প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা। কিন্তু আজকের ম্যাচে মাঠও কি বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ নয়! যেকোনো ক্রিকেটারের স্বপ্নের আকাশে উঁকি দিলে সেখানে এমসিজিতে খেলাটা নির্ঘাত ‘কমন’ পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য আজ সেই স্বপ্ন পূরণের দিন। কিন্তু এমসিজিতে নবীনবরণ যে ভিন্ন কিছু চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দেয়। সেটি তো থাকছেই, সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য হুমকি হয়ে দুই কিংবদন্তি এবং বল হাতে নিজেকে খুঁজে ফেরা এক বোলার—

এমসিজি
বাংলাদেশের ফটোসাংবাদিকদের অনুরোধে সংবাদ সম্মেলন শেষে মাশরাফিকে এমসিজির ওপরের টিয়ারে উঠতে হলো। নিচের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক, ‘লাফালাফি করতে করতে এখান থেকে কেউ পড়ে গেলে তো স্পট ডেড!’ যেখানে দাঁড়িয়ে বলছেন, সেটির ওপরে প্রায় ত্রিশটি সিঁড়ি! যার মাথায় উঠে নিচে তাকালে এমসিজির বিশালত্ব আসলেই গ্রাস করে নেয়! এই মাঠে খেলাটা তাই অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা হতে বাধ্য। বিগ ব্যাশের কল্যাণে সাকিবের আগেই তা হয়ে গেছে। বাকিরা আজ স্বাদ পাবেন অভূতপূর্ব এক অভিজ্ঞতার। ক্রিকেটীয় দক্ষতার পরীক্ষাটাও এই মাঠে একটু অন্য ধরনের। শুধু দর্শক ধারণক্ষমতার দিক থেকেই নয়, আয়তনেও এই মাঠ ক্রিকেট-বিশ্বে সবচেয়ে বড়। চার-ছয়ের চেয়ে দৌড়ে রান নেওয়াটাই এখানে হয়ে উঠতে পারে ম্যাচের নির্ধারক। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটা দ্বিমুখী। বাংলাদেশের মাঠগুলোতে দৌড়ে ৩ রান নেওয়াটাই যেখানে বিরল, এখানে দৌড়ে ৪ রানও হরহামেশা হয়। ব্যাটিংয়ের সময় রানিং বিটুইন দ্য উইকেটের মতো ফিল্ডিংয়ের সময়ও তাই প্রচুর দৌড়াতে হয়। শ্রীলঙ্কানদের বেশির ভাগের কাছেই এটি নতুন কোনো অভিজ্ঞতা হয়ে আসবে না। এই এমসিজি শ্রীলঙ্কার জন্য খুব পয়াও। অস্ট্রেলিয়ায় ৯৯ ম্যাচে ২৭টি জয় শ্রীলঙ্কার (২৭ শতাংশ)। যেখানে মেলবোর্নে ১৭ ম্যাচেই ৬টি জয় (প্রায় ৩৫ শতাংশ)।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: প্রাণপণে দৌড়ে সীমানা থেকে ফিল্ডিং করে বাউন্ডারি বাঁচানোর পরও শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যানরা দৌড়েই ৪ রান নিয়ে নিয়েছে দেখলে বাংলাদেশের ফিল্ডারদের ভেঙে পড়লে চলবে না।

default-image

তাঁরা দুজন
ওয়ানডেতে দুজনের মোট রান ২৬৩৬৪, সেঞ্চুরির সংখ্যা ৪০। একজন আরেকজনের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। একসঙ্গে ওয়ানডে ক্যারিয়ার শেষ করার সিদ্ধান্তে সেটির কোনো ভূমিকা থাকলেও থাকতে পারে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে খেলা মানেই এই দুজনকে নিয়ে প্রতিপক্ষের বাড়তি গবেষণা। সেটি বাংলাদেশও করছে। মাহেলা জয়াবর্ধনে ও কুমার সাঙ্গাকারার একজন দাঁড়িয়ে গেলেই যে বদলে যেতে পারে ম্যাচের রং।
মাশরাফি বলছিলেন, ‘সাঙ্গাকারা বা জয়াবর্ধনের পুরো ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবলেই সেটি চাপ হয়ে দাঁড়াবে।’ তা না ভেবে মাশরাফি বরং ‘ওরা বাংলাদেশের বিপক্ষে কী এমন করেছে’ সাহস জোগাতে পারেন সতীর্থদের। টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশকে অনেকবারই দুঃস্বপ্ন উপহার দিয়েছেন। যেখানে সাঙ্গাকারার ব্যাটিং গড় ৯৫.৫৭, জয়াবর্ধনের ৭৬.৪০। কিন্তু ওয়ানডেতে দুজনই সাধারণের কাতারে। বিস্ময়ই বলতে হবে, বাংলাদেশের বিপক্ষে জয়াবর্ধনের ব্যাটিং গড় (৩০.৩৮) তাঁর ক্যারিয়ার গড়ের (৩৩.৫৭) চেয়েও কম। সাঙ্গাকারারও তা সামান্যই বেশি (ক্যারিয়ার গড় ৪০.৮৮, বাংলাদেশের বিপক্ষে ৪৪.০৪)।
এই বিশ্বকাপই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জয়াবর্ধনের শেষ। সাঙ্গাকারা টেস্টের ব্যাপারটি খোলাসা না করলেও ওয়ানডে ক্যারিয়ার শেষ করছেন এখানেই। প্রতিটি ম্যাচই তাই বিদায়ের পথে আরেকটি ধাপ। প্রতিটি মাঠই স্মৃতি রোমন্থনের উপলক্ষ। এমসিজিতে সেই রোমন্থন অবশ্য খুব বেশি আনন্দ বয়ে আনছে না। জয়াবর্ধনের বরং এমসিজিকে অপছন্দই করার কথা। ৮ ম্যাচে ১টি ফিফটি, গড় মাত্র ১৮.১২। সাঙ্গাকারার ফিফটিও ১টি, গড় ৩৫.৫০। এই বিবর্ণ রেকর্ডে রং ছেটানোর জন্য আজকের ম্যাচটি আবার সাঙ্গাকারার জন্য বিশেষ উপলক্ষ। এটি যে তাঁর ৪০০তম ম্যাচ।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: বড় খেলোয়াড়েরা কোনো কিছুই ভোলেন না। এমসিজিতে ওয়ানডে সেঞ্চুরি নেই—জয়াবর্ধনে ও সাঙ্গাকারাও তা মনে রেখেই ব্যাটিং করতে নামবেন।

default-image

‘ডেথ’ ওভারের রাজা
‘ডেথ ওভার’ কথাটা বেশি দিনের পুরোনো নয়। ওয়ানডের শেষ ১০ ওভারের নাম ‘স্লগ ওভার’ থেকে বদলে ডেথ ওভার হয়ে যাওয়ায় যাঁদের সবচেয়ে বড় ভূমিকা, লাসিথ মালিঙ্গা তাঁদের পুরোভাগে। যখন চার-ছয়ের বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা, উল্টো ব্যাটসম্যানদের মৃত্যু পরোয়ানা লেখা থাকে মালিঙ্গার ইয়র্কারে। এই বিশ্বকাপে সেই মালিঙ্গাকে মনে হচ্ছে নিজের ছায়া। অ্যাংকেলে অস্ত্রোপচারের কারণে ক্রিকেটের বাইরে ছিলেন অনেক দিন। শরীর ফুলেফেঁপে উঠেছে। অথচ শ্রীলঙ্কান সাংবাদিকদের মধ্যে তাঁর প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই। মালিঙ্গার এই অবস্থার জন্য যে মালিঙ্গাকেই দায়ী মনে করেন তাঁরা। বিশ্বকাপে সেরা রূপে দেখা দিতে গত সেপ্টেম্বরে চিকিৎসকেরা বিশ্রামের দাওয়াই দিয়েছিলেন। তাতে কান না দিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলতে চলে যান। সেটিতে না খেললে অ্যাংকেলে হয়তো অস্ত্রোপচারই লাগত না। অর্থলোভী হিসেবে মালিঙ্গার দুর্নামটাও এতে আরেকটু বাড়ে। টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারকে দীর্ঘায়িত করতে মাত্র ২৭ বছর বয়সে টেস্ট ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার পর থেকেই যেটি তাঁর সঙ্গী। শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত এক সাংবাদিক বলছিলেন, ‘এই দলে জয়া-সাঙ্গার পরই সবচেয়ে বড় নাম মালিঙ্গা। কিন্তু শ্রীলঙ্কানরা বাকি দুজনকে যেমন ভালোবাসে, মালিঙ্গাকে তার এক শতাংশও নয়।’
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে প্রথম স্পেলের মালিঙ্গাকে চিনতেই কষ্ট হচ্ছিল। দ্বিতীয় স্পেলে একটু ভালো, তার পরও ১০ ওভারে ৮৪ রান দিয়ে কোনো উইকেট নেই। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৩ উইকেটকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলার আগে বরাবরই ‘মালিঙ্গা’ ‘মালিঙ্গা’ রব উঠলেও বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা তাঁকে ভালোই সামলে এসেছেন। সেরা সময়েও টেস্টে ১৪ ইনিংসে বোলিং করে একবারও ৫ উইকেট নেই। ওয়ানডেতে ১২ ম্যাচে মাত্র ১৭ উইকেট, কখনো এক ম্যাচে ৩ উইকেটের বেশি পাননি। বিশ্বকাপে এসেই ঘোষণা করেছেন, ‘চাপ জিনিসটা কী সেটি তো আমি জানিই না।’ মুখে বলছেন বটে, আসলে মালিঙ্গা বিষম চাপে আছেন।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: ক্রিকেটে রেগে যাওয়া ফাস্ট বোলারের চেয়ে ভয়ংকর কিছু আর হয় না। চারপাশ থেকে উড়ে আসা সমালোচনার তিরে বিদ্ধ লাসিথ মালিঙ্গা কিন্তু খুব রেগে আছেন।

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন