বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দল ব্যাটিংয়ের সময় একসঙ্গে এগারোজন মাঠে নামে না। ফিল্ডিংয়ের সময় সবাইকে নামতে হয়। এর মধ্যে দুজনকে সব সময়ই একটা নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করতে হয়—বোলিং ও উইকেটকিপিং।

মাঠে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাকি ৯ জনের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা দলের সমন্বয় কতটা ভালো, তারা খেলা কতটা উপভোগ করছে—তা বোঝা যায় ফিল্ডিংয়ে। জন্টি রোডসের ভাষায়, ফিল্ডিং হলো উপভোগ করলে সেটি আর ‘কঠিন কাজ’ মনে হয় না। উপভোগ না করলে কঠিন হয়ে ওঠে এবং ক্যাচ ছাড়লে ধারাভাষ্যকাররা বলে থাকেন ‘বাটার ফিঙ্গার’ অর্থাৎ হাতে মাখন মাখিয়ে ফিল্ডিংয়ে নেমেছে!

default-image

এসব কথায় একটা প্রশ্ন ওঠে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কি খেলাটা উপভোগ করছে?

ক্রিকেটে একটা কথা প্রচলিত—যখন কিছুই হচ্ছে না তখন ফিল্ডিংটা ভালো করলে প্রতিপক্ষ চাপে পড়ে যায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচে অনেক কিছুই বাংলাদেশের দলের পক্ষে ছিল। প্রতিপক্ষের রান আটকানো যাচ্ছিল, বোলাররাও ভালো করছিলেন। ফিল্ডাররাও তাল মেলাতে পারলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান কি ৭ উইকেটে ১৪২ তুলতে পারত?

রোস্টন চেজের আজ টি-টোয়েন্টি অভিষেক হলো। তিনে ব্যাটিং করেছেন তৃতীয় ওভার থেকে। আউট হয়েছেন ১৯তম ওভারে। ৪৬ বলে ৩৯ রান করা চেজের ইনিংসটি টি-টোয়েন্টি মেজাজের না হলেও খুব গুরুত্বপূর্ণ—কারণ তিনি এক প্রান্ত ধরে রাখবেন, বাকিরা পাওয়ার-হিটিং করবে, পরিকল্পনা তো এটিই ছিল!

বাংলাদেশের স্পিনার মেহেদী হাসান সে পরিকল্পনায় বেশ ভালোই ‘সাহায্য’ করেছেন।

ইনিংসে সপ্তম ওভারে চেজ ৯ রানে ব্যাটিংয়ের সময় মেহেদীর হাতে ফিরতি ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন। বলটা একটু জোরে ও মাথার ওপরে থাকলেও খুব কঠিন কিছু ছিল না। দুই হাত এক করেও ক্যাচটা নিতে পারেননি—টিভি রিপ্লে দেখে মনে হয়েছে, হাত দুটো শক্ত করে ক্যাচ ধরতে যাওয়ার মাশুল দিয়েছেন মেহেদী।

হাত নরম করে ক্যাচ না নেওয়ার মৌলিক ‘ভুল’ মেহেদীর মতো ফিল্ডারের কাছ থেকে অন্তত আশা করা যায় না।

মেহেদী আবারও দুঃস্বপ্নের মধ্যে পড়েন ১৪তম ওভারে। বোলার বল করার আগে ফিল্ডাররা সাধারণত সীমানার বাইরে থেকে ভেতরে ঢোকেন। তাতে পুরো সীমানাটা কাভার করা যায়। বাতাসে ভেসে ক্যাচ এলে তা কোথায় দাঁড়িয়ে নিতে হবে বুঝতে সুবিধা হয়।

টি-টোয়েন্টিতে ফিল্ডিংয়ের এই মৌলিক বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ—যেহেতু ব্যাটসম্যানরা শুরু থেকেই খুনে মেজাজে থাকেন। সেই মেজাজের বশেই সে ওভারে সাকিবকে মিডউইকেটে তুলে মেরেছিলেন চেজ। মেহেদী যখন মাথার ওপর থেকে ক্যাচটা নিচ্ছিলেন তাঁর পেছনে অনেক জায়গা পড়ে ছিল—অর্থাৎ সাকিব বোলিং শুরুর সময় তিনি আশপাশেই ছিলেন, এমনকি সীমানা থেকেও ‘মুভ’ করেননি।

default-image

এ কারণে জোরে আসা ক্যাচটা তৎক্ষণাৎ মাথার ওপর থেকে নিতে হয়েছে—যা একটু পেছনে থাকলে অন্তত বুকে বা কোমর বরাবর পেতেন, নিতেও সুবিধা হতো।

মেহেদী ক্যাচটা নিতে পারেননি। চেজ তখন ২৭ রানে অপরাজিত। প্রশ্ন হলো, তাঁকে যদি ৯ রানে ফেরানো যেত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ কি ১৪২ করতে পারত? কিংবা ২৭ রানেও যদি ফেরানো যেত, তখন তো অন্য প্রান্তের ব্যাটসম্যানেরাও চাপে পড়ত—ওয়েস্ট ইন্ডিজও এক প্রান্ত থেকে নিশ্চিন্তে মারার চেষ্টা করতে পারত না। কারণ সেই ওভারের (১৪ তম) আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ছিল ৫ উইকেটে ৬৫। পুরোপুরি চাপে তারা।

সাকিবের করা সে ওভারে শুধু মেহেদীই ভুল করেননি। উইকেটকিপিংয়ের মৌলিক একটি বিষয়েও ক্ষমার অযোগ্য ভুল করেছেন লিটন দাস। শারজার উইকেট মন্থর, বল ওঠে কম, আজ স্পিনারদের বল আরও নিচু হয়েছে। ওই ওভারের চতুর্থ বলে নিকোলাস পুরান সাকিবকে মারতে এগিয়ে এসেছিলেন। সাকিব বুদ্ধি করে লেগে বল করেন।

বলটা লেগেই বেশ বাইরে ছিল, ওঠেও-নি সেভাবে—অন্তত টিভি রিপ্লেতে বলটা ধরার সময় লিটনের গ্লাভসের অবস্থান দেখে বোঝা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, বল একটু নিচু হচ্ছে সেটা তো ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসের শুরু থেকেই দেখছে সবাই। উইকেটকিপাররা এ ক্ষেত্রে কোমরটা আরও নামিয়ে কিপিং করেন। সাকিবের সেই ডেলিভারির সময় লিটন মোটেও তেমন অবস্থানে ছিলেন না—স্রেফ দাঁড়ানো অবস্থা থেকে খানিকটা নেমেছেন।

default-image

কিপিংয়ের স্টান্স নেওয়ার সময় যেভাবে উবু হয়ে বসেন, সেখান থেকে পুরোপুরি না উঠে অন্তত মাথাটাও যদি একদম নিচে রাখতেন তাহলে বলটা গ্লাভসে পেতেন। আর বেশি বাইরে? ভুললে চলবে না স্পিনারদের বলের গতিপথের সঙ্গে কিপারদের শরীরও চলে যাওয়াটা কিপিংয়ের ‘মৌলিক বিষয়’—তাই ওটা মোটেও কঠিন স্টাম্পিং ছিল না।

সহজ এই স্টাম্পিং ছাড়ার পর ফলটা কি দাঁড়াল?

পুরান তখন ২ রানে ব্যাট করছিলেন। শেষ পর্যন্ত মাঠ ছেড়েছেন ২২ বলে ৪০ রানে। অর্থাৎ পুরানকে তখন ফেরাতে পারলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ১০০ হতো কি না সন্দেহ!

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সর্বোচ্চ দুই রান সংগ্রাহককেই ‘জীবন’ উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশের ফিল্ডাররা। এই রোগ যে ‘সংক্রামক’ তা বোঝা গেল ১৯তম ওভারে বাংলাদেশ দলে এই মুহূর্তে সেরা ফিল্ডারটি জেসন হোল্ডারের ক্যাচ ছাড়ায়। কাভারে সীমানায় হাতের মুঠো থেকে ক্যাচ ফেলেছেন!

বলা হয়, ক্রিকেটে প্রতিপক্ষকে হারানোর পরিকল্পনায় ব্যাটিং-বোলিং নিয়ে প্রচুর হিসেব-নিকেশ কষা যায় কিন্তু ফিল্ডিংয়ে সেটি ঠাহর করা অসম্ভব। একটা দল শুধু ভালো ফিল্ডিংয়েই ২০-৩০ রান বাঁচিয়ে দলকে জয় এনে দিতে পারে। একটা দল শুধু ভালো ফিল্ডিংয়েই এক-দুই রান কেটে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে চার-ছক্কা মারার পথে টেনে এনে আউট করতে পারে। এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল কি তা পেরেছে?

default-image

পারলে তো শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই হয়ে যেত—ম্যাচ জেতানো দুই ব্যাটসম্যানের তোলা সহজ ক্যাচ ছেড়েছেন লিটন। প্রথম রাউন্ডেও এমন ক্যাচ ছাড়তে দেখা গেছে।

অথচ সংবাদ সম্মেলনে বারবার বলা হয় ‘ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে।’ ওদিকে দুনিয়ার সেরা ফিল্ডাররাও বলে থাকেন, ফিল্ডিং উপভোগের বিষয়, খেলাটা উপভোগ করলে ফিল্ডিং এমনিতেই ভালো হয়।

ক্রিকেটের এসব ‘পাঠ্যসূচি’ ও বাংলাদেশের ফিল্ডিং দেখে স্কুলের সেই ছাত্রের কথা মনে হতে পারে—সারা বছর পড়ার টেবিলে পাঠ্যবইয়ের ভেতর ‘অন্য কিছু’ রেখে সবার দোয়া নিয়ে পরীক্ষায় গিয়ে ‘ফেল’ করে!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন