স্লিপে গিয়েছিল। কিন্তু ফিল্ডারের হাতে যায়নি। ১৬০ বল খেলে নব্বইয়ের ঘরে প্রবেশ করেন এরউই। কিন্তু তিন অঙ্ক পেরোতে খেলেন আরও ২৮ বল। ওয়াগনরকে স্কয়ার লেগে পুল করে তিনি নিজের শতক পূরণ করেন। সেটি ছিল চা বিরতির তিন বল আগে। এরউইকে শেষ পর্যন্ত ফেরাতে পেরেছেন ম্যাট হেনরি। তাঁর বলে উইকেটের পেছনে টম বান্ডেলকে ক্যাচ দেন। মার্করাম ফেরেন ওয়াগনরের বলে, মিচেলের হাতে ক্যাচ হয়ে।
দিনের শেষভাগটা টুকটাক করে কাটিয়ে দেন রাসি ফন ডার ডুসেন ও টেম্বা বাভুমা। পুসেন ৬১ বলে ১৩ আর বাভুমা ৫৮ করে ২২ রান করে অপরাজিত আছেন দিন শেষে।
আজ দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রহটা প্রথম টেস্টের সঙ্গে তুলনায় যথেষ্ট ভালো। কিন্তু মাত্র ৩ উইকেট হারানোর পরেও স্কোরবোর্ড ২৩৮ রান একটু কমই বোধহয়। তবে তারা স্বস্তি পেতে পারে এই ভেবে যে প্রথম টেস্টের মতো এই টেস্টে প্রথম দিন কোনো বিপর্যয় হয়নি। কাল দ্বিতীয় দিন ডুসেন ও বাভুমার ওপর নির্ভর করছে দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক কিছুই।