default-image

দূর থেকে হেলমেট মাথায় ডেভিড ওয়ার্নার আর অ্যারন ফিঞ্চকে অনেকটা একই রকম দেখায়। ব্যাটিংয়েও মিল আছে, কথাবার্তায়ও একই রকম ডাকাবুকো। ইংল্যান্ডকে উড়িয়ে দিয়ে অস্ট্রেলিয়া কি বিশ্বকাপে একটা বার্তা ছড়িয়ে দিল? প্রশ্নটাকে ফ্রন্টফুটে হুক করে ছক্কা মারার মতো তাচ্ছিল্যভরে উড়িয়ে দিলেন, ‘নতুন আর কী বার্তা দেওয়ার আছে? আমরা বিশ্বকাপ জিততে চাই, এটা তো গোপন কিছু নয়। দু-তিন মাস ধরেই ভালো খেলছি। এখন মনে হচ্ছে, ঠিক সময়েই “পিক”-এ উঠছি।’
সংবাদ সম্মেলনে শরীরী ভাষার মতো প্রতিটি কথাতেও আত্মবিশ্বাসের বিচ্ছুরণ দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, ভাগ্য একটু এদিক-ওদিক হলেই কেমন সব বদলে যায়! ওকস ক্যাচ না ফেললে তো ডাব্বা মারতেন, সেখানে বিশ্বকাপ অভিষেকেই সেঞ্চুরি! এই প্রসঙ্গেও একই রকম দাপুটে জবাব, ‘এ সব খেলারই অংশ। তা কাজে লাগাতে পারাটাই হলো আসল কথা।’
তা কাজে লাগিয়ে সেঞ্চুরি করেছেন। ২৩ বছর আগে ডেভিড বুনের পর প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ সেঞ্চুরি। আনন্দটা আরও বেড়ে যাচ্ছে এটি তাঁর ঘরের মাঠে বলে, ‘বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ, গ্যালারিতে পরিবার ও বন্ধুবান্ধব...সেটিও কি না হোমগ্রাউন্ড আর “হোম অব ক্রিকেটে”—এই আনন্দের কোনো তুলনা হয় না।’
ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে জর্জ বেইলি বারবার অস্ট্রেলিয়ার দলীয় চেতনার জয়গান গাইছিলেন। ফিঞ্চের কথায়ও ফিরে ফিরে এল এটি। অস্ট্রেলিয়ার এই দলে তারকারাজির সমাহার, ফিঞ্চ বড় বলে দেখালেন তাঁদের পারস্পরিক আস্থাকে, ‘যখন আপনি জানবেন যে, আপনার দলে আরও দুর্দান্ত সব খেলোয়াড় আছে, তখন খেলাটা অনেক সহজ হয়ে যায়।’
অস্ট্রেলিয়াকে ফেবারিট মনে করার কারণ হিসেবে শেন ওয়ার্নও একই কথা বলছেন। এমসিজির মিডিয়া সেন্টারের দোতলায় প্রেসবক্স, রেডিও-টেলিভিশনের কমেন্ট্রি বক্স সব তিনতলায়। প্রেস কনফারেন্স রুম কাম ডাইনিং রুমও সেখানেই। সাধারণ সাংবাদিক ও তারকা ধারাভাষ্যকারদের খাওয়া-দাওয়া সব একসঙ্গেই। কাল ম্যাচের আগে সেখানেই দেখা মিলল শেন ওয়ার্নের। সহাস্যে ‘হাই-হ্যালো’র জবাব দিচ্ছেন, কিন্তু সাক্ষাৎকারের অনুরোধে সটান ‘না’। সাক্ষাৎকার নাই-বা দিলেন, এই বিশ্বকাপে তাঁর ফেবারিট কে—এটা তো অন্তত বলা যায়। ওয়ার্ন জবাব দিলেন, ‘কালকের প্রোগ্রামে ছিলেন না? সেখানেই তো বলেছি।’
বলেছেন বটে। ভিক্টোরিয়া রাজ্যের পর্যটন বিভাগের এক অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়াকে ফেবারিট বলে রায় দেওয়ার কারণ হিসেবে বলেছেন দলে পাঁচ-ছয়জন ম্যাচ উইনারের উপস্থিতি। ওয়ার্নের চোখে অন্য সব দলে যা সর্বোচ্চ দু-তিনজন। প্রথম ম্যাচেই কি সেটির প্রমাণ দিয়ে দিল না অস্ট্রেলিয়া! অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গ্রেটরা এই দলের ত্রিরত্ন হিসেবে বেছে নিচ্ছেন ডেভিড ওয়ার্নার, মিচেল জনসন ও গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে। ম্যাক্সওয়েলও আলো ছড়িয়েছেন, তবে এই ম্যাচে ব্যাটিংয়ে যদি ফিঞ্চ ম্যাচ উইনার হন, বোলিংয়ে তা মিচেল মার্শ।
এঁদের নিয়েও বলতে হলো ফিঞ্চকে। বলতে গিয়ে হাসালেনও। ১৯৭৫ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ অভিষেকেই ৬ উইকেট নিয়েছিলেন গ্যারি গিলমোর। মিচেল মার্শেরও কাল বিশ্বকাপ অভিষেক। সেই প্রসঙ্গে গিলমোরকে টেনে আনায় ফিঞ্চ হাসি দিয়ে বললেন, ‘তখন তো আমার জন্মই হয়নি।’ ম্যাক্সওয়েলের ব্যাপারে গুণমুগ্ধতার কথা বলতে গিয়ে বললেন, ‘ও তো বরাবরই দুর্দান্ত খেলোয়াড়। এখন মাথাটাও খাটাচ্ছে, আগে ওকে এই অপবাদ দেওয়া যেত না।’
মেলবোর্নে আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি ম্যাচের দিন সকালেও। টসে জিতে এউইন মরগানের বোলিং করার সিদ্ধান্তটা উইকেটে আর্দ্রতার কথা ভেবেই। অস্ট্রেলিয়া ৩ উইকেটে ৭০ হয়ে যাওয়ার পর সেটিকে খুব বুদ্ধিদীপ্ত মনে হচ্ছিল। ফিঞ্চের সঙ্গে অধিনায়ক জর্জ বেইলির ১৪৬ রানের জুটিতে যেটির দীপ্তি ম্লান। সর্বশেষ ৭ ইনিংসে যাঁর সর্বোচ্চ ২৫, সেই বেইলি ৫৫ রানের ইনিংস খেলার পথে ওয়ানডেতে দুই হাজার রানের মাইলফলকও ছুঁয়ে ফেললেন। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে তাঁর চেয়ে কম ইনিংস খেলে যা করতে পেরেছেন শুধু দুজন-ডেভিড বুন (৫২) ও ম্যাথু হেইডেন (৫৩)। বেইলির সমান ৫৪ ইনিংস লেগেছিল গ্রেগ চ্যাপেলের। অথচ বাংলাদেশের বিপক্ষে পরের ম্যাচে মাইকেল ক্লার্ক ফিরলে বাইরে বসে থাকার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন বেইলি। এটা অস্ট্রেলিয়া দলের গভীরতা বোঝাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ‘মধুর’ এই সমস্যা দলে কি একটুও অস্বস্তি জাগাচ্ছে না?
এই প্রশ্নে অনুমিতভাবেই ফিঞ্চের কূটনৈতিক উত্তর, ‘এ সিদ্ধান্ত আমি নেব না। আমি তো আর নির্বাচক নই। এটুকু বলতে পারি, আমরা পেশাদার খেলোয়াড়। ১৫ জন থেকে ১১ জন খেলবে—এটা সবারই জানা। তবে এটা ঠিক, বেইলিই হোক বা অন্য কেউ, ভালো ফর্মে থাকলে তাকে বাদ দেওয়াটা তো একটু কঠিনই।’
ফিঞ্চের সংবাদ সম্মেলনটা যেমন আনন্দমুখর হলো, এউইন মরগানেরটা যে তা নয়, সেটি তো বলা বাহুল্য। ‘ডিজঅ্যাপয়ন্টিং’, ‘ফাস্ট্রেটিং’ শব্দ দুটি বেশ কবার উচ্চারিত হলো। তিন বিভাগেই অস্ট্রেলিয়ার প্রশ্নাতীত আধিপত্যের কথাও স্বীকার করলেন। পরের ম্যাচটিই আরেক স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। মরগান মনে করিয়ে দিলেন, ‘আমি আগে থেকেই বলে আসছি, গ্রুপে আমাদের প্রথম দুটি ম্যাচই সবচেয়ে কঠিন।’ কথার সুর শুনে মনে হলো, এই দুই ম্যাচে পরাজয় ধরে রেখে বাকি চারটি ম্যাচ নিয়েই মরগানের যত আশা।
নিজে শূন্য করেছেন, দল হেরেছে শোচনীয়ভাবে, তবে দিনের সেরা উক্তিটা এউইন মরগানের মুখ থেকেই। জিওফ বয়কট বেশ কিছুদিন ধরেই মরগান ও তাঁর দলের তীব্র সমালোচক। এটা কি ইংল্যান্ড দলকে বিব্রত করছে? মরগান ঠোঁটে ব্যঙ্গের হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘এ আর নতুন কী! জিওফ্রি তো টোয়েন্টি ফোর-সেভেন সমালোচক।’
বিশ্বকাপের আট হ্যাটট্রিক
চেতন শর্মা ভারত-নিউজিল্যান্ড নাগপুর ১৯৮৭
সাকলায়েন মুশতাক পাকিস্তান-জিম্বাবুয়ে ওভাল ১৯৯৯
চামিন্ডা ভাস শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ পিটারমারিজবার্গ ২০০৩
ব্রেট লি অস্ট্রেলিয়া-কেনিয়া ডারবান ২০০৩
*লাসিথ মালিঙ্গা শ্রীলঙ্কা-দ. আফ্রিকা গায়ানা ২০০৭
কেমার রোচ ও. ইন্ডিজ-হল্যান্ড দিল্লি ২০১১
লাসিথ মালিঙ্গা শ্রীলঙ্কা-কেনিয়া কলম্বো ২০১১
স্টিভেন ফিন ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া মেলবোর্ন ২০১৫
* চার বলে ৪ উইকেট

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন