সব মিলিয়ে কৌতূহলটা দমিয়ে রাখা ছাড়া উপায় নেই। আপনাদেরও নিশ্চয়ই কৌতূহল হচ্ছে জিম্বাবুয়ে এসে এত কিছু থাকতে ভারমিউলেন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠলাম কেন?

কারণ, নানা কারণে গত দুই দশকে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র সম্ভবত এই ভারমিউলেনই। যাঁরা আগে থেকেই ক্রিকেটের খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের সেটা জানারই কথা। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের একসময়ের এই ‘ব্যাডবয়’ তাঁর এক যুগের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারজুড়েই নানা বিতর্ক আর অঘটনের জন্ম দিয়ে গেছেন।

জিম্বাবুয়ের হয়ে ৯টি টেস্ট ও ৪৩টি ওয়ানডে খেলে এই ওপেনার মাঠে এমন কিছু করেননি যে সেসবের কারণেই তাঁকে মনে রাখতে হবে। ভারমিউলেনকে মনে রাখার কারণ তাঁর ওই বিতর্কিত ঘটনাবলি এবং একটি সাক্ষাৎকার।

২০০৬ সালে ইংল্যান্ডে ক্লাব ক্রিকেট খেলতে গিয়ে দর্শকের ওপর চড়াও হয়ে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। ভারমিউলেনের অঘটনের জন্ম দিতে থাকার সেখানেই শুরু। আপিলের পর অবশ্য সেবার শাস্তিটা নেমে আসে তিন বছরে। কিন্তু সে বছরই আবার হারারের জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট একাডেমি ভবন এবং জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের কার্যালয়ে আগুন লাগিয়ে ভারমিউলেন গ্রেপ্তার হন পুলিশের হাতে।

মানসিকভাবে অসুস্থ, এই যুক্তিতে ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে অভিযোগ থেকে মুক্তি মেলে। পরের মাসেই ভারমিউলেন ঘোষণা দেন আবার খেলায় ফেরার। তার আগে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের সঙ্গে চুক্তিতে আসেন—খেলা থেকে যা আয় করবেন তার একটা অংশ দিয়ে আগুনে পোড়া ভবনের মেরামত করে দেবেন।

পাঁচ বছর বিরতি দিয়ে ভারমিউলেন শেষ পর্যন্ত খেলায় ফেরেন ২০০৯ সালের আগস্টে, বুলাওয়েতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের বিপক্ষে পাঁচ ওয়ানডের সিরিজ দিয়ে। ৯২ রানের ইনিংস খেলে প্রথম ওয়ানডেতেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, দীর্ঘ বিরতিতেও ব্যাটিংটা ভুলে যাননি তিনি।

তবু ২০১৪ সালের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকেই অবসরে চলে যান ভারমিউলেন এবং সেখানেও আছে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ে ‘এ’ দলের হয়ে বাংলাদেশ সফরে গিয়ে খুব একটা ভালো খেলতে পারেননি। এরপরই ঠিক করেন, আর নয় ক্রিকেট। কিন্তু এর কিছুদিন পর আবারও দেন বিতর্কের জন্ম।

এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করায় তাঁকে বহিষ্কারই করে দেয় জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট। তাতে ভারমিউলেনকে যে খুব একটা দোষ দেওয়া যায়, তা অবশ্য নয়। রবার্ট মুগাবের শাসনামলে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের কর্তাব্যক্তিরা যে নিজেদের বিরুদ্ধে কোনো মন্তব্যই নিতে পারতেন না!

২০০৯ সালের ওই সিরিজের মধ্যেই একদিন বুলায়ওয়ের কুইন্স স্পোর্টস ক্লাব মাঠে বসে এই প্রতিবেদককে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন ভারমিউলেন। মনে আছে, সাক্ষাৎকারের মাঝে বারবারই তাঁকে ড্রেসিংরুম থেকে ডাকা হচ্ছিল টিম মিটিংয়ে যোগ দিতে। তাতে বিরক্ত ভারমিউলেনের জবাব ছিল, ‘দেখছ না আমি সাক্ষাৎকার দিচ্ছি। একটু পরে আসব।’

ভারমিউলেন সম্পর্কে আগে জানা অনেক কিছুই সেদিন ভুল মনে হয়েছিল। তাঁর অতীত যে–কাউকে এ ধারণাই দেয় যে লোকটা খ্যাপাটে। কিন্তু ভারমিউলেনের ব্যাখ্যা ছিল ভিন্ন।

২০০৪ সালে ইরফান পাঠানের বলে কপালে আঘাত পেয়েছিলেন। জটিল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল তাঁকে। ভারমিউলেনের ধারণা ছিল মস্তিষ্কের ওই আঘাতই তাঁর হতাশার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে থাকবে। কোনো নেতিবাচক বিষয়ই এরপর থেকে আর সহজভাবে নিতে পারতেন না। হয়ে উঠেছিলেন অতি প্রতিক্রিয়াশীল।

সেদিন তাঁর একটা কথা ছিল এ রকম, ‘মস্তিষ্কের ইনজুরি মানুষের হতাশার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আমার বেলায়ও এরপর থেকেই বাজে বাজে সব ঘটনার শুরু।’

আগুন লাগানোর ব্যাখ্যায়ও এসেছিল হতাশার কথাই, ‘ওই সময়টায় আমি বুঝতে পারছিলাম না আমার আসলে কী করা উচিত।’ সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে বলেছিলেন, ‘আমিও চাই জীবনটাকে উপভোগ করতে, হাসতে, মানুষের সঙ্গে মিশতে।’

এবার জিম্বাবুয়ে এসে ভারমিউলেনের খবর জানার আগ্রহটা সে কারণেই বেশি ছিল। জীবনে কাঙ্ক্ষিত সেই উপভোগের দেখা কি পেয়েছেন তিনি? হাসতে পারেন এখন? মানুষ তাঁর সঙ্গে মেশে তো?

কোনো প্রশ্নেরই জবাব পেলাম না। ভারমিউলেন নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও আছেন। কিন্তু তাঁর কথা কেউ জানে না। এমন একটা আবেগপ্রবণ চরিত্রকে এভাবে ভুলে গেল জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট!