default-image

উদ্বোধনী ম্যাচেই ব্রেন্ডন ম্যাককালাম তুলকালাম কিছু করে ফেললে তো হলোই। বা কয়েক ঘণ্টা পর শুরু মেলবোর্নের ম্যাচে ডেভিড ওয়ার্নার বা গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। তা হলে আর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের নামে এই তামাশার কথা আর কেউ মনে রাখবে না।
এমসিজি থেকে হেঁটে মিনিট পাঁচেকের দূরত্বের সিডনি মাইয়ার মিউজিক বোওলে সমবেত হাজার দশেক দর্শক একমত হতে পারেন। আবার না-ও হতে পারেন। তাঁরা ঘণ্টা আড়াই আনন্দ করতে গেছেন। তা সেটি তো ভালোই হলো!
‘বোওল’ বললে যেমন ইনডোর স্টেডিয়াম মনে হয়, এখানে ঘটনা তা নয়। মঞ্চটা ঢেকে আর সামান্য একটু এগিয়ে এসেছে ছাদ। বাকিটা খোলা আকাশের নিচে। সামনে ২০-২৫ সারি চেয়ার। সেটির যেখানে শেষ, শুরু হয়ে গেছে ক্রমশ উঁচু ঘাসে ঢাকা মাঠ। বেশির ভাগ দর্শক সেখানে বসে-দাঁড়িয়েই গতকাল বিকেলে শুরু হয়ে রাতে গড়ানো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখলেন। যেটির শেষ হলো অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত সব শিল্পীর গানে। সেই কনসাট পর্ব শুরুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য ঘরে ফেরার মিছিলও শুরু হয়ে গেল। যেটি একদমই অবাক করল না। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভারতীয় পর্ব শুরু হওয়ার সময় বাতাসে তেরঙার দুলুনি আর তুমুল চিৎকারই যে বুঝিয়ে দিয়েছিল দর্শকের মধ্যে কাদের আধিপত্য।
আয়োজকদের সরবরাহ করা মিডিয়া গাইডের কল্যাণে জানা গেল, সন্ধ্যায় একটু থেমে রাতে গড়ানো বিকেলের অনুষ্ঠানের সময়টা প্রতীকী। দিবারাত্রির ম্যাচে যেমন হয় আর কি! উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কথাটাই অবশ্য এখানে টীকা দাবি করছে। মেলবোর্নে বসে তো আর ক্রাইস্টচার্চে কী হলো জানার উপায় নেই। প্রথম প্রশ্ন তো হওয়া উচিত এটাই। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ভেঙে ভেঙে দুই দেশে হচ্ছে, এটা এর আগে কে কবে শুনেছে! যৌথ আয়োজন তো বিশ্বকাপ আগেও দেখেছে। কিন্তু যৌথ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান? এবারই প্রথম।
ক্রাইস্টচার্চে কী হয়েছে না জেনেও একটা জায়গায় মেলবোর্নকে জয়ী ঘোষণা করতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বিশ্বকাপের ১৪ দলের ১০টিই তো থাকল এখানে। ঠিক ‘দল’ অবশ্য বলা যাচ্ছে না। পুরো দল তো মাত্র ৫টি। স্বাগতিকের বাড়তি দায়িত্ববোধ থেকেই হয়তো সবার আগে এল মাইকেল ক্লার্কের অস্ট্রেলিয়া। একটু পরই উদ্বোধনী ম্যাচের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। এর বাইরে পুরো দল শুধু তিন সহযোগী সদস্যদেশ আফগানিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও স্কটল্যান্ডের। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করলেন দলের অধিনায়ক ও ম্যানেজার। দর্শকসারির মাঝখানে বসানো কৃত্রিম পিচে হেঁটে ১০ অধিনায়ক যখন মঞ্চে উঠে দাঁড়ালেন; নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ের পতাকা নিয়ে পাশে চার স্বেচ্ছাসেবক। এই চার দলের অধিনায়ক তখন ক্রাইস্টচার্চে।

মাশরাফি বিন মুর্তজাও ঘণ্টা তিনেক আগে সিডনিতে ছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অংশ হতে ম্যানেজার খালেদ মাহমুদের সঙ্গে হেলিকপ্টার ও বিমানে উড়ে এসেছেন মেলবোর্নে। সফরসঙ্গী ছিলেন আরও দুজন। একটু আগে শেষ হওয়া প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ দেওয়া আয়ারল্যান্ডের অধিনায়ক উইলিয়াম পোর্টারফিল্ড ও কোচ ফিল সিমন্স। এর আগে কোনো দিন হেলিকপ্টারে চড়েননি। মাশরাফির তাই ভয় ভয় লাগছিল। সেটি আরও বেড়ে গেল পাইলটের কথায়, ‘ওড়ার আগে পাইলট বলল, মেঘের মাঝখান দিয়ে যেতে হবে বলে হেলিকপ্টার ঝাঁকি খেতে পারে। আমি মনে মনে বললাম, আগে থেকে তোর এটা বলার দরকার কী? আমি তো এমনিতেই ভয়ে কাঁপছি।’ আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে পরাজয়ের পরপরই ভীতিকর এই হেলিকপ্টার-উড়াল, মাশরাফির দিনটি আরও খারাপ হয়ে গেছে পথেই কোথাও প্রিয় সানগ্লাস হারিয়ে ফেলায়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্বকারী পারফরম্যান্সটা দেখলেও নির্ঘাত মাশরাফির মন আরও খারাপ হতো। পৌঁছাতে একটু দেরি হওয়ায় সেটি মিস করেছেন। শুরুতেই বর্ণমালার ক্রমানুসারে অংশগ্রহণকারী ১৪টি দেশের (স্বাগতিক বলে অস্ট্রেলিয়া অবশ্য সবার শেষে) জন্য বরাদ্দ ছিল আলাদা করে একটি অংশ। যেখানে বাংলাদেশের আগে শুধু আফগানিস্তান। তবে পারফরম্যান্সের বিচারে বাংলাদেশ-পর্বটাই হলো সবচেয়ে বাজে। বাকি দেশগুলোর নাচ-গান বা অন্য কোনো পারফরম্যান্সে সে দেশের সংস্কৃতির মূল ধারাটার পরিচয় মিলল। কিন্তু বাংলাদেশের নামে যা করা হলো, তা রীতিমতো জগাখিচুড়ি। জিন্সের প্যান্ট আর বাংলাদেশের ক্রিকেট জার্সি গায়ে কয়েকজন ছেলেমেয়ে, যাদের সঙ্গে শাড়ি পরা দুই নৃত্যশিল্পী। হাবিব ওয়াহিদের ‘চলো বাংলাদেশ...’ গান আর সেই গানের সঙ্গে তাদের নাচ দেখে মনে প্রশ্ন জাগতে বাধ্য, এতে কি বাংলাদেশের আবহমান সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া গেল? এই সংশয় জাগতে পারে জেনেই কি না, এটা বাংলাদেশই বোঝাতে শেষে এক তরুণ লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে মঞ্চে এসে তা দোলাতে শুরু করলেন।

খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, ‘ফোর্থ ডাইমেনশন’ নামে এই নাচের দলটির বেশির ভাগ সদস্যই মেলবোর্নের স্থানীয় এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। বাংলাদেশেরই ছেলেমেয়ে। স্থানীয় আয়োজক কমিটি কীভাবে যেন খোঁজ পেয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশকে তুলে ধরার দায়িত্ব তাঁদের কাঁধেই তুলে দিয়েছে।
মাঠের খেলায় আয়ারল্যান্ডের কাছে হারার দিনে মাঠের বাইরেও কি তাহলে হারল বাংলাদেশ? মোটেই না। চার বছর আগে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের নতুন এক মানদণ্ড বেঁধে দিয়েছিল বাংলাদেশ। সেটি অস্পর্শনীয়ই থাকল।
ক্রাইস্টচার্চে কী হয়েছে জানি না, তবে ঢাকার কাছে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত মেলবোর্ন!

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন