default-image

‘মালি, মালি,

মালি, মালি!’

প্রেমাদাসার এমন গর্জনের সঙ্গে তাল মেলানোর ইচ্ছা জাগলে দোষের কিছু নেই। আজ এমনভাবে মোহাবিষ্ট করে রেখেছেন মালিঙ্গা, পুরো প্রেমাদাসাই কেঁপেছে এক ছন্দে। আর সেই ছন্দে নাচার সুযোগ তো মালিঙ্গা নিজেই করে দিলেন!

তামিম ইকবালের মন খারাপ হতেই পারে। ম্যাচের প্রথম ওভারেই আউট হয়েছেন, তবু ক্রিকেট বিশ্বের ৯৯ শতাংশ মানুষই হয়তো তাঁর আউটে আজ খুশি হয়ে উঠেছিলেন। কারণ, তাঁর বিদায়দিনেই যে অবিশ্বাস্য এক চিত্রনাট্য লিখল ভাগ্য, মালিঙ্গার বিদায়ের সম্ভাব্য সেরা গল্প।

প্রথম চার বলে কোনো রান নিতে পারেননি। ফলে, চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। মালিঙ্গার পঞ্চম বলের জন্য সামনের পা এগিয়ে স্টান্টে গিয়েছিলেন তামিম। কিন্তু ওই সময়েই মালিঙ্গা তাঁর সেরা অস্ত্র ছাড়লেন। ক্যারিয়ারজুড়ে নিচু হয়ে আসা ইয়র্কারে ভুগিয়েছেন বিশ্বের তাবৎ ব্যাটসম্যানকে। হঠাৎ করেই বল নিচু হয়ে আসছে দেখে, ব্যাট নামানোর চেষ্টা করলেন তামিম। কিন্তু এগিয়ে রাখা পায়ের কারণে সৃষ্টি হলো এক ফাঁদ। ব্যাটের নিচ দিয়ে বল সোজা তাঁর লেগ স্টাম্পে। নিজের শেষ ম্যাচের প্রথম ওভারেই অমন দুর্দান্ত এক বল!

পরিবেশটা চিন্তা করুন। নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচ। ব্যাটিংয়ে নামার সময়ই আবেগে ভাসিয়েছে সবাই। একটু আগেই ফিল্ডিংয়ে নামার আগেও বেশ আয়োজন করে, বেলুন উড়িয়ে বিদায়কে রাঙানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু নিজের বিদায়টা মালিঙ্গা নিজের মতোই নিতে চাইলেন। সব আবেগ চাপা দিয়ে ছুড়তে লাগলেন সব অস্ত্র। লেট সুইং, স্লোয়ার ইয়র্কার, দুর্দান্ত গতির ইয়র্কার, গুড লেংথে পড়ে বেরিয়ে যাওয়া—সব, সব ছিল। তার মাঝে সেরা বলটাই তুলে নিল তামিমকে।

মালিঙ্গার প্রথম স্পেলের শেষটাও হলো দেখার মতো। একবারও লুকাতে চাননি আজ কী চান। তাই একের পর এক ইয়র্কার দিয়েছেন। তাঁর প্রতি ওভারেই অন্তত দুটি বলে আউটের সম্ভাবনা জাগিয়েছেন। আর দর্শকের চিৎকার, গর্জন বাকি বলগুলোকেও ‘আনপ্লেয়েবল’ বানিয়ে দিচ্ছিল। ৫ ওভারের স্পেলে মাত্র একটি চার খেয়েছেন। সেটাতেও মোহাম্মদ মিঠুনের আউট হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। একটার পর একটা বল করছিলেন আর প্রশ্নটা তুলে দিচ্ছিলেন, ‘কেন বিদায় বলছেন মালিঙ্গা!’

প্রথম স্পেলের ৮৩ শতাংশ বলই ডট দেওয়া মালিঙ্গা সৌম্যকে আউট করেছেন সত্যিকারের এক কিংবদন্তির মতো। কোনো লুকোছাপা নেই, নিজের উদ্দেশ্য জানাতে কোনো কার্পণ্য নেই। আগেই রাউন্ড দ্য উইকেটে এসে একের পর এক ইয়র্কার দিয়ে সৌম্যের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছেন। নবম ওভারেই তাই করছিলেন। অ্যাঙ্গেল সৃষ্টি করে স্লিঙ্গিং অ্যাকশনে একের পর এক ইয়র্কার ছুড়ছিলেন। প্রায় উইকেটের বাইরে থেকে শুরু হওয়া গতিপথের শেষে বলগুলো এসে পড়ছিল সৌম্যের স্টাম্পে। সোজা ব্যাটে সেগুলো এতক্ষণ ঠেকিয়েও গেছেন সৌম্য।

ওই ওভারের তৃতীয় বলটায় আর হলো না। খুব বুলেটগতির ছিল না, ১৩৫ কিলোমিটার গতিরই বল। কিন্তু নিচু হয়ে এমন অ্যাঙ্গেলে এল যে সৌম্যের সর্বোচ্চ চেষ্টার পর বল তাঁর ব্যাটকে ফাঁকি দিয়ে চলে গিয়ে ভেঙে দিল স্টাম্প। সঙ্গে সঙ্গে যেভাবে গর্জে উঠল স্টেডিয়াম ও তার আশপাশের এলাকা, তাতে রিখটার স্কেলেও প্রভাব পড়ার কথা।

এমন দুর্দান্ত দুটি ইয়র্কার! কম্পিউটারের গেমে কোডিং করেও হয়তো এমন কিছু সৃষ্টি করতে কষ্ট হবে। এমন কিছু শুধু মালিঙ্গার পক্ষেই সম্ভব। আজ ম্যাচের ফল যা–ই হোক, যে–ই জিতুক না কেন, প্রথম স্পেলের প্রতিটি বল মানুষ মনে রাখবে। অংশ হয়ে থাকবে যে কোচিং ম্যানুয়ালের। বিদায়ের চিত্রনাট্য কীভাবেই সাজিয়ে নিতে হয় দেখিয়ে দিয়েছেন মালিঙ্গা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন