বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই হচ্ছে আইপিএল।
বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই হচ্ছে আইপিএল। ছবি: আইপিএল

করোনায় ভয়াবহ অবস্থা ভারতে। গড়ে তিন লাখের বেশি শনাক্ত হওয়ার খবর বের হচ্ছে ভোর হলেই। মৃত্যুও দিনে তিন হাজার হয়ে গেছে কয়েক দিনের মধ্যেই। করোনার এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যেও আইপিএলের খেলা হচ্ছে ভারতে। টেলিভিশন পর্দায় আইপিএলের ম্যাচগুলো দেখতে দেখতে যেকারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এটা কীভাবে সম্ভব! প্রতিদিন যে দেশে করোনা নিয়ে হাহাকার, হাসপাতালে শয্যাসংকট, মৃত্যুর মিছিল, সে দেশে এই পরিস্থিতিতে কীভাবে বিনোদনমূলক ক্রিকেট হতে পারে!

সাবেক ইংলিশ ফুটবল তারকা, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটজয়ী গ্যারি লিনেকারের মনে এই প্রশ্ন জেগেছে। তিনি টুইটারে বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘রানের চেয়েও দ্রুতগতিতে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। আমি নিজেও আইপিএল দেখতে ভালোবাসি। কিন্তু কোভিড বিপর্যয়ে দেশের এমন সংকটের মধ্যেও তা চালিয়ে যাওয়াটা ঘোর অন্যায় মনে হচ্ছে আমার কাছে।’

মজার ব্যাপার, দেশে এই মৃত্যু আর হাহাকারের মধ্যেও আইপিএল আয়োজনের নৈতিক দিকটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি কোনো ভারতীয় ক্রিকেটার। হালফিলের ক্রিকেটারদের না হয় রুটিরুজির শঙ্কা আছে, কিন্তু সাবেক ক্রিকেটাররা কোথায়? পান থেকে চুন খসলেই যেখানে ভারতের সাবেক ক্রিকেট তারকারা কণ্ঠ ছাড়েন জোরে, সেখানে করোনার মধ্যে আইপিএল আয়োজনের নীতি-নৈতিকতা নিয়ে চুপ কেন তাঁরা? এ প্রশ্ন উঠছেই। অলিম্পিকে ভারতের হয়ে একমাত্র ব্যক্তিগত সোনার পদক জেতা ক্রীড়াবিদ অভিনব বিন্দ্রা অবশ্য প্রতিবাদী হয়েছেন। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি আইপিএল আয়োজক ও ভারতীয় ক্রিকেট তারকাদের ‘মূক’ ও ‘বধির’ বলছেন। নিজের লেখায় উগরে দিয়েছেন ঘৃণা।

default-image
বিজ্ঞাপন

ঘণ্টা প্রথম বাজিয়েছিলেন অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান এক টুইটে করোনা পরিস্থিতিতে আইপিএল কেন, সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, এ কঠিন পরিস্থিতিতে আইপিএল মানুষকে কিছুটা হলেও চিন্তামুক্ত করছে কি না, আইপিএল বিনোদনে মানুষ কিছুক্ষণের জন্য হলেও মৃত্যু, হাহাকারের কষ্ট ভুলছে কি না!

গিলক্রিস্ট যে প্রশ্ন টুইটারে তুলেছেন, সেটির পক্ষে অনেকেই যুক্তি দিয়েছেন। দিল্লি ক্যাপিটালসের কোচ রিকি পন্টিং তো রীতিমতো গদগদ। পন্টিংয়ের মতোই মনে করেন ক্রিস মরিস, প্যাট কামিন্সসহ কয়েকজন। তবে পন্টিংয়ের দেশই ভারতের সঙ্গে আকাশ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে করোনার ভয়ে। তাঁর স্বদেশি ক্রিকেটাররাই করোনার ভয়ে আইপিএল ছেড়ে দেশের পথ ধরেছেন।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড সম্প্রতি বিদেশি ক্রিকেটারদের অভয় দিয়ে বলেছে, তাঁরা যেন নিজ দেশে ফেরা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা না করেন। আইপিএল শেষ হলে তাঁদেরই বাড়ি ফেরার সব বন্দোবস্ত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) করবে। শুধু তা-ই নয়, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের এই ‘আইপিএল সূচি অনুযায়ী চালিয় যাওয়া’কে অনেকেই ‘অমানবিক’ পেশাদারত্ব হিসেবে দেখছে। স্বার্থপরতা বলতেও অত্যুক্তি নেই অনেকের।

বিসিসিআই করোনাকালে আইপিএল চালিয়ে যেতে যে জৈব সুরক্ষাবলয়কে আরও জোরদার করার কথা বলছে, প্রতিটি ম্যাচের আগে আরও খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও আইপিএল–সংশ্লিষ্টদের করোনা পরীক্ষার কথা বলছে, এ ঘোষণাও ভারতের প্রেক্ষাপটে এখন বড় নিষ্ঠুর শোনাচ্ছে। যে দেশে করোনা পরীক্ষার কিট পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে আইপিএলের ম্যাচ আয়োজনের জন্য শত শত কিটের বাড়তি অপচয় কেন! ভারতে করোনার ভয়াবহ অবস্থায় অন্তত আইপিএল যে মানাচ্ছে না—এটা কেবল ভারতীয় ক্রিকেট–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়া আর সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে নেবেন।

বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হচ্ছে ভারতীয় বোর্ডের বিদেশি ক্রিকেটারদের অভয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত। সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের খবর, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সিওও চিঠি লিখে বিদেশি ক্রিকেটারদের বলেছেন, ‘দেশে ফেরা নিয়ে তোমরা কেউ ভেবো না। প্রয়োজনে ভারতীয় বোর্ড ব্যবস্থা করবে। যা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, দেশে যখন অক্সিজেন সংকট, হাসপাতালে বেড পাওয়া যাচ্ছে না, জাতীয় বিপর্যয়ের চেহারা নিয়েছে কোভিড অতিমারি, তখন আইপিএল চালিয়ে যাওয়ার জন্য এত মরিয়া কেন বোর্ড? জনতার মনে আরও প্রশ্ন, সরঞ্জামের অভাবে অনেক শহরে কোভিডের পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। সেখানে বোর্ডকর্তারা বলছেন, আইপিএলের জৈব সুরক্ষাবলয়ের স্বাস্থ্যবিধি আরও জোরদার করা হবে। তার জন্য বাড়ানো হতে পারে কোভিড পরীক্ষার হার। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘সাধারণ মানুষের জন্য কিট যদি না থাকে, আইপিএলের বলয়ে কী করে সব দলের এতবার পরীক্ষা হচ্ছে? আর সেটা কতটাই বা জরুরি?”’ অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার ক্রিস লিন জানিয়েছেন, সম্ভবত সামনের সপ্তাহেই তাঁরা প্রতিষেধক পেয়ে যাবেন। এ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে, দেশজুড়ে যখন প্রতিষেধকের আকাল, তখন আইপিএল খেলবেন বলে সুস্থ-সবল ক্রিকেটারদের কেন তড়িঘড়ি প্রতিষেধক দেওয়া হবে? তারকা বলে আলাদা সুবিধা কেন?

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন