default-image

‘তখন তোমার একুশ বছর বোধ হয়, আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁয়ায়...’ জনপ্রিয় এই গানের মতো প্রায় ওই বয়সেই দুজন দুজনের প্রেমে পড়েছিলেন। মেয়ের বয়সে অষ্টাদশীর ছোঁয়া লেগেছিল সত্যি, তবে ছেলের আসলে তখনো বিশ। গল্পটা জাতীয় দলের ফুটবলার মাহবুবুর রহমান ও জাতীয় দলের নারী ক্রিকেটার জিন্নাত আছিয়ার। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া তাঁদের এই ভালোবাসার গল্প বিয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা পেয়েছে গত বছর ৭ ডিসেম্বর।

মিরপুর ২ নম্বরে একটা বাসায় দুজন সংসার পেতেছেন। বাসায় ঢুকতেই সবার আগে চোখে পড়বে দেয়ালে পাশাপাশি টাঙানো বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল ও ক্রিকেট দলের জার্সি। ঘরময় ছড়ানো-ছিটানো সাদা, লাল ও হলুদ রঙের ক্রিকেট বল ও ফুটবল। বাহারি রঙের বলগুলোই যেন তাঁদের রঙিন জীবনের বিজ্ঞাপন।

বিজ্ঞাপন

২০১৮ সালে অভিষেকের পর জাতীয় দলে এখন নিয়মিত তরুণ স্ট্রাইকার মাহবুব। জিন্নাতের এখনো অভিষেক না হলেও জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকেন সব সময়ই। সর্বশেষ বিশ্বকাপেও স্ট্যান্ডবাই ছিলেন এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। স্ট্রাইকার ও ব্যাটার যুগলের কাছে আসার গল্পের শুরুটা একজন মিডফিল্ডারের মাধ্যমে।

বিকেএসপিতে একই ক্লাসে পড়াশোনার সুবাদে জিন্নাতের ভালো বন্ধু ফুটবলার সোহানুর রহমান। বসুন্ধরা কিংসে মাহবুবের সঙ্গে একই রুমে থাকতেন মিডফিল্ডার সোহানুর। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির এক অলস দুপুরে সোহানুরের অনুপস্থিতিতে তাঁর ফোন রিসিভ করেছিলেন মাহবুব। ওপাশ থেকে কলটা ছিল জিন্নাতের। দু-এক মিনিটের ‘হাই-হ্যালো’ই সেই মাহবুবের মন আনচান করে দেয়। রুমমেট ও সতীর্থ বন্ধুর সেই ভালো লাগায় পরবর্তী সময়ে পেছন থেকে বল জোগান দেওয়ার মতো রসদ জুগিয়েছেন সোহানুর।

এরপর মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে দুজন দুজনের পছন্দ-অপছন্দ জানার চেষ্টা, ভালো-মন্দের খোঁজ নেওয়া। দুজনের ভাব হয়ে যায়। মুখ ফুটে ভালোবাসার কথা না বললেও দুজনই বুঝতে পারেন প্রেম এসে গেছে জীবনে।

শুভদৃষ্টি হয় হাসপাতালে। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে মাহবুবের বাবা অসুস্থ হলে শ্রীমঙ্গল থেকে নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। মাহবুবের মনে হলো, পরিবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক তাঁর পছন্দের অদেখা মানুষটিকে। হাসপাতালে আসার অনুরোধ করলে রাজি হয়ে যান জিন্নাতও। প্রথম দর্শনে ক্রিকেটার জিন্নাতকে ভালো লেগে যায় মাহবুবুরের পরিবারেরও। ব্যস, ভালোবাসার পালে বাতাস লাগল। পরিবারের সম্মতি বুঝতে পেরে মাহবুবও সরাসরি প্রস্তাব দিলেন জিন্নাতকে, ‘তুমি আমাকে বিয়ে করবে?’ উত্তরটা তো এখন পাঠক জানেনই। এরপর প্রতিটি সার্থক প্রেমের গল্প যেভাবে এগোয় আরকি!

জিন্নাতকে নিয়ে মাহবুবের কথা, ‘আমার পরিবারের প্রতি ওর সম্মান দেখে ওকে আমার বেশি ভালো লেগে যায়। আমাকেও খুব সম্মান করত। সবচেয়ে বড় কথা, ও খেলোয়াড় হওয়ায় আমাকে বুঝতে পারে।’

জিন্নাত মাঠে নামলেই ফুটবলার মাহবুবের মন পড়ে থাকে ক্রিকেট মাঠে। সর্বশেষ জাতীয় ক্রিকেট লিগে রাজশাহীর হয়ে খেলেছেন জিন্নাত। কক্সবাজারে লিগের এক ম্যাচে জিন্নাত ব্যাট করছিলেন, ওদিকে দলের সঙ্গে অনুশীলনে যাচ্ছেন মাহবুব। অনলাইনে স্কোর দেখতে দেখতে টিম বাসে ওঠা। ভালোবাসার মানুষটির রান ৪০-এর ঘরে যাওয়ার পর মাহবুবের বুক ধড়ফড় শুরু হয়। ছক্কা মেরে জিন্নাত হাফ সেঞ্চুরি তুলে নিতেই বাসের মধ্যে চিৎকার করে ওঠেন মাহবুব! এই গল্পটা যখন মাহবুব বলছিলেন, পাশে বসা জিন্নাতের মুখে লাজুক হাসি।

বিজ্ঞাপন

ফুটবল অবশ্য একদমই পছন্দ ছিল না জিন্নাতের। জাতীয় দলের ক্যাম্পে গা গরমের জন্য ফুটবল শুরু হলে খেলতে মন সায় দিত না তাঁর। তাহলে মাহবুবকে কেন ভালো লাগল? জিন্নাতের সহজ উত্তর, ‘মানুষটা খুবই ভালো।’ ভালোবাসার মানুষ যখন ফুটবলার, তখন কি আর ফুটবল না ভালোবেসে পারা যায়! সুযোগ হলে এখন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে এসে খেলাও দেখেন জিন্নাত।

ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে মাহবুবকে বছরের বেশির ভাগ সময়ই ব্যস্ত থাকতে হয়। ব্যস্ততা কম নয় জিন্নাতেরও। বিয়ের পর একজন ওঠেন বসুন্ধরা কিংসের ক্যাম্পে, অন্যজন জাতীয় দলের ক্যাম্পে। এর মধ্যেই একটু-আধটু সময় বের করে নেন নিজেদের জন্য, মিরপুরের ভাড়া বাসায় সাজিয়েছেন সংসার। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার-ক্রিকেটার এই দম্পতির সেই সংসার আপাতত উপচে পড়া ভালোবাসায় রঙিন।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন