default-image

তাঁর জন্ম আর বেড়ে ওঠা পাকিস্তানে। ২০১৬ সালে উদীয়মান ফাস্ট বোলার আর ব্যাটসম্যানদের জন্য পাকিস্তানের ন্যাশনাল ক্রিকেট একাডেমি (এনসিএ) যে ক্যাম্পের আয়োজন করে, সেখানে ডাক পেয়ে প্রথমবার আলোচনায় এসেছিলেন। পাকিস্তানের শিখ কমিউনিটির সদস্য সেই মহিন্দর পাল সিংয়ের ইচ্ছা, কোনো একদিন পাকিস্তানের জার্সিটা গায়ে জড়িয়ে ক্রিকেট মাঠ মাতাবেন।

সিং পদবির কেউ এর আগে পাকিস্তানের জার্সিতে খেলেননি। সেখানে প্রথম হওয়ার ইচ্ছা মহিন্দরের। আরেকটা ইচ্ছাও আছে তাঁর। পাকিস্তানের ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইট পাকপ্যাশনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে যেটি জানিয়েছেন মহিন্দর। ইচ্ছাটা কী? পাকিস্তানের হয়ে ভারতের বিপক্ষে খেলা!

বর্তমানে ২৪ বছর বয়সী মহিন্দর খেলেন লাহোরের ক্লাব ওয়াহাদাত ইগলেটস ক্লাবের হয়ে। এই ক্লাবে সাবেক পাকিস্তানি পেসার মহসিন কামাল খেলেছিলেন, বর্তমানে পাকিস্তানের অধিনায়ক বাবর আজম ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত এই ক্লাবে ছিলেন বলে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন মহিন্দর।

এই ক্লাব থেকে জাতীয় দল পর্যন্ত রাস্তাটা অনেক লম্বা, অনেক কঠিনও। কিন্তু অতটুকু পাড়ি দিয়ে ভারতের বিপক্ষে খেলার স্বপ্ন ঠিকই দেখেন মহিন্দর, ‘যেকোনো পর্যায়ের ক্রিকেটেই পাকিস্তানের হয়ে ভারতের বিপক্ষে খেলা আমার জন্য বিশেষ কিছু হবে। ভারত বনাম পাকিস্তান সব সময়ই বিশেষ এক উপলক্ষ। আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের কোনো একটা পর্যায়ে আমি অবশ্যই এই উপলক্ষের সঙ্গে জড়াতে চাইব।’

বিজ্ঞাপন

ভারতের বিপক্ষে খেলতে চাওয়ার পেছনে আরেকটা কারণও অবশ্য আছে মহিন্দরের, ‘ভারতের পাঞ্জাবে আমার অনেক আত্মীয় আছেন। এর বাইরে ভারতে আমার অনেক ভক্তও আছেন, বিশেষ করে পাঞ্জাবে। তাঁরা সব সময় আমার জন্য শুভকামনা করেন। বলেন, আমি যদি কখনো পাকিস্তানের হয়ে খেলার সুযোগ পাই, তাঁরা সেই ম্যাচে আমাকে ও পাকিস্তানকে সমর্থন করবেন।’

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জন্ম মহিন্দরের। স্কুলজীবন থেকেই তাঁর পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন বলে জানালেন। ‘এরপর যত সময় গড়িয়েছে, আমি পাকিস্তানের হয়ে খেলা প্রথম শিখ ক্রিকেটার হতে চেয়েছি, পাকিস্তানের অন্য শিখদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে চেয়েছি’, সাক্ষাৎকারে বলেছেন মহিন্দর। ক্রিকেটার না হতে পারলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা তাঁর।

default-image

ম্যাট্রিক পাস করার পর পাখতুনখাওয়া থেকে পাঞ্জাবে আসার পর মহিন্দরের পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নটা আরও বেশি ডালপালা মেলে। এই মুহূর্তে লাহোরের গ্যারিসন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রীড়াবিজ্ঞানে মাস্টার্স করতে থাকা মহিন্দর পড়ালেখায়ও ভালো। পড়ালেখা আর ক্রিকেট—দুটিতেই সমান মনোযোগ দিচ্ছেন তিনি।

ক্রিকেটে তাঁর চলার পথে প্রেরণা হয়ে এসেছে কিংবদন্তি লেগ স্পিনার আবদুল কাদিরের কথাও। সে গল্পও মহিন্দর বলেছেন সাক্ষাৎকারে, ‘লাহোরে আবদুল কাদির একাডেমিতে ট্রায়ালের জন্য গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছেন, আমার বোলিংয়ের মান ভালো, কিছু কিছু জায়গায় উন্নতি আনতে হবে, যেটাতে সময় লাগবে। তিনি বলেছেন, আমার কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, তাহলে একদিন আমি অবশ্যই সেরা ক্রিকেটারদের একজন হতে পারব। তাঁর কথাগুলো সব সময়ই আমার সঙ্গে ছিল।’

লাহোরে যখন ক্রিকেট খেলতে শুরু করেন, তত দিনে ১৯ বছর বয়স হয়ে গেছে মহিন্দরের। পাকিস্তানের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে তাই জায়গা পাওয়া হয়নি। কোনো বয়সভিত্তিক দলেই খেলা হয়নি। তবে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ওপেন ট্রায়ালে একবার টিকেছিলেন মহিন্দর। তাঁর ট্রায়ালের দিন সর্বোচ্চ গতি উঠেছিল ঘণ্টায় ১৩৭ কিলোমিটার, মহিন্দর উঠিয়েছিলেন ১৩৩ কিলোমিটার।

ট্রায়ালে বিচারক হয়ে আসা এনসিএ ব্যবস্থাপক আলী জিয়া ও সাবেক ব্যাটসম্যান মুদাসসর নজর সেদিন মহিন্দরকে উৎসাহ দিয়েছিলেন। এরপর ২০১৬ সালে মহিন্দর যান মুলতানে এনসিএর ক্যাম্পে। সেখানে এক ম্যাচে ৪ ওভারে ৭ রান দিয়ে ১ উইকেট নিয়েছিলেন মহিন্দর। সেদিন ক্যাম্প পরিদর্শনে আসা সাবেক ব্যাটসম্যান ইনজামাম-উল-হক তাঁর বোলিংয়ের প্রশংসা করেছিলেন বলেও সাক্ষাৎকারে জানান মহিন্দর।

default-image

সেই ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে ২০১৭ সালে কিছু গ্রেড-টু ক্রিকেট খেলেছিলেন, লাহোরে ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেটও খেলেছিলেন। এরপর মালয়েশিয়া জাতীয় দল পাকিস্তানে আসার পর তাদের বিপক্ষে একটি টি-২০ ম্যাচে খেলেছিলেন মহিন্দর। এরপর ওয়াপদার হয়ে খেলার জন্য সইও করেছিলেন। কিন্তু ডিপার্টমেন্ট ক্রিকেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর আর খেলা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে অবশ্য পাকিস্তান সুপার লিগের (পিএসএল) দল লাহোর কালান্দার্সে খেলার সুযোগ এসেছিল মহিন্দরের। ট্রায়ালে ডাক পেয়েছিলেন। কিন্তু দলে সুযোগ পাননি। কেন, সে ব্যাখ্যায় বাস্তবতা তুলে ধরেছেন মহিন্দর, ‘পিএসএলে খেলতে হলে বিশেষ বোলারই হতে হয়। ওদের দলে হারিস রউফের মতো বোলার আছেন, যিনি ঘণ্টায় ১৫০ কিমি গতিতে বল করেন। যেখানে আমি এখন ঘণ্টায় ১৩৮ কিমিতে বল করতে পারি।’ তাঁর বোলিংয়ের ধরন নিয়েও আরেকটু বিশদ বললেন, ‘আমি মূলত সুইং বোলার। দুই দিকেই সুইং করাতে পারি।’

সাক্ষাৎকারে সেখান থেকে প্রসঙ্গ বদলে যায় তাঁর প্রিয় ক্রিকেটারের প্রসঙ্গে। মহিন্দরের আদর্শই–বা কে? তাতে এই শিখ ক্রিকেটারের উত্তর, ‘আমার সর্বকালের সবচেয়ে পছন্দের বোলার ওয়াকার ইউনিস। তাঁর বোলিংয়ের ভিডিও দেখতে সব সময়ই ভালো লাগে। ওয়াকারের পাশাপাশি আকিব জাভেদের বোলিং দেখতে ভালো লাগে। আমার চোখে তাঁর মূল্যায়ন যথাযথভাবে হয়নি। পাকিস্তানের হয়ে প্রয়োজনের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক উইকেট পেয়েছেন তিনি, যেমনটা ১৯৯২ বিশ্বকাপে দেখেছি আমরা।’

ভারতেও পছন্দের দুজন ক্রিকেটার আছেন মহিন্দরের, ‘ভারতে আমি ক্যাপ্টেন কুল এমএস ধোনির বড় ভক্ত। বিরাট কোহলির ব্যাটিং দেখতেও ভালো লাগে। আমার কাছে মনে হয়, কোহলি, বাবর আজম আর কেন উইলিয়ামসন আধুনিক যুগের অন্য ব্যাটসম্যানদের চেয়ে অনেক এগিয়ে।’

মন্তব্য পড়ুন 0