স্বপ্ন দেখতেন দেশের হয়ে খেলার। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে। কখনো বাংলাদেশ দলে খেলা হয়নি তাঁর। তবু তিনিই বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় তারকা
default-image

তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় তারকা। অথচ কখনো বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে খেলেননি।

অবাক হচ্ছেন? অবাক হওয়ারই কথা। বাংলাদেশের ক্রিকেটের তারকা বলতে তো আমরা মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল কিংবা মাহমুদউল্লাহদেরই বুঝি। তাঁরা জাতীয় ক্রিকেট দলের নির্ভরতা। যে ক্রিকেটার কোনো দিন জাতীয় দলেই খেলেননি, তিনি কীভাবে দেশের সবচেয়ে বড় তারকা ক্রিকেটার হন!

দেশের হয়ে তিনি কোনো ক্রিকেটের ময়দানে লড়েননি। কিন্তু তিনি দেশের জন্য লড়েছিলেন যুদ্ধের ময়দানে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে  এক সময় স্বপ্ন দেখতেন দেশের হয়ে খেলার। কিন্তু সে দেশটাকেই এক সময় শত্রু মনে হলো তাঁর। যে দেশের হয়ে খেলতে চেয়েছিলেন, সে দেশের সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুরতা ক্ষুব্ধ ও প্রতিশোধপরায়ণ করে তুলেছিল তাঁকে। উপলব্ধি করেছিলেন, যে দেশটাকে আপন ভাবছেন, সেটি মোটেই তাঁর দেশ নয়, তাই নতুন করে স্বপ্ন দেখলেন। নতুন এক দেশ গড়েই খেলবেন তাদের হয়ে। কিন্তু সে স্বপ্নটা যে রণাঙ্গনেই বিসর্জন দিয়েছিলেন তিনি হাসিমুখে।

আবদুল হালিম চৌধুরী তাঁর নাম। ক্রিকেট অঙ্গনের সবাই চেনে জুয়েল নামেই। ষাটের দশকে খেলা শুরু করেছিলেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট। লক্ষ্য ছিল তাঁর পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলে খেলা। টেস্ট ক্রিকেটে দেশের টুপি পরে মাঠে নামা। নিজেকে তৈরি করছিলেন সেভাবেই। ১৯৬৯ সালে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট দল পাকিস্তানে সিরিজ খেলতে এসেছিল। সে সিরিজে মূল দলে জুয়েলের জায়গা হয়নি। কিন্তু ছিলেন প্রাথমিক ক্যাম্পে। ঘরোয়া ক্রিকেটে শত শত রান করে যাচ্ছিলেন। একটা সময় হয়তো তাঁকে আর উপেক্ষা করতে পারত না পাকিস্তানি ক্রিকেট প্রশাসকেরা। কিন্তু এরই মধ্যে তিনি লড়াইটা ক্রিকেট থেকে সরিয়ে নিয়ে এলেন মাতৃভূমির মুক্তির লক্ষ্যে। মাতৃভূমি মানে আসল মাতৃভূমি—বাঙালির সম্পূর্ণ নিজেদের দেশ, বাংলাদেশ।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সেই রক্ত, কান্না আর আর্তনাদের রাতে জুয়েলকে বিহ্বল করে এ দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ। তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন মতিঝিলের ক্লাব পাড়ার বিভিন্ন ক্লাবে অবস্থান করা তাঁর বাঙালি সতীর্থদের জন্য। তাঁকে যিনি ক্রিকেটে এনেছিলেন, সেই গুরু মুশতাক হোসেনের জন্য চিন্তার মাত্রাটা ছিল একটু বেশিই। অবাঙালি মুশতাক একা একা থাকতেন আজাদ বয়েজ ক্লাবে। ২৬ মার্চ তাঁর কোনো খোঁজ মেলেনি। ২৭ মার্চ অনেক খুঁজে মুশতাকের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় ঢাকা জেলা ক্রীড়া পরিষদের মিলনায়তনের সামনে। এই মুশতাক এক সময় আশপাশের কেউ মারা গেলেই তাঁর সৎকারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তেন, মৃতের গোসল, জানাজার ব্যবস্থা করতেন। অথচ তাঁর ভাগ্যেই মৃত্যুর সময় জানাজা জোটেনি। ব্যাপারটা বিহ্বল করে তুলেছিল জুয়েলকে। সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যুদ্ধে যাবেন। নতুন একটা দেশ গড়বেন, সে দেশকে নিয়ে যাবেন ক্রিকেট আঙিনায়। টেস্ট খেলবেন সে দেশের হয়েই।

মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী ‘ক্র্যাক প্লাটুনে’ যোগ দিয়েছিলেন জুয়েল। যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি বীর মেজর খালেদ মোশাররফ, ক্যাপ্টেন এটিএম হায়দারদের কাছে। অবরুদ্ধ ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা বিভিন্ন জায়গায় চকিতে অপারেশন পরিচালনা করতেন ক্র্যাকপ্লাটুনের সদস্যরা। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন পাওয়ার স্টেশন, বিদেশি দূতাবাস, অভিজাত এলাকা এমনকি হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের মতো সুরক্ষিত জায়গাতেও এই বাহিনী সফল অপারেশন পরিচালনা করেছিল। জুয়েল ছিলেন ক্র্যাকপ্লাটুনের যোদ্ধা, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সন্তান শহীদ রুমির সহযোদ্ধা।

মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৬৬ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় জুয়েলের। বয়স তখন তাঁর মাত্র ১৬। সে বয়সেই ঢাকার ক্রিকেটে মারকুটে এক ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে পরিচিত করেন। অভিষেক ম্যাচেই আইয়ূব ট্রফিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে পিডব্লিউডির (গণপূর্ত বিভাগ) বিপক্ষে ৩৮ রান করেছিলেন। যদিও দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ রানের বেশি করতে পারেননি। পরের বছরই খেলেন কায়েদে আজম ট্রফিতে। যেটি পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী প্রথম শ্রেণির ঘরোয়া ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। হায়দরাবাদ, লায়ালপুর ও কোয়েটার বিপক্ষে তিনি খেলেন পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে। ১৯৬৯ সাল করাচি ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে করাচি হোয়াইটসের বিপক্ষেও ভালো খেলেন তিনি। ১৯৭০-৭১ মৌসুমে তিনি ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। এর আগেই অবশ্য পাকিস্তান টেস্ট দলের অনুশীলন ক্যাম্পে ডাক পেয়েছিলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন বাড়িতে কাউকে কিছু না বলেই। রেখে গিয়েছিলেন মাকে। স্বামীহারা ফিরোজা বেগম প্রথমে তাঁকে যেতে দিতে চাননি বলেই হয়তো। দেশ মাতৃকার ডাকে সেদিন জুয়েল তুচ্ছ করেছিলেন তাঁর সব পিছুটানকে। নিজের ক্রিকেট ক্যারিয়ারকে। বাংলাদেশ না হোক, লেগে থাকলে পাকিস্তানেই দারুণ একটা ক্রিকেট ক্যারিয়ার হাতছানি দিচ্ছিল তাঁকে। দেশকে নিয়ে না ভেবে ক্যারিয়ারের জন্য স্বার্থপর তো কতজনই হয়েছিলেন। কতজনই তো নিছক পার্থিব সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যের আশায় মুক্তিসংগ্রামকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর সে মানুষগুলোই আবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নিজেদের ক্ষেত্রে ছড়ি ঘুরিয়েছেন। আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল তেমন জীবন চাননি। তিনি চেয়েছিলেন, ক্রিকেট মাঠে যদি ফিরতে হয়, তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশেই ফিরবেন, জাতীয় দলে যদি খেলতে হয়, বাংলাদেশের হয়েই খেলবেন, টেস্ট যদি খেলতে হয়, সেটা হবে বাংলাদেশ দলের হয়েই।

আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন উড়িয়েছিল ক্র্যাক প্লাটুন। সে অপারেশনে জুয়েল রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। উড়ে গিয়েছিল তাঁর হাতের আঙুল। রক্তাক্ত, আহত জুয়েল ব্যথায় কুঁকড়ে প্রথম যে কথাটা বলেছিলেন, সেটি ক্রিকেট নিয়ে—‘ভাইরে আঙুল না থাকলে বাংলাদেশের হয়ে খেলব কী করে? কীভাবে ব্যাট ধরব?’

১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার বিভিন্ন বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় ক্র্যাক প্লাটুনের অনেক সদস্যকে। এ দলে অনেকেই ছিলেন, ছিলেন রুমি, জুয়েল। এই অপারেশনেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সুরকার আলতাফ মাহমুদকে। নাখালপাড়ার ড্রাম ফ্যাক্টরিতে রেখে অকথ্য অত্যাচার চালানো হয়েছিল সবার ওপর। জুয়েলের হাতের বাকি আঙুলও কেটে ফেলা হয়েছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি পাষণ্ডরা।

শহীদ জুয়েল স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেট-উত্থানের। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে অনেকটাই। বাংলাদেশ এখন টেস্ট খেলে—যে স্বপ্নটা তিনি বুকের মধ্যে লালন করতেন একটা সময়। বিশ্বকাপের ময়দানে গৌরবের সঙ্গে ওড়ে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দল এখন মাথা নোয়ায় বাংলাদেশের সামনে। তাঁর উত্তরসূরিরা রেকর্ড বইয়ে নাম লেখায়। নাম লেখায় বিশ্বসেরা তারকাদের কাতারে। কোনো এক দূর লোকে বসে শহীদ জুয়েল নিশ্চয়ই গর্ববোধ করেন ক্রিকেটে তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশের সব অর্জনে।

কোনো দিন জাতীয় দলে খেলেননি জুয়েল। কিন্তু মাশরাফি-সাকিবদের চেয়েও বড় তারকা হয়ে চিরদিনই দেশের ক্রিকেটে বেঁচে থাকবেন তিনি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন