দৃঢ়চেতা লড়াই দেখল সিডনি।
দৃঢ়চেতা লড়াই দেখল সিডনি।ছবি: এএফপি

দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই বোধ হয় এটাকেই বলে! সিডনি টেস্টের শেষ দুই ঘণ্টা রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর হনুমা বিহারি অস্ট্রেলীয় বোলিং আক্রমণের ভয়ংকর শেলগুলো কেবল ঠেকিয়ে গেলেন। মহাগুরুত্বপূর্ণ এক জুটি গড়ে ভারতকে হারের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলেন তাঁরা, অসাধারণ ধৈর্য আর দৃঢ়চেতা মনোভাবকে সম্বল করে। বোর্ডার-গাভাস্কার সিরিজে তৃতীয় টেস্ট শেষেও স্কোরলাইন হয়ে রইল ১-১। মীমাংসার লড়াইটা তোলা রইল ব্রিসবেনের চতুর্থ ও শেষ টেস্টের জন্য। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩১ ওভার ব্যাটিং করেছে ভারত। টেস্টের চতুর্থ ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এশীয় দলগুলোর মধ্যে ড্র টেস্টে যা সর্বোচ্চসংখ্যক ওভার ব্যাটিংয়ের নজির। ইতিহাস গড়ে জিততে হতো ভারতকে। কিন্তু সিডনিতে ড্র করে যেন নতুন ইতিহাসই গড়েছে তারা।

পঞ্চম দিন সকালটা খুব ভালোভাবে শুরু করতে পারেনি ভারত। ২ উইকেটে ৯৮ রান নিয়ে দিন শুরু করে দলীয় ১০২ রানের মাথাতেই অধিনায়ক অজিঙ্কা রাহানেকে হারাতে হয় তাদের। ৪০৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে এমনিতেই পাহাড় ডিঙানোর কাজটা করতে হচ্ছিল ভারতকে। এর মধ্যে রোহিত শর্মা আর অজিঙ্কা রাহানেকে হারিয়ে বসে কোহলিহীন ভারতীয় দলের কাজটা কঠিন হয়ে গিয়েছিল আরও বেশি। কিন্তু চেতেশ্বর পূজারা আর ঋষভ পন্ত পথ দেখিয়েছিলেন লড়াইয়ে।

শুধু তা-ই নয়, এই দুজন ১৪৮ রানের জুটি গড়ে উল্টো অস্ট্রেলিয়াকেই চাপে ফেলে দিয়েছিলেন। একটা সময় তো এ দুজনের খেলা দেখে দূর দিগন্তে ইতিহাস গড়ার স্বপ্নটাও উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছিল ভারতীয় সমর্থকদের মনে। পন্ত খেললেন ৯৭ রানের ইনিংস। পূজারা ৭৭। পন্তের দুর্ভাগ্য তিনি দারুণ একটা সেঞ্চুরি পাননি। দু-দুবার জীবন পাওয়া ইনিংসটাকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করে ভারতকে স্বপ্নের কাছে নিতে পারেননি। যে নাথান লায়নকে অবলীলায় টি-টোয়েন্টি কেতায় খেলেছেন, সেই লায়নের বলেই স্কয়ার ড্রাইভ খেলতে গিয়ে প্যাট কামিন্সের হাতে ধরা পড়েন তিনি।

default-image
বিজ্ঞাপন

আউট হয়ে তিনি যখন প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটছিলেন, তখনই বোঝা যাচ্ছিল তাঁর হতাশার ব্যাপারটা। পা যেন চলছিলই না। ২০১৮-১৯ সালের সফরে এই সিডনিতেই তাঁর ১৫৯ রানের দুর্দান্ত সেই সেঞ্চুরির পুনরাবৃত্তি করার একটা সুযোগ ছিল। কিন্তু হয়নি। ১১৮ বলে ১২টি বাউন্ডারি আর ৩টি ছক্কায় সাজানো তাঁর ইনিংসটি বড় হতে না পারা ভারতীয় দলের জন্যও ছিল বিশাল হতাশা। সেই হতাশা দূর করার সুযোগ ছিল পূজারার সামনে। কিন্তু তিনি ২০৫ বল খেলে বিদায় নেন। ২৭২ রানের মাথায় পূজারা যখন ফেরেন, তখন হারের শঙ্কাই পেয়ে বসেছিল ভারতকে। বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান বলতে তখন কেবল তরুণ হনুমা বিহারি। রবীন্দ্র জাদেজার হাতে চোট। অশ্বিন অভিজ্ঞ, কিন্তু তিনি তো আর বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান নন। কিন্তু এই অশ্বিন আর বিহারিই হিসাবটা যে পুরোপুরি উল্টে দিলেন।

এই দুজন আসলে দেখিয়ে দিয়েছেন টেস্টের প্রয়োজনীয় ব্যাটিংটা আসলে কেমন হয়। দলের প্রয়োজনে আসলে কীভাবে খেলতে হয়। ভাবা যায়, বিহারি কিংবা অশ্বিন একটাও বাজে শট খেলেননি! অস্ট্রেলীয় ফাস্ট বোলারদের বল তাঁদের দুজনের গায়ে লেগেছে, হাতে লেগেছে, কিন্তু তাঁরা ভয় পাননি কিংবা ধৈর্যহারা হননি। বিহারি ২৩ রান করেছেন ১৬১ বল খেলে। অশ্বিন ১২৮ বলে করেছেন ৩৯। ২৫৮ বল খেলেছেন তাঁরা। এটাকে ‘ব্লকাথন’ বললে কি খুব বাড়িয়ে বলা হয়? সিডনির চতুর্থ দিনের উইকেটে অস্ট্রেলীয় বোলারদের সামনে যে দেয়াল তাঁরা দুজন গড়ে তুললেন, ভারতীয় ক্রিকেটের ‘দ্য ওয়াল’ রাহুল দ্রাবিড়ের ৪৮তম জন্মদিনের দিন সেটি হতে পারে গ্রেটকে দেওয়া সবচেয়ে দারুণ উপহার।

default-image

বিহারির জন্য কাজটা অনেক বেশি কঠিন ছিল। অস্ট্রেলিয়া সফরে তাঁকে দলে নেওয়া হয়েছিল বড় কিছুর প্রত্যাশা থেকেই। কিন্তু প্রথম দুই টেস্টে তাঁর কাছ থেকে তেমন কিছু দেখা যায়নি। সিরিজ শুরুর আগে অধিনায়ক বিরাট কোহলি যে খেলোয়াড় সম্পর্ক খুবই উচ্চ ধারণা পোষণ করেছিলেন, তাঁর জন্য বিষয়টা ছিল হতাশার। সিডনি টেস্টে একাদশে সুযোগ পেলেও এটি ছিল তাঁর জন্য নিজেকে প্রমাণের একধরনের অগ্নিপরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় তিনি সেঞ্চুরি করে নিজেকে প্রমাণ করেননি, করতে পারেননি ফিফটিও। কিন্তু কী অসাধারণ এক ইনিংসই না খেললেন তিনি। হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট নিয়ে, কঠিন হয়ে পড়া উইকেটে তাঁর চোয়ালবদ্ধ এ লড়াই মনে থাকবে। স্কোরবোর্ড দেখাবে বিহারির পাশে ২৩ রান। কিন্তু কী পরিস্থিতিতে, কতটা চাপের মুখে তিনি এটি খেলেছেন, সেটি মনে রাখবে ইতিহাস। অশ্বিনের ইনিংসটি নিয়েও প্রায় একই কথাই প্রযোজ্য। বিহারি-অশ্বিন জুটি যেভাবে অস্ট্রেলিয়ার ভয়ংকর ফাস্ট বোলারদের হাতে থেকে ছুটে আসা নতুন বলের গোলা সামলেছেন, সেটি ভারতীয় ক্রিকেটের বর্তমান শক্তিমত্তারও দারুণ বিজ্ঞাপন।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন