মনে আছে তো বাংলাদেশ ইনিংসের শুরুটা? ৫ ওভার শেষে স্কোরবোর্ড? যেটিতে রানের ঘরে ‘১৮’। যে রানের অর্ধেকই দিয়েছেন ফারুকি। কিন্তু একেবারে পানির দামে কিনে নিয়েছেন চার-চারটি উইকেট। ৩-১-৯-৪...অবিশ্বাস্য এই বোলিং ফিগার নিয়ে ফারুকি তখন হাসছেন।

১২তম ওভার শুরু হতে না হতেই সেই হাসি আরও চওড়া। বাংলাদেশ ৬ উইকেটে ৪৫। ম্যাচ তো তাহলে শেষই! ৫০ রানের কমে ৬ উইকেট পড়ে যাওয়ার পরও জয় পাওয়ার ঘটনা ওয়ানডেতে খুব কম নেই। তবে সেসবের কোনোটাতেই সপ্তম উইকেট জুটি ৫৫ রানের চেয়ে বড় আকার পায়নি। আর চট্টগ্রামে প্রথম ওয়ানডেতে পরিস্থিতিটা এমন যে আফিফ হোসেন আর মেহেদী হাসান মিরাজ এর দ্বিগুণ করলেও চলছে না। এরপর তো শুধুই তিন বোলার...। যাঁদের কাছে বাকি ৬১ রানের দাবিটা একটু অবাস্তবই হয়ে যায়।

যা হয়েছে, সেটিও কি বাস্তব-অবাস্তবের সীমানা মুছে দিতে চাইছে না! ওয়ানডেতে তাঁর প্রথম ইনিংসেই (তৃতীয় ম্যাচে) ৫১ করেছিলেন মিরাজ, এরপর ৩১ ইনিংসে আর পঞ্চাশের দেখা পাননি। আফিফ তো কখনোই নন। সেই মিরাজ ৮১ রানে অপরাজিত থাকবেন, আফিফ ৯৩ রানে। সপ্তম উইকেটে ১৭৪ রান তুলে তাঁরা দুজনই শেষ করে আসবেন ম্যাচ...কেউ এমন ভেবেছিলেন দাবি করলে অনুমান করে নিতে হয়, বক্তার অন্য অনেক গুণ থাকলেও ‘সত্যবাদিতা’ সম্ভবত সেই তালিকা থেকে নির্বাসিত।

তামিম ইকবাল যে এই দলে নেই, ম্যাচ–পরবর্তী প্রতিক্রিয়াতেই তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। অকপটে স্বীকার করেছেন, এভাবে জয় পাওয়াটা তাঁর বিশ্বাসই হচ্ছে না। না হওয়ারই কথা। পরিস্থিতি বিবেচনায় ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সবচেয়ে স্মরণীয় জয়গুলোর তালিকা করলে এই ম্যাচকে যে অবশ্যই রাখতে হচ্ছে, তার কারণও তো এটাই। একটা সময় ভাবাই যায়নি, এই ম্যাচে বাংলাদেশ জিততে পারে।

default-image

স্মরণীয় জয়ের মতো স্মরণীয় জুটির তালিকাটাও আরেকটু দীর্ঘ হলো এই ম্যাচে। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সবচেয়ে স্মরণীয় জুটির কথা বললে ফিরে যেতে হয় ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৩ রানে ৪ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর ২২৪ রানের যে জুটি জয় এনে দেওয়ার সঙ্গে ফুল বিছিয়ে দিয়েছিল সেমিফাইনালের পথেও। মঞ্চ অনেক বড় ছিল, বোলিং আক্রমণও হয়তো আরও ধারালো, তারপরও কার্ডিফের চেয়ে চট্টগ্রামকে খুব একটা পিছিয়ে রাখা যাচ্ছে না। কার্ডিফে সেই জুটির দুই অংশীদার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ সাকিব আর মাহমুদউল্লাহ; চট্টগ্রামে যেখানে দুই তরুণ। ৪ উইকেটে ৩৩ আর ৬ উইকেটে ৪৫-এর তুলনায় আর নাই–বা গেলাম।

default-image

কী ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আফিফ-মিরাজের এই যুগলবন্দী, তা যদি ভুলেও যান, তারপরও কিন্তু এই জুটি হাততালি দাবি করে। কেন, তা বুঝিয়ে দিতে একটা তথ্যই যথেষ্ট। ৪৩৫৭ ম্যাচের ওয়ানডে ইতিহাসে সপ্তম উইকেটে এর চেয়ে বড় জুটি হয়েছে মাত্রই একটি। অঙ্কের হিসাবে তা ৩ রান বেশি, কিন্তু মহিমায় আফিফ-মিরাজ জুটির চেয়ে অবশ্যই অনেক পিছিয়ে। ২০১৫ সালের জুনে বার্মিংহামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জস বাটলার ও আদিল রশিদের ১৭৭ রানের সপ্তম উইকেট জুটিটার শুরু কখন, জানেন? ৩০তম ওভারে ইংল্যান্ড যখন ৬ উইকেটে ২০২। সঙ্গে আরেকটা তথ্য যোগ করে নিন, সেটি ছিল ম্যাচের প্রথম ইনিংস, যা শেষ হয়েছিল ৪০৮ রানে।

চট্টগ্রামে ম্যাচের প্রথম ইনিংস মাত্র ২১৫। টসে হারার পর জিতলে যে তিনিও প্রথমে ব্যাটিংই করতেন, তা পরিষ্কারই বলে দিয়েছেন তামিম ইকবাল। আফগানিস্তানের ইনিংস শেষে যা নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র আফসোস থাকার কথা নয়। জহুর আহমেদ স্টেডিয়ামের উইকেটে ২১৫ কোনো রান নাকি! রশিদ খান আর মুজিব-উর রেহমানকে একটু দেখে খেললেই হবে। আস্কিং রেট যেখানে সাড়ে চার রানেরও কম, তা খেলতে কোনো সমস্যাও তো নেই। বাংলাদেশের টিম মিটিংয়েও আফগানিস্তানের এই দুই স্পিনারকে নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে বলে অনুমান করে নেওয়া যায়। আরেক স্পিনার মোহাম্মদ নবীও হয়তো উঁকি দিয়ে থাকতে পারেন। তবে ফজলহক ফারুকির নামটা আদৌ উচ্চারিত হয়েছে কি না সন্দেহ নয়! মাসখানেক আগেই নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকে মনে রাখার মতো কিছু করেননি। আইপিএলের দুই দলের নেট বোলার হিসেবে বোলিং করেছেন, কদিন আগের আইপিএল নিলামে দলও পেয়ে গেছেন। তামিমকে অবশ্য এসব দিয়ে চিনতে হয়নি ফজলহক ফারুকিকে। গত বিপিএলে তো তামিম-মাহমুদউল্লাহর ঢাকা দলেই ছিলেন ফারুকি। তিন ম্যাচের বেশি খেলার সুযোগ পাননি, সেই তিন ম্যাচে মাত্র ২ উইকেট। এই ম্যাচের ফারুকিকে দেখে তামিমের তাই চমকে যাওয়ারই কথা।

আফিফ–মিরাজকে অভিনন্দন। ফজলেহক ফারুকিকে আবারও ধন্যবাদ। প্রথমটার কারণ বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। আর দ্বিতীয়টার তো বলে দেওয়া হয়েছে শুরুতেই।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন