default-image

অন্যলোকে কোনো জায়গায় তুমুল করতালি, পানপাত্রের ঝনঝনানি আর প্রচুর উচ্ছ্বাস। অতিথিদের ভিড়ে তিল ধারণের ঠাঁই নেই! সবাই আকাশের তারার মতো জাজ্বল্যমান। স্যার ডন ব্র্যাডম্যান থেকে সবচেয়ে কম বয়সে ঠিকানা পাল্টানো টেস্ট ক্রিকেটার মানজারুল ইসলামও আছেন। কিন্তু বিশেষ অতিথি এমন একজন, যাঁর সঙ্গে অন্তত ক্রিকেটের কোনো যোগসূত্র নেই। রোমান সমরনায়ক জুলিয়াস সিজার!

কেক কাটার গুরুভার ডেভ গ্রেগরি ও জেমস লিলিহোয়াইট জুনিয়রের ওপর। হাজার হোক, এই ১৪৪ বছরের অভিযাত্রা শুরুর প্রথম দিনে এ দুজন ছিলেন নেতৃত্বে। কিন্তু সিজারকে সসম্মানে নিয়ে আসা হয়েছে অন্য কারণে।

আনুমানিক ২০৬৫ বছর আগে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে খুন হয়েছিলেন সিজার। রাশভারী এই সর্বজয়ী যোদ্ধা হয়তো কাউকে ডেকে জিজ্ঞেস করবেন, তোমাদের এই ধান ভানায় আমি তো শিবের গীত, হে!

ঠিক তখনই হয়তো জিভে কামড় দিয়ে এগিয়ে আসবেন আরেক জুলিয়াস সিজার। তিনি সারে কিংবদন্তি। খুব আদবের সঙ্গে নিজের নামের পূর্বসূরিকে এই সিজার হয়তো একটু বোঝাবেন, ‘আমরা এই আনন্দলোকে যে কারণে কেক কাটছি, সেখানে আপনাকে রাখার কারণ দুটি—প্রথম, এটা একটা খেলা, যা ভদ্রলোকের লেবাস ছেড়ে এখন ওখানে যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। আর যুদ্ধের কথা উঠলে আপনার চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কে হতে পারে!’

‘হয়তো আরও দু–একজন আছেন। কিন্তু আপনি বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিলেন। আমাদের এই খেলাটাও তাই ; কথা ছিল, এটাই হবে ক্রিকেটের একমাত্র ও সেরা সংস্করণ। কিন্তু মার্ক অ্যান্টনি ও ব্রুটাসের মতো ওখানকার লোকের প্রয়োজনের তো শেষ নেই! তাই টেস্টের পরও আরও দুটি সংস্করণ নিয়ে এসে লোকে প্রচুর পয়সা কামাচ্ছে। দ্বিতীয় কারণটা হলো, আমাদের এই খেলাটা যার নাম “টেস্ট”—যেদিন ওখানে এ খেলার জন্ম, ঠিক সেদিনই আপনি এখানে এসেছেন।’

বিজ্ঞাপন

সিজার হয়তো সেদিনের সেই জন্মলগ্নের পূর্বাপর শুনতে চাইবেন। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন ক্রিকেটকে গল্পের মতো পেশ করা সেই সঙ্গীতজ্ঞ স্যার নেভিল কার্ডাস।

জেমস লিলিহোয়াইট সে সময় অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক হিসেবে ডেভ গ্রেগরির ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তখন নিচের পৃথিবীটা এমন ছিল না। মূলত ব্যবসা প্রাধান্য দিয়ে সাউদাম্পটন বন্দর থেকে ১৮৭৬ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে জাহাজে চড়েছিল ইংল্যান্ড ‘পেশাদার’ দল। মানচিত্রের ভাষায়, পৃথিবীর এক প্রান্ত–আরেক প্রান্ত।

তখনো ওভার হতো চার বলে, আর আন্ডারআর্ম বোলিংয়ের অস্তিত্বও একেবারে মুছে যায়নি।

default-image

ইংল্যান্ড যে সেবারই প্রথম অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিল, তা নয়। এর আগে চারবার অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিল ইংল্যান্ড। এর মধ্যে তিন বছর আগে সর্বশেষ সফরের নেতৃত্বে ছিলেন ডব্লিউ জি গ্রেস। তখন পেশাদার ও অপেশাদার ক্রিকেটারদের মধ্যে ঝামেলাটা চোখের সামনেই দেখেছিলেন লিলিহোয়াইট। ১৮৭৭ সালের সফরে লিলিহোয়াইট তাই দল গড়েছিলেন সব পেশাদার (প্রফেশনালস) খেলোয়াড়দের নিয়ে।

প্রথম টেস্ট খেলার আগেই অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে ১৭টি ম্যাচ খেলে ফেলেছিল লিলিহোয়াইটের দল। এসব ম্যাচ ছিল টাকা তোলার জন্য। প্রতিপক্ষ দলে কিছু ম্যাচে খেলোয়াড়সংখ্যা ছিল ২০ জন! আর অপেশাদারদের (অ্যামেচার) রেখে আসায় ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়সংখ্যা ছিল ১২ জন। তাঁদের ভয়ঙ্কর ক্লান্ত থাকার কথা!

ওদিকে অস্ট্রেলিয়ার দলগুলো ইংল্যান্ডের তুলনায় তেমন শক্তিশালী ছিল না। এ কারণে কোনো কোনো ম্যাচে ২২ জন প্রতিপক্ষের সম্মুখীনও হতে হয়েছে ইংল্যান্ডকে। নিউক্যাসল এক্সএক্সটুর বিপক্ষে ৫০ রানে আলফ্রেড শর ১৯ উইকেট নেওয়ার পরিসংখ্যান তার প্রমাণ।

রাজ্য দলগুলোর সঙ্গে এভাবে খেলতে খেলতে নিউজিল্যান্ডে ৮ ম্যাচ খেলেছিল লিলিহোয়াইটের দল। এই সফরেই সেখানে নিয়মিত উইকেটরক্ষক টেড পুলিকে রেখে আসতে বাধ্য হন লিলিহোয়াইট। পুলি ছিলেন মজ্জাগত জুয়াড়ি। নিউজিল্যান্ডে এক জুয়ায় গোল বাধিয়ে শ্রীঘরে (জেল) যেতে হয় পুলিকে। লিলিহোয়াইটের কিছুই করার ছিল না।

তবে পুলির অভাব টের পেয়েছিলেন লিলিহোয়াইট। ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ৪৫ রানে জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া। এর মধ্যে ‘বাই’ বাবদ ৯ রান দিয়েছিল ইংল্যান্ড। তারা পারলে উইকেটরক্ষক হিসেবে জন শেলবির জায়গায় পুলিকে ফিরিয়ে আনত।

default-image

পুলি না আসায় পাক্কা ১১ জন নিয়েই অস্ট্রেলিয়ার বন্দরে নোঙর করে লিলিহোয়াইটদের জাহাজ। দেশটিতে পা রাখার প্রায় ২৪ ঘন্টা পরই ভিক্টোরিয়ানসদের কাছ থেকে খেলার প্রস্তাব পায় ইংল্যান্ড দল। লিলিহোয়াইট একাদশের (ইংল্যান্ড) বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার সম্মিলিত একটি দল খেলবে, প্রতি দলে খেলোয়াড়সংখ্যা ১১ জন করে। ভিক্টোরিয়া ও নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের কর্তৃপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার এই দল বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

সেদিন ১৫ মার্চ, সফরের ১৮তম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার সম্মিলিত একাদশের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হওয়াকে টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম ম্যাচ হিসেবে ধরা হয়। দুটি প্রায় সমশক্তির দলের তুলনামূলক ‘পরীক্ষা’ থেকেই টেস্ট নামের উৎপত্তি।

সেই ম্যাচের আগে ইংল্যান্ড দলের অবস্থা ছিল তথৈবচ। টানা খেলায় সবাই ভীষণ ক্লান্ত। এর মধ্যে অতিরিক্ত উইকেটরক্ষক হ্যারি জাপ চোখের প্রদাহে ভুগছিলেন। আর ৪৯ বছর বয়সে টেস্ট অভিষেকের অপেক্ষায় ছিলেন জেমস সাউদারটন—সবচেয়ে বেশি বয়সে টেস্ট অভিষেকের রেকর্ড এখনো তাঁর দখলে। টেস্ট ক্রিকেটারদের মধ্যে সবার আগে এখানে (মৃত্যু) আসার রেকর্ডও (!) তাঁর।

বিজ্ঞাপন

ওদিকে জাপের হাতে উইকেটরক্ষকের গ্লাভস তুলে নেওয়ায় আস্থা পাননি লিলিহোয়াইট। তাঁকে ওপেনার হিসেবে পাঠিয়ে ভুলও করেননি ইংল্যান্ড অধিনায়ক। ইংল্যান্ডের দুই ইনিংস মিলিয়ে যে এক ফিফটি (প্রথম ইনিংস), সেটি তাঁর কাছ থেকেই এসেছিল।

সমস্যা অস্ট্রেলিয়া দলেও ছিল। ভিক্টোরিয়া ও নিউ সাউথ ওয়েলসের মধ্যে ম্যাচের প্রস্তুতি নিয়ে এমনিতেই ঝামেলা চলছিল। এর মধ্যে তখন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সেরা পেসার ফ্রেড স্পোফোর্থ খেলতে বেঁকে বসেন। সম্মিলিত অস্ট্রেলিয়া দলের উইকেটরক্ষক তাঁর পছন্দ হয়নি। স্পোফোর্থ চেয়েছিলেন বিলি মারডককে। তাঁর ইচ্ছাপূরণ না হওয়ায় রাজি হননি।

default-image

স্পোফোর্থের বদলি হিসেবে ফ্রাঙ্ক অ্যালেনকে ডাকা হয়। অ্যালেনও খেলেননি, কারণ তাঁর কাছে মনে হয়েছে মাঠে রোদে পুড়ে ঘামে জবজবে হওয়ার চেয়ে স্থানীয় এক মেলার নানা তামাশা দেখাই উত্তম।

‘বিগ জি’—মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এমসিজি) সেদিন প্রায় পনেরো শ দর্শক হয়েছিল। সময় গড়ানোর সঙ্গে আরও বেড়েছে। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম বলটা করেছিলেন আলফ্রেড শ, অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার চার্লস বানারম্যানকে। পরের ডেলিভারিতে আসে প্রথম রান (বানারম্যান)। প্রথম উইকেট চতুর্থ ওভারে অ্যালেন হিলের, প্রথম ‘ডাক’ নেড গ্রেগরির।

প্রথম দিনে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার খেলা শেষ হয়েছিল বিকেল ৫টা নাগাদ। ততক্ষণে টেস্ট ইতিহাসের প্রথম সেঞ্চুরিটা পেয়ে যান বানারম্যান। সেদিন খেলা শেষে সন্ধ্যাটা অপেরায় বিনিয়োগ করে করেন দুই দলের খেলোয়াড়েরা।

পরদিন আঙুলে আঘাত পেয়ে ১৬৫ রানে রিটায়ার্ড হার্ট হয়েছিলেন বানারম্যান। ইনিংসটি খুব উঁচুমানের ছিল না। তখনকার পত্রপত্রিকা ইংল্যান্ডের বাজে বোলিং ও ফিল্ডিংকে দুষে থাকে। তাঁর এক অঙ্কে থাকতে মিড অফে একবার সহজ ক্যাচও দিয়েছিলেন বানারম্যান। কিন্তু অনেক দিন জাহাজে থেকে সুমদ্রপীড়ায় ভোগা ইংলিশ ফিল্ডার টম আরমিটেজ এতটাই বেখেয়ালি ছিলেন, বল তাঁর হাতে না জমে পেটে লেগেছিল!

প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ২৪৫ রানের জবাবে ১৯৬ রানে অলআউট হয়েছিল ইংল্যান্ড। জাপ ৬৩ রানের ইনিংস খেলার পথে একবার হিট উইকেট হয়েছিলেন, সেটিও রানের খাতা খোলার আগে! কিন্তু দর্শকদের দুয়োর মাঝে অস্ট্রেলিয়ানদের আবেদন ধোপে টেকেনি—ইতিহাসে অন্তত এমনই বলা হয়েছে।

জাপ সেদিন ০ রানে আউট হলে ইংল্যান্ডের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারত। সে যাই হোক, অস্ট্রেলিয়াকে তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ১০৪ রানে অলআউট করে ম্যাচে ফেরে ইংল্যান্ড। তৃতীয় দিন ১২ হাজার দর্শকের সামনে বানারম্যান এদিনও ক্যাচ দিয়েছিলেন, এবার রানের খাতা খোলার আগে। ৪ রানে আউট হয়ে সেই ক্যাচ ছাড়া নিয়ে ইংলিশদের আর আক্ষেপে পুড়তে দেননি এই অস্ট্রেলিয়ান।

default-image

জয়ের জন্য ১৫৪ রানের লক্ষ্য পেয়েছিল ইংল্যান্ড। কিংবদন্তি অনুযায়ী, খুব অল্প রানের লক্ষ্য পেয়ে ইংলিশরা নিজেদের স্ট্রোক–প্লে দেখানোর তাড়নায় ভুগেছেন। ২২ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ইংল্যান্ড। এর পেছনে অবশ্য সেদিন মধ্যাহৃভোজন বিরতিতে গলা পর্যন্ত ভূরিভোজ আর আকণ্ঠ বিয়ার পানেরও ভূমিকা ছিল। আর ঢেকে না রাখা উইকেটের ভূমিকা তো ছিলই।

ইংল্যান্ড পরের টেস্ট জিতে ঘুরে দাঁড়ালেও বেশি খুশি ছিল অস্ট্রেলিয়ানরা। অবশেষে তারা শক্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমান হয়ে উঠেছে! টেস্টের সঠিক অর্থ আর কী! হার–জিতের চেয়ে ‘গেটমানি’ থেকে প্রাপ্ত অর্থেই ইংলিশ খেলোয়াড়দের মনোযোগ বেশি ছিল। আর অস্ট্রেলিয়ানদের দেওয়া হয়েছিল সোনার ঘড়ি উপহার। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক ডেভ গ্রেগরির ঘড়িটা ছিল সবচেয়ে বড়।

কার্ডাস এসব বলে একটু দম নেওয়ার ফাঁকে সামনে উপস্থিত অতিথিদের ভেতর থেকে হয়তো একটা শ্যামলা হাত উঠবে। কিছু বলতে চায়! চুইঝালের প্রেমে পড়ে ওখানে চলে যাওয়া ছেলেটি হয়তো মনে করিয়ে দেবে তাঁর দেশের টেস্ট দলের অনন্য এক কীর্তি—ইতিহাসের একমাত্র দল হিসেবে নিজেদের শততম টেস্টের প্রথম দিনে তারা মাঠে নেমেছে টেস্ট ক্রিকেটের জন্মদিনে, আজ এই দিনে!

করতালিতে ফেটে পড়বে সভাকক্ষ!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন