default-image

যে কারণে এশিয়ান কাপ ফুটবলের বাছাইপর্ব কাভার করতে কুয়ালালামপুর গিয়ে স্মৃতিময় মাঠটা একবার দেখে না আসাটাকে রীতিমতো অন্যায় বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের বাঁক বদলের সেই মাঠটা খুঁজে বের করতে রীতিমতো গলদঘর্ম অবস্থা। মালয়েশিয়ায় ক্রিকেট আমজনতার খেলা নয়। ফলে স্থানীয়রা জানেন না মাঠটার ঠিকানা। অনেক প্রবাসী বাংলাদেশিকে জিজ্ঞেস করেও লাভ হলো না।

শেষ পর্যন্ত একজন অবশ্য দিতে পারলেন মাঠটার খোঁজ—কালীদাশ। মালয়েশিয়ার একজন আম্পায়ার। ১৫ জুন মালয়েশিয়ার হোম অব ক্রিকেট কিনরারা ওভালে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা, যেখানে সালমা খাতুনেরা ২০১৮ সালে এশিয়া কাপ জিতেছেন। বাংলাদেশি সাংবাদিক পরিচয় জেনে কালীদাশ সহাস্যে বললেন, ‘আরে, আমি তো বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনেককে চিনি। বুলবুল (আমিনুল ইসলাম) আমাকে অনেক ভালো চেনে। পাইলট, আকরাম, নান্নু, রফিক, সবাই আমার পরিচিত।’

এবার আসল প্রশ্ন। ১৯৯৭ সালের বাংলাদেশ যে আইসিসি ট্রফি জিতেছিল কিলাত কিলাব মাঠে, সেখানে আপনি ছিলেন? ‘হ্যাঁ, ছিলাম। সে সময় আমার বন্ধু ছিল বাংলাদেশ দলের লিয়াজোঁ অফিসার। আমিও বাংলাদেশ দলের সঙ্গেই ছিলাম। সেই মাঠটা এখান থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে বানসা টিএনবি এলাকায়।’

সঙ্গে সঙ্গেই বানসা টিএনবিতে গেলাম। কিন্তু এলাকাটা সংরক্ষিত হওয়ায় বহিরাগতদের ভেতরে যেতে পাস লাগে। সেই পাস কোথায় পাব? এক নিরাপত্তাকর্মী পরামর্শ দিলেন, বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে অনুমতি আনুন। কিন্তু তা আনতে সময়ের প্রয়োজন। শেষমেশ এক নিরাপত্তাকর্মী একটা উপায় বাতলে দিলেন, ‘মাঠটা পরিদর্শন করতে চান লিখে মেইল করুন আমাদের বসকে।’ নিরাপত্তাকর্মীর কক্ষে বসে মেইল করলাম। পরদিন হয়তো উত্তর আসবে ধরে নিয়ে সেদিন ফিরে এলাম। কিন্তু উত্তর আর আসেনি।

default-image

কিন্তু মাঠটা দেখার জন্য রোখ চেপে গেছে। পরদিন তাই দ্বারস্থ হলাম মালয়েশিয়ার ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহামেদ ইকবাল আলী বিন কাসিম আলীর। তিনি বললেন, ‘এই মাঠটা মালয়েশিয়ার ক্রিকেটের অধীনে নয়। এটা টিএনবির অধীনে। টিএনবি মানে মালয়েশিয়ার জাতীয় বিদ্যুতায়ন বোর্ড। পাস দিলে ওরাই দিতে পারে। সরি, আমরা কোনো সহায়তা করতে পারছি না।’

তবে ইকবাল আলী একটা উপকার করলেন। কিলাত কিলাব মাঠের তত্ত্বাবধায়ক নূর সাইফুলের ফোন নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করতে বললেন তাঁর সঙ্গে। নূর সাইফুল ফোনে বললেন, ‘আপনি গেটে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মীকে ফোনে ধরিয়ে দিন আমায়।’ তাতেও কাজ হচ্ছিল না। নিরাপত্তাকর্মীদের এক কথা, লিখিত অনুমতি লাগবে।

তারপরও আমিও নাছোড়বান্দার মতো দাঁড়িয়ে আছি দেখে নূরের এক সহকর্মী মোহামেদ সাবের ভেতর থেকে গেটে এলেন। ততক্ষণে সন্ধ্যা ছয়টা বেজে গেছে। রাত ১০টায় আমার দেশে ফেরার ফ্লাইট। রাস্তার যানজটে পড়ে ফ্লাইট মিস হয়ে যাওয়ার শঙ্কাও কাজ করছে মনে। সাবের একটা ব্যবস্থা করলেন। তবে কিছু শর্তে। সাবের তাঁর বাইকে চড়িয়ে ভেতরে নিয়ে যাবেন। আর সেই বাইক অনুসরণ করবেন একজন পুলিশ। গেটে রেখে দেওয়া হবে আমার পাসপোর্ট।

default-image

সব মেনে নিয়ে চড়ে বসলাম বাইকে। মূল সড়ক থেকে এক–দেড় কিলোমিটার ভেতরে মাঠটায় যাওয়ার সৌভাগ্য হলো। পড়ন্ত বিকেলে বিশাল মাঠের বেশির ভাগ অংশই খালি। এখন মূলত ফুটবল হয় এখানে। এক পাশে পোস্ট লাগিয়ে ম্যাচ অনুশীলন হচ্ছিল। সাদা আর মেরুন রং করা ছোট গ্যালারিটা দেখতে বেশ সুন্দর। তা আরও মোহনীয় করে তুলেছে মাঠের সবুজ ঘাস আর পাশের গাছগাছালি।

কিলাত মানে আলো, সত্যিই চারপাশ আলোকিত লাগছিল। কুয়ালালামপুরের তেনাগা জাতীয় স্পোর্টস কমপ্লেক্সের সংলগ্ন এই মাঠের পাশে গড়ে উঠেছে বিশাল মসজিদ আর টেলিকম মালয়েশিয়ার টাওয়ার। বড় বড় অট্টালিকা উঠে দাঁড়িয়েছে। আছে ব্যাডমিন্টন ও টেনিস কোর্টও।

কিন্তু কোথাও ক্রিকেটের কোনো চিহ্ন নেই। কারণ, মাঠটায় অনেক বছর ধরেই আর ক্রিকেট হয় না। মাঠটায় গিয়ে দাঁড়ালে কেউ তাই বুঝতেই পারবেন না, ২৫ বছর আগে এখানেই বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল। এ নিয়ে একটু দুঃখ তো হলোই, তবে ফেরার সময় তা ছাপিয়ে মনে একটা তৃপ্তি—এত যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত কিলাত কিলাব মাঠটা তো অন্তত দেখা হলো।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন