বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কিন্তু কেন একবারের জন্যও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারল না বাংলাদেশ? কারণ অনুসন্ধানের কাজটা ওমান থেকেই শুরু করা যাক।

১৭ অক্টোবর মাসকাটে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের হার থেকে শুরু করে পরশু ৪ নভেম্বর দুবাইয়ে অস্ট্রেলিয়ার কাছে শেষ ম্যাচের বিপর্যয় পর্যন্ত মাঠ এবং মাঠের বাইরে কেমন ছিল দলটা?

পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখা যাচ্ছে শুধু একটার পর একটা ভুল। সেই ভুলগুলোও একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িয়ে। ভুলের মালা গেঁথেই আসলে বিপর্যয়ের এই বিশ্বকাপ—

default-image

স্কটল্যান্ড–বিপর্যয় এবং সমালোচনার ধাক্কা

প্রথম পর্বে গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল স্কটল্যান্ড, ওমান ও পাপুয়া নিউগিনি। তিন দলের কেউ সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, সেটা আর সবার মতো কল্পনায় ছিল না ক্রিকেটারদেরও। বিশ্বকাপে পা রাখার কথা জয় দিয়ে, অথচ শুরুতেই স্কটল্যান্ডের কাছে হারের ধাক্কা! তাতে টালমাটাল দলটা সোজা হয়ে দাঁড়ানোর আগেই ছুটতে থাকে সমালোচনার তির। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ সমর্থকদের থেকে শুরু করে খোদ বিসিবি সভাপতি পর্যন্ত কাঁধে ধনুক তুলে নিলেন।

মাহমুদউল্লাহর জবাব ও মুশফিকের আয়না–তত্ত্ব

ক্রিকেট বোর্ডের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা সমালোচনা ভীষণ চাপ হয়ে বসেছিল দলের জন্য। পরে সেই চাপটা তাঁরাই আবার নিজেদের ওপর দ্বিগুণ করে নিলেন অসময়ে সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে। পরের ম্যাচে ওমানের মতো দুর্বল প্রতিপক্ষকে হারিয়েই সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদউল্লাহ কথার চাবুক চালালেন।

পাপুয়া নিউগিনিকে হারিয়ে এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়ে সমালোচকদের আয়নায় মুখ দেখার পরামর্শ দিলেন মুশফিকুর রহিম। বিশ্বকাপ তো নয়, যেন একটা গৃহযুদ্ধ! কথার ছিপি খুলে দিয়ে ক্রিকেটাররা যদি পারতেন পরের ম্যাচগুলোতেও পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে, তাহলে একটা কথা ছিল।

default-image

কিন্তু সেটা তো তাঁরা পারেননি। টুর্নামেন্টের মাঝপথে এসব বলে উল্টো খেলা থেকেই মনোযোগটা হারিয়ে ফেললেন সবাই। নিজেরাই চাপ নিয়ে এলেন নিজেদের ওপর। এ নিয়ে পরে দলের এক ক্রিকেটারের কথা, ‘এই বিশ্বকাপে আমাদের সবই ভুল ছিল। এটাও (সমালোচনার জবাব দেওয়া) তার মধ্যে একটা।’

ভুল দল, ভুল ক্রিকেট

আসলেই ভুলে ভরা এক বিশ্বকাপ গেল বাংলাদেশের। মাঠের বাইরের ভুলগুলো তবু কাটিয়ে ওঠা যেত যদি মাঠে ভুল কম হতো। কিন্তু মাঠেও যে ঘটে গেছে একটার পর একটা ভুলেরই প্রদর্শনী! ডানহাতির বিপক্ষে বাঁহাতি এবং বাঁহাতির বিপক্ষে ডানহাতি না খেলানোর অদ্ভুত এক নিয়ম মেনে চলে বাংলাদেশ দল। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সুপার টুয়েলভের প্রথম ম্যাচে তাই ভালো বল করেও ওভারের কোটা পূরণ করতে পারেননি সাকিব আল হাসান।

প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপ, বিশেষ করে টপ অর্ডারে যে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের ছড়াছড়ি! আবার সেই যুক্তিতেই আগের ম্যাচগুলোতে ভালো বল করা তাসকিন আহমেদকে সেদিন খেলানো উচিত ছিল। সেটা না করে বাংলাদেশ মাঠে নামে বাড়তি বাঁহাতি স্পিনার নাসুম আহমেদকে নিয়ে। সাকিবের মতো তিনিও সে ম্যাচে সব ওভার করার সুযোগ পাননি। এর তো একটাই অর্থ দাঁড়ায়—পরিকল্পনায়ই গলদ থেকে গেছে বাংলাদেশের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শেষ ম্যাচটার দিকে তাকান।

default-image

ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার মূল ব্যাটসম্যানদের সবাই ডানহাতি। অথচ সাকিব আল হাসানের অনুপস্থিতির পরও একাদশে রাখা হয়নি বাঁহাতি স্পিনার নাসুমকে। ব্যাটিংটা যে রকম নিকৃষ্ট পর্যায়ের হয়েছে, তাতে দুবাইয়ে সেদিন বিশ্বসেরা বোলার এনেও হয়তো অস্ট্রেলিয়ার জয় ঠেকানো যেত না, কিন্তু চিন্তাভাবনা, পরিকল্পনায় অগোছালো ছাপটা তো থেকেই গেল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর সেটা স্বীকার করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক ক্রিকেটারও, ‘আমাদের পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতিতে ভুল ছিল। তবে এ জন্য একা কাউকে দায়ী করা যাবে না। এটা আমাদের সবার ভুল।’

পাওয়ার হিটারের অভাব ও অদ্ভুত ব্যাটিং

বাংলাদেশ দলে নেই কোনো কাইরন পোলার্ড বা ক্রিস গেইল, কিংবা একজন আসিফ আলীও। টি–টোয়েন্টির ব্যাটিংটা তাই এই দলের জন্য যতটা না শক্তির, তার চেয়েও বেশি কৌশলনির্ভর। পোলার্ড–গেইলরা বাহুবলে যে চার–ছক্কাগুলো মারেন, মুশফিক–মাহমুদউল্লাহদের সেগুলো মারতে হয় মস্তিষ্ক খাটিয়ে।

বিশ্বকাপে সেই ব্যাটিং মস্তিষ্কটাই ঠিকভাবে কাজ করেছে বলে মনে হয়নি। পাওয়ারপ্লের ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা তো থেকেই গেছে, ব্যাটসম্যানরা আউট হয়েছেন একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে। স্কুপ আর রিভার্স সুইপের মতো বিপজ্জনক শট যেন এই বিশ্বকাপে একটু বেশিই প্রিয় হয়ে উঠেছিল ব্যাটসম্যানদের। এই শটগুলো ঝুঁকিপূর্ণ তো বটেই, টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটে অনেক সময় উচ্চাভিলাষীও। কারণ একজন ব্যাটসম্যান যখন এ ধরনের শট খেলতে মনস্থির করে ফেলেন, তাঁর মাথায় তখন আর অন্য কোনো শটের চিন্তা থাকে না।

default-image

বল প্রত্যাশার চেয়ে একটু এদিক–সেদিক হলে শটটা ঠিকমতো খেলা তো যায়ই না, প্রত্যাশিত বাউন্ডারি যে আসারও নিশ্চয়তা থাকে না তখন। আউট হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তো থাকেই। ক্রিকেটারদের ব্যাখ্যা অবশ্য ভিন্ন। দলের এক সিনিয়র ক্রিকেটার ব্যাটিং ব্যর্থতা প্রসঙ্গে বলছিলেন, ‘বিশ্বকাপে আমাদের কোনো ব্যাটসম্যানই ফর্মে ছিল না। টানা জৈব সুরক্ষাবলয়ে থাকায় সবাই শারীরিক ও মানসিকভাবে খুব ক্লান্ত ছিল।’

মরীচিকার নাম উইকেট

দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে আবুধাবির শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামের উইকেট দেখে কারও বুঝতে অসুবিধা হয়নি, সেটি ছিল পেসারদের স্বর্গোদ্যান। বোঝেনি শুধু বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট! আবুধাবিতে ম্যাচ হলেও যাওয়া–আসার ধকল এড়াতে ম্যাচের আগের দিন বাংলাদেশ দল অনুশীলন করে দুবাইয়ে।

উইকেট সম্পর্কে তাই আগে থেকে কোনো ধারণা ছিল না তাদের। বাংলাদেশ হয়তো ধরেই নিয়েছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এ মাঠে খেলা আগের ম্যাচের মতোই হবে উইকেট। কিন্তু ম্যাচের দিন তো আবুধাবি গিয়ে কোচ–অধিনায়কেরা উইকেট দেখেছেন। তখনো কি তাঁরা বোঝেননি, কী হতে চলেছে সেখানে!

default-image

বুঝলে মোস্তাফিজুর রহমানকে বসিয়ে তিন পেসারের জায়গায় দুই পেসার নিয়ে খেলতে নামত না বাংলাদেশ। অবশ্য ব্যাটিং এ ম্যাচেও এত বাজে (৮৪ রানে অলআউট) হয়েছে যে পেসার বেশি নিলেও ফলাফলে হেরফের হতো কিনা সন্দেহ।

ভুল আত্মবিশ্বাস

বাড়ির উঠানে সিরিজ জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে বিশ্বকাপে গিয়েছিল বাংলাদেশ দল, যে আত্মবিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জয়ের অভ্যাস। কিন্তু ভালো উইকেটে ব্যাটিংয়ের অনভ্যাসটাও যে তাতে সঙ্গী হয়ে গেল! বিশ্বকাপে জয়ের আত্মবিশ্বাসটা তাই টলে যেতে লাগল একটার পর একটা ম্যাচে, যে বৃত্তের শুরু স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই। আর এরপর থেকেই তো শুরু ভুলের মালা গাঁথার গল্প।

default-image

বিশ্বকাপে ভুলের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি বাংলাদেশ দল। বিশ্বকাপ–পরবর্তী আত্মবিশ্লেষণে নিশ্চয়ই সেটা সম্ভব। সে জন্য শুধু আয়নায় নিজেদের মুখটা দেখে নিতে হবে ক্রিকেটারদের, টিম ম্যানজেমেন্ট আর ক্রিকেট বোর্ডকেও।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন