বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সাকিব বরং ১৯৫০ বিশ্বকাপ ফুটবলে উরুগুয়ে অধিনায়ক ওবদুলো ভ্যারেলার উক্তি মনে করতে পারেন। মারাকানায় লক্ষাধিক ব্রাজিল সমর্থকের সামনে দল নিয়ে মাঠে ঢুকতেই দর্শকদের বজ্রনিনাদে ভীতির সঞ্চার ঘটেছিল উরুগুয়ে দলে। অভয় দিয়ে ভ্যারেলা তাঁর সতীর্থদের বলেছিলেন, ‘ভেবো না, গ্যালারির কেউ খেলবে না।’

সত্যি বলতে মাঠের কাজটা খেলোয়াড়ের। আর সাকিব নিজেই বলেছেন আইপিএলই বিশ্বকাপের সেরা প্রস্তুতি। দলের সেরা খেলোয়াড় বিশ্বকাপের জন্য যত ভালোভাবে প্রস্তুত হবেন, দলের জন্য তত ভালো। বলা হচ্ছে, আইপিএল দিয়ে সাকিবের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিটা হয়ে গেছে। আসলেই কি তা–ই?

default-image

সাকিবের বিশ্বকাপ প্রস্তুতির প্রসঙ্গে সবার আগে উঠে আসে ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ৮৬.৫৭ গড়ে সে বিশ্বকাপে ৬০৬ রান করা সাকিব অনেকের বিচারেই ছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়। শুধু কি তা–ই, টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হতে না পারলেও ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ শিরোনাম করেছিল, ‘বাংলাদেশ তারকা সাকিব আল হাসান কেন অবিসংবাদিতভাবে ২০১৯ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়।’

ব্যাট হাতে তখন সম্ভবত জীবনের সেরা ফর্মে থাকা সাকিব সে বিশ্বকাপের আগে আইপিএলে খেলেছিলেন মাত্র ৩ ম্যাচ। ৯ রানের পাশাপাশি উইকেট নিয়েছিলেন ২টি। আইপিএলের এ পরিসংখ্যান নিশ্চয়ই সে বিশ্বকাপে সাকিবের প্রস্তুতির পক্ষে কথা বলে না।

কিন্তু খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি কি পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায়? কিংবদন্তি ক্রিকেট লিখিয়ে স্যার নেভিল কার্ডাস হয়তো এসব ভেবেই বলেছিলেন, ‘পরিসংখ্যান আস্ত গাধা!’

সাকিবের বিশ্বকাপ প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও কথাটি খাটে। শুধু সাকিব কেন, পৃথিবীর তাবৎ খেলোয়াড়দের প্রস্তুতিই আসলে অন্তর্নিহিত ম্যাচ খেলার সুযোগ পান আর না পান, খেলোয়াড় নিজেই বুঝতে পারেন, তাঁর কাজটা হচ্ছে কি না। এসব ক্ষেত্রে আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের সঙ্গে থাকা, ম্যাচ পরিস্থিতি, নেট অনুশীলন, ড্রেসিংরুমের পরিবেশ—খুব কাজে দেয়। তাতেও সন্তুষ্ট হতে না পারলে সাকিবের মতো খেলোয়াড়েরা বিকল্প বেছে নেন।

default-image

২০১৯ বিশ্বকাপের আগে যেমন ‘গুরু’ ও প্রিয় কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে ভারতে ডেকে নিয়ে আলাদা করে অনুশীলন করেছিলেন সাকিব। এর সঙ্গে আইপিএলের ম্যাচে সুযোগ না পাওয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না। সেই উদাহরণ যেহেতু চোখের সামনেই জ্বলজ্বল করছে, তাহলে এবারের আইপিএলে সাকিবের প্রস্তুতিতে তাকানো যাক।

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এবার আইপিএল স্থগিত হওয়ার আগে টুর্নামেন্টটির প্রথম পর্ব হয়েছে ভারতে। তখন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ভারতেই হওয়ার কথা ছিল। আইপিএলের সেই পর্বে ৩ ম্যাচ খেলেছিলেন সাকিব।

আহামরি পারফরম্যান্স ছিল না—৩৮ রান ও ২ উইকেট। আইপিএলে খেলতে যাওয়ার আগে বিতর্কও হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দেশের হয়ে টেস্ট না খেলে চলে যান ভারতের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে। সাকিব এর জবাবে বলেছিলেন, ভারতে অনুষ্ঠেয় আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিতেই আইপিএলে খেলা জরুরি মনে করেছেন।

কিন্তু পারফরম্যান্স ভালো না হওয়ায় সতীর্থদের জন্য তাঁর পানি-টাওয়েল টানার ছবি নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাতে সাকিবের মানসিকতায় চিড় ধরেনি।

default-image

সে পর্বে কলকাতা নাইট রাইডার্সের সঙ্গে যত দিন ছিলেন, তাতেই বিশ্বকাপের প্রস্তুতি হয়ে গেছে বলে যুক্তি দেখান তিনি—সেটা অবশ্যই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ভারতে হবে, এ বিষয় মাথায় রেখে, ‘ম্যাচ হয়তো কম খেলেছি, তবে অনুশীলন করে এবং এখানে থেকেও অনেক কিছু ধারণা করা সম্ভব। আমি এখন জানি, ভারতে যদি বিশ্বকাপটা শেষ পর্যন্ত হয়, কোন কোন জায়গায় আমার কাজ করতে হবে, কোন কোন জায়গায় আমার আরও উন্নতি করা দরকার। এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা হয়ে গেছে।’

ভারতে বিশ্বকাপ হবে, এটা মাথায় নিয়ে ভারতের কন্ডিশনে আইপিএল খেলে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাকিব। কিন্তু ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি কিন্তু সাকিবকে নিতে হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কন্ডিশনে—ভারতে খেলে ইংলিশ কন্ডিশনের প্রস্তুতি এবং তাতে অবিশ্বাস্য রকম সফল।

তাহলে প্রশ্ন হলো, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ যেখানে (আরব আমিরাত) অনুষ্ঠিত হবে, সেখানে যেহেতু আইপিএল হচ্ছে, তাহলে অন্তত কন্ডিশন বুঝে খেলার প্রস্তুতিটা তাঁর সেরে ফেলার কথা?

default-image

উত্তর—অবশ্যই। ম্যাচে সুযোগ পান আর না পান, একটা প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টে মাঠের বাইরে বসে থাকলেও কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কায়দাটা আপনাই রপ্ত হয়। ড্রেসিংরুম থেকে মাঠে যাওয়া-আসা, অনুশীলন এবং সতীর্থদের একসঙ্গে সময় কাটানোর মধ্যে প্রচুর ক্রিকেটীয় ভাবনা চালাচালি হয়।

কার কেমন প্রস্তুতি, কে কোথায় ‘ফাইন টিউনিং’ করে নিচ্ছেন, আরব আমিরাতে কন্ডিশন বুঝে ম্যাচে কোন সময়ে কী করতে হবে—এসব টিম মিটিং কিংবা আড্ডাতেই বেরিয়ে আসে। তখন নিজের প্রস্তুতির ভিত কতটা শক্ত, তা বোঝা যায়। সাকিব তা না বোঝার মতো বোকা নন বলেই সুযোগ পাওয়ামাত্র দুই হাতে গ্রহণ করেছেন।

আইপিএলে সাকিবকে নিয়ে দেশের সমর্থকদের মনে এখন যে দখিনা হাওয়া বইছে, আরব আমিরাত পর্বের শুরুতে কিন্তু তেমন ছিল না। দলে জায়গা পাচ্ছিলেন না সাকিব। আন্দ্রে রাসেল চোটে পড়ায় দ্বার খোলে এবং তারপর ম্যাচে দলের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে সাকিবের পারফরম্যান্সই বলে দেয়, প্রস্তুতি ঠিকমতোই হচ্ছে।

ভুলে গেলে চলবে না, সাকিব যদি আরব আমিরাত পর্বে কোনো ম্যাচে সুযোগ না–ও পেতেন, তবু প্রস্তুতিটা খারাপ হতো না। একই কন্ডিশন, একই উইকেট এবং সেই ২০ ওভারেরই ম্যাচ—অসুবিধা হতো না।

default-image

তবু ম্যাচ অনুশীলন বলে একটা কথা আছে। এটুকু না পেলে মনের মধ্যে যে খটকা থেকে যেত, এখন তা নেই। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ম্যাচ অনুশীলনের ঘাটতি আইপিএলে সাকিব কীভাবে মিটিয়ে নিচ্ছেন, সে বিষয়ে একটু গভীরে চোখ রাখা যায়। তার আগে ভুলে গেলে চলবে না, প্রত্যাবর্তনে সাকিবের জুড়ি মেলা ভার।

রাসেল চোটে পড়ার পর সাকিব কলকাতার একাদশে সুযোগ পাওয়ামাত্রই পারফরম্যান্স দিয়ে বুঝিয়েছেন, সাদা বলে তিনি এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার।

আরব আমিরাতে আইপিএলে সাকিবের ব্যাটিং-বোলিংয়ের পরিসংখ্যানে তাকিয়ে তাঁর প্রস্তুতি নিয়ে আঁচ করা যায় সামান্যই। যে ৪ ম্যাচে তিনি খেলার সুযোগ পেয়েছেন, প্রতিটি ম্যাচে তাঁর শরীরী ভাষা থেকে ম্যাচ পরিস্থিতিতে কতটুকু সাড়া দিয়েছেন, সেটা মুখ্য। কাল দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে শিখর ধাওয়ানের ক্যাচটির কথাই ধরুন—দৌড়ে এসে ডাইভ দিয়ে ক্যাচটি নিয়ে দিল্লির ইনিংসের মোড় ঘুরিয়ে দেন সাকিব।

উইকেটে থিতু হওয়ার পর ঠিক যে সময়ে ধাওয়ানের চড়াও হওয়ার কথা ছিল, তখনই সাকিবের ওই ক্যাচ। শারজার মন্থর উইকেটে মার্কাস স্টয়নিস, ঋষভ পন্ত ও শিমরন হেটমায়াররা মহাসমুদ্রে পতিত হলেও ধাওয়ানকে নিয়ে কলকাতার মাথাব্যথা ছিল। ইনিংসের বাকি ৫ ওভারে না জানি কী করে বসেন! কিন্তু ধাওয়ান ও দিল্লিকে বেশি দূর এগোতে দেয়নি সাকিবের ওই ক্যাচ। প্রয়োজনের মুহূর্তে পারফর্ম করার এ ধারা বজায় রাখাই তো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি।

default-image

কিংবা দিল্লির ইনিংসে সাকিবের করা প্রথম ওভারটা মনে করে দেখুন। আরব আমিরাতেই রাজস্থান রয়্যালসের বিপক্ষে ইনিংসের প্রথম ওভারে বল করে ১ রানে ১ উইকেট নেন সাকিব। কাল দিল্লির বিপক্ষেও প্রথম ওভার সাকিবকে দিয়ে করান এউইন মরগান। এবার উইকেট না পেলেও মাত্র ১ রান দেন।

টি-টোয়েন্টি ম্যাচে শিখর ধাওয়ান ও পৃথ্বী শর মতো ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে প্রথম ওভার করার চাপটা একবার ভেবে দেখুন, যেখানে আরব আমিরাতের কন্ডিশন ও উইকেট ধাওয়ান-পৃথ্বীদের ‘ঘর’ ভারতের মতোই।

সেখানে তাঁদের আটকে রাখা কিংবা ১৩তম ওভারে—যখন রান তোলার তাড়া—গিয়ে শ্রেয়াস আইয়ার-ধাওয়ানকে মাত্র ৪ রান দেওয়া, এসবই তো প্রস্তুতির অংশ। মাঝে একটু বেশি রান দিয়ে ফেললেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৮ রান দিয়ে ৪ ওভারের কোটা শেষ করে ফিরে আসার কৌশলেও শান দিয়ে নিয়েছেন সাকিব। হ্যাঁ, উইকেটও থাকত যদি তাঁর বলে ধাওয়ানকে স্টাম্পিংয়ের সুযোগ নষ্ট না করতেন দীনেশ কার্তিক।

default-image

আরব আমিরাত পর্বে ব্যাটিংয়ে তেমন ভালো করতে পারেননি সাকিব। কিন্তু এলিমিনেটরে সেই ‘স্কুপ’ খেদ মিটিয়ে দিতে পারে। চাপের মুহূর্তে ওই স্কুপের চারে ম্যাচটি সহজ হয়ে যায় কলকাতার। একটি শট দিয়ে ব্যাটিং যাচাই হয়তো করা যায় না, কিন্তু চাপের মুহূর্তে ভেঙে না পড়ে উদ্ভাবনী শট খেলার মুনশিয়ানাও তো শান দেওয়া হয়ে গেল সাকিবের। কে না জানে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এসব শট খেলার সর্বোচ্চ মঞ্চ। সেই মঞ্চ যেখানে বসবে—আরব আমিরাত—সেখানকার মাটি-জল-হাওয়াকে জানা শেষ সাকিবের।

এবার সেখানে ফসল ফলানোর পালা। হবে নাকি আরেকটি ‘২০১৯ বিশ্বকাপ!’

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন