default-image
>বিশ্বকাপ জয়ের ১০ দিনের মাথায় টেস্টে নিজেদের ঘরের মাঠে ১৪২ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষণস্থায়ী ইনিংসটি খেলল ইংল্যান্ড!

ইংলিশরা বীরের জাতি। নানা পদের নানা জাতের ‘নাইট’ আছে তাদের ইতিহাসে। এই তো প্রায় দিন দশেক আগে বিশ্বকাপ জিতল ইংল্যান্ড, বেন স্টোকসকে ‘নাইটহুড’ দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে কথা চলছে। এমনিতে কোনো সাফল্য পেলে ইংরেজ সংবাদমাধ্যম তা আরও রসিয়ে বলতে এক কাঠি সরেস। বিশ্বকাপ জয়ের পর গোটা ইংল্যান্ড এখনো সেই রসে সিক্ত। ‘ক্রিকেটের জনক’ হয়ে এত বছর পর প্রথম বিশ্বকাপ জয় বলে কথা। অথচ তাদের প্রতিবেশী হয়েও আয়ারল্যান্ড এত বেরসিক। ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপজয় উদ্‌যাপনে কি না জল ঢেলে দিল!

ইংলিশ সমর্থকদের জন্য সে জল দানা বাঁধতে পারে চোখে। আর ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের জন্য তা নাকে-চোখে সবখানেই। অথচ কথা ছিল উল্টো, লর্ডসে আয়ারল্যান্ডের এটাই প্রথম টেস্ট। কাউন্টি ক্রিকেটের জন্য এখানকার কন্ডিশন আইরিশ ক্রিকেটারদের অচেনা নয়। কিন্তু ম্যাচটা তো টেস্ট, আর প্রতিপক্ষ এ মাঠেই কিছুদিন আগে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের খেতাবজয়ী ইংল্যান্ড, তারা আবার স্বাগতিক দলও। অথচ এমন বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ঘরে ঢুকেই কি না, আইরিশ পেসাররা মেরে এল!

কথা হচ্ছিল, জল নিয়ে। সাধারণ ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যায় চার দিনের এ টেস্টে প্রতি সেশনেই ইংল্যান্ডের রাজত্ব করার কথা। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার টাটকা স্মৃতি হবে তাতে মূল প্রেরণা। কিন্তু জো রুটের দল হয়তো ভুলেই গিয়েছিল, ক্রিকেট এখনো গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। তাই গত বছর টেস্ট মর্যাদা পাওয়া আইরিশদের বিপক্ষে আজ লর্ডস টেস্টের প্রথম দিনেই নাকের জল চোখের জল এক হয়ে গেল ইংলিশদের। প্রথম ইনিংসে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ১০০ রানও তুলতে পারেনি! অলআউট হয়েছে ৮৫ রানে। লাঞ্চের আগে তো বটেই গোটা ইনিংসে ইংল্যান্ডের ১০ ব্যাটসম্যান মিলে খেলতে পেরেছেন মাত্র ১৪২টি বৈধ বল।

এই অবাক, আশ্চর্য-পতনকে আরেকটু ব্যাখ্যা করা যায়। ৯.৫ ওভার থেকে ১৩ ওভার—এই ২০ বলের মধ্যে ইংল্যান্ড হারিয়েছে গোটা ব্যাটিং অর্ডার! তৃতীয় ওভারে জেসন রয় ফিরে গিয়ে পতনের মুখ খুলে দিয়েছিলেন। ১০ম ওভারের পঞ্চম বলে ফিরলেন জো ডেনলি। ব্যস, সেই শুরু। পরের ওভারে ররি বার্নস, তারপরের ওভারে জো রুট, তারপর এক ওভারে জোড়া পতন—জনি বেয়ারস্টো ও ক্রিস ওকস। ৪২ রানে নেই ৬ উইকেট! এরপর লেজের ব্যাটসম্যানেরা আর কী করবে!

স্কোরবোর্ডে আরও ১ রান যোগ করতে পতন হলো সপ্তম উইকেটের। ততক্ষণে নাক উঁচু ইংলিশ সমর্থকদের নাক কাটা পড়ার দশা। প্রতিপক্ষ আয়ারল্যান্ড হলেও লর্ডসে আজ গ্যালারি চোখে পড়ার মতো ফাঁকা থাকেনি। হয়তো রুট-ব্রডদের রান কিংবা উইকেট উৎসব দেখার আশা নিয়েই এসেছিলেন তারা। কিন্তু এ আশ্চর্য-পতন দেখে অনেকে হয়তো ফিরে গিয়েছিলেন ইতিহাসের পাতায়। ১৩১ বছর আগে এই লর্ডসেই এমন এক দিন চোখ রাঙিয়েছিল ইংল্যান্ডকে।

১৮৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫৩ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। লর্ডসে টেস্টে এটাই ইংল্যান্ডের সর্বনিম্ন স্কোর। রুট হয়তো ভাবছেন, ভাগ্যিস রেকর্ডটি আজ নতুন করে লেখানো থেকে বাঁচা গেছে। ডব্লিউ জি গ্রেসরা তবু সান্ত্বনা পাবেন, তাঁদের প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া। আর রুটদের আয়ারল্যান্ড—এমন দলের বিপক্ষে অমন কিছু হলে বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ ভেসে যেত টেমসের জলে।

তবে যতটুকু হয়েছে তাতেই ভেসে যায় আরকি! টেস্টে ঘরের মাঠে বলের হিসেবে (২৩.৪) এটাই ইংল্যান্ডের সবচেয়ে ক্ষণস্থায়ী ইনিংস। ১৩১ বছর আগে ইংল্যান্ডের সেই চরম পতনে ৫ উইকেট নিয়ে সাহায্য করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান পেসার চার্লি টানার। ৩ উইকেট নিয়েছিলেন জে জে ফেরিস। আজ ৫ উইকেট নিয়ে টার্নারের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছিলেন ইংল্যান্ডেই জন্ম নেওয়া পেসার টিম মারটগ। আর ৩ উইকেট নিয়ে ফেরিসের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছিলেন মার্ক অ্যাডাইর।

আসলে দিন বদলের সঙ্গে স্মৃতিও পাল্টায়। এই যে দেখুন গত ১৪ জুলাই লর্ডসে বিশ্বকাপ জিতল ইংল্যান্ড। মাত্র ১০ দিন পর সে মাঠেই স্মৃতির কী আশ্চর্য রূপান্তর! আর এ রূপান্তরটুকু যারা ঘটাল সেই আয়ারল্যান্ড খেলতে নেমেছে তাদের ইতিহাসের তৃতীয় টেস্ট। আর ইংল্যান্ড খেলছে তাদের ইতিহাসে ১০১১তম টেস্ট। ম্যাচসংখ্যা ও শক্তিতে দুই দলের যোজন যোজন পার্থক্য। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না ক্রিকেট এখনো গৌরবময় অনিশ্চয়তারই খেলা। আরও প্রমাণ চাই? ১০দিন আগে এই লর্ডসেই বিশ্বকাপে কী ফাইনালটাই না হলো!

১০দিন পর সেই লর্ডসেই বিশ্বকাপজয়ী দল কী নাকানিচুবানিটাই না খাচ্ছে!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন