default-image
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই একতরফা ম্যাচ। আমেজ হারাচ্ছিল বিশ্বকাপ। হয়ে পড়ছিল ম্যাড়মেড়ে। কিন্তু বাংলাদেশ আর পাকিস্তান বিশ্বকাপকে জমিয়ে দিয়েছে। প্রথমে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়, কাল পাকিস্তান হারাল ইংল্যান্ডকে। দুটি ম্যাচই পথে নিয়ে এসেছে বিশ্বকাপকে

বলা হচ্ছিল, এবারের বিশ্বকাপ নাকি রানবন্যা দেখবে। ভবিষ্যদ্বাণী এসেছিল, প্রায়ই নাকি ৩৫০ রান তাড়া করতে হতে পারে দলগুলোকে। ৩৫০ কী, ইনিংসে ৪০০, এমনকি ৫০০ রানের সম্ভাবনা নিয়েও আলাপ হচ্ছিল। কিন্তু হায়, ভবিষ্যদ্বাণী যদি সব সময় সত্যি হতো! 

রানবন্যা তো দূরের কথা, প্রথম চার ম্যাচে বিশ্বকাপের আমেজই উধাও। একের পর এক ম্যাড়মেড়ে ম্যাচ, ব্যাটিং ধস হয়ে উঠছিল বিশ্বকাপের বিজ্ঞাপন। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে একটা ধন্যবাদ দিতে পারে ২০১৯ বিশ্বকাপ। বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে পরশু পেয়েছে রোমাঞ্চকর এক জয়, কাল প্রথম ম্যাচের দুঃস্বপ্ন ভুলে পাকিস্তান বুঝিয়ে দিল, ক্রিকেট দুনিয়ায় তারা কেন অননুমেয়! হারিয়ে দিল বিশ্বকাপের ফেবারিট ইংল্যান্ডকে। দুটি ম্যাচই প্রাণ এনে দিল বিশ্বকাপে।
পরশু দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে তো বটেই, নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসেই সবচেয়ে বেশি রানের ইনিংসটা খেলেছে। পরশু পর্যন্ত সেটিই ছিল এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি রানের ইনিংসও। দারুণ পরিকল্পনায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিবশ করে বাংলাদেশ জিতেছে ২১ রানে। সেই ম্যাচের চিত্রনাট্য টাই যেন কাল টেনে এনেছে পাকিস্তান-ইংল্যান্ড ম্যাচ। ৩৪৮ করার পর ক্ষণে ক্ষণে রং বদলানো ম্যাচটি পাকিস্তান জিতেছে ১৪ রানে। দুটি দিন মনে করাল না যে একটা বিশ্বকাপ হচ্ছে!

প্রথম চার ম্যাচের সঙ্গে যে দুই ম্যাচের মেরু ব্যবধান। প্রথম চার ম্যাচে সাকল্যে রান উঠেছে মাত্র ১৪২০, ইনিংসপ্রতি গড়ে ১৭৭.৫ রান। কোথায় ৩৫০-৪০০ আর কোথায় ১৭৭.৫! প্রথম চার ম্যাচে এর চেয়ে কম রান হয়েছিল শুধু সেই ১৯৭৯ বিশ্বকাপে। সেবার উইকেটও পড়েছিল অন্য যেকোনো আসরের তুলনায় কম—৪৬টি। এবার প্রথম চার ম্যাচে সংখ্যাটা ৫৪।
অবশ্য উইকেট বেশি হবে কীভাবে! ম্যাচগুলো যে হচ্ছিল ম্যাড়মেড়ে, একতরফা। প্রথম চার ম্যাচে আট ইনিংস কোনো দলের পুরো ৫০ ওভার শেষ হয়েছে যে শুধু উদ্বোধনী ম্যাচে ইংল্যান্ডের ইনিংসেই। ইংল্যান্ডের ৩১১ রানের জবাবে দক্ষিণ আফ্রিকা যখন গুটিয়ে যাচ্ছে, তখনো ৬১ বল বাকি। পরের তিন ম্যাচ তো সেটিকেও ‘অনেক’ মনে করাচ্ছিল। পরের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেস-বাউন্সের তোপে পাকিস্তান এমনই বিবশ যে, ১০০ ওভারের ম্যাচ শেষ ৩৫.২ ওভারে। পাকিস্তান অলআউট ১০৫ রানে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেটি পেরিয়ে গেল মাত্র ১৩.৪ ওভারে। পরের দিন নিউজিল্যান্ডের সামনে শ্রীলঙ্কার একই অবস্থা, এবার ম্যাচের স্থায়ীত্ব ৪৫.৩ ওভার। শ্রীলঙ্কার ১৩৬ রান নিউজিল্যান্ড পেরোল ১৬.১ ওভারে।
শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান যেখানে গেল তল, আফগানিস্তান তো কত জলই বলবে! বরং এশীয় দুই ‘বড় ভাই’এর চেয়ে অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রতিপক্ষের সামনে আফগানিস্তানের প্রতিরোধ আরও জোরালো হলো। ৩৮.২ ওভারে অলআউট হলো ২০৭ রানে, অস্ট্রেলিয়ার তা পেরোতে লাগল ৩৪.৫ ওভার। চার ম্যাচে ৪০০ ওভারের মধ্যে বিশ্বকাপ দেখল মাত্র ২৪২.৭ ওভার। গড়ে ইনিংসপ্রতি ৩০.৩৪ ওভার।

যে বিশ্বকাপ ব্যাটসম্যানদের হওয়ার কথা, তখন পর্যন্ত সেটি বোলারদের জয়গানই গাইছে। হ্যাঁ, ইনিংসে ৫ উইকেট কারও দেখেনি, চার উইকেটও পেয়েছেন শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওশান টমাস, কিন্তু সে তো তখন পর্যন্ত ব্যাটিংয়ে কারও সেঞ্চুরির বেলায়ও সত্যি। চার ম্যাচ শেষেও কোনো সেঞ্চুরি দেখেনি বিশ্বকাপ! প্রথম সেঞ্চুরির জন্য এর চেয়ে বেশি অপেক্ষা ছিল শুধু ইংল্যান্ডেই এর আগের বারের বিশ্বকাপের—২০ বছর আগের সেই বিশ্বকাপে শচীন টেন্ডুলকার যখন টুর্নামেন্টে প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হচ্ছেন, সেটি ছিল টুর্নামেন্টের ১৫তম ম্যাচ। এবারের আগের ১১ বিশ্বকাপের মধ্যে আটবারই প্রথম ম্যাচে হয়েছে সেঞ্চুরি, ১৯৯৯ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ ছাড়া কখনো দুই ম্যাচের বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি সেঞ্চুরি দেখার জন্য।
ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিত প্রতিটি বিশ্বকাপেই মূলত বিশ্বকাপের প্রথমদিকে সেঞ্চুরির খরা দেখা গেছে দারুণভাবে। প্রথম তিন আসরে চার ম্যাচশেষে সেঞ্চুরিসংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২,১, ১। আর এরপর ১৯৯৯ বিশ্বকাপের কথা তো আগেই বলা হয়েছে। এবার সেঞ্চুরির অপেক্ষাটা ঘুচেছে কাল ষষ্ঠ ম্যাচে। একটা নয়, দু-দুটি সেঞ্চুরিই দেখা হলো। করেছেন ইংল্যান্ডের জো রুট ও জস বাটলার। তাতেও অবশ্য দলকে জেতাতে পারেননি। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটি পাকিস্তানই যে জিততে যাচ্ছে, সেটির কিছুটা ধারণা পেতেও অপেক্ষা করতে হয়েছে ৪৮ ওভার পর্যন্ত—ওয়াহাব রিয়াজ যখন পরপর দুই বলে ফিরিয়ে দিলেন মঈন আলী ও ক্রিস ওকসকে। বিশ্বকাপ দেখল টান টান উত্তেজনাপূর্ণ দ্বিতীয় ম্যাচ।
এতটা না হলেও প্রথম উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচটির কৃতিত্ব বাংলাদেশের। ব্যাট হাতে গড়ল ৩৩০ রানের পাহাড়, বল হাতেও শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকাকে আটকে দিল মাত্র ৩০৯ রানেই। ৪৮তম ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকার শেষ স্বীকৃত ব্যাটসম্যান জেপি ডুমিনি আউট হওয়ার পরই বাংলাদেশ মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেল—যাক, জয় তাহলে আসছে!
বিশ্বকাপও হয়তো হাঁফ ছাড়ল ওই ম্যাচের পর—যাক, ম্যাচে তাহলে প্রাণ ফিরেছে!

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন