তবুও বিশ্বাসটা ‘আসি, আসি’ করেও আসছিল না, তার কারণ, দূর অতীতের মতো আপনি সম্প্রতিটাও জানেন। জানেন এক অমোঘ নিয়তি। তিনি এখন প্রায় ৪১।

ক্রিকেটটা তাঁর জন্য হয়ে গেছে পারিবারিক পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে ব্যাট ধরার উপলক্ষ। খেলেন কেবল এই আইপিএলেই। তিন দিন ব্যাট না ধরলেই নাকি ‘আত্মবিশ্বাস’ নামক ব্যাপারটা কর্পূরের মতো উবে যায় ক্রিকেটারদের শরীর থেকে, সেখানে গোটা বছরে তিন মাস ব্যাট ধরে কি স্বর্ণালি স্মৃতিগুলোর পুনর্মঞ্চায়ন সম্ভব? নাকি প্রতিবার ব্যাট ধরে ব্যর্থ হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরতে ফিরতে জাবর কাটাই সম্বল, ‘আহা, কি সব দিন গেছে!’
উত্তর যে আক্ষেপেই লুকিয়ে, সেটা গত দুই মৌসুমে আইপিএল অনুসরণ করলে জেনে যাওয়ার কথা। ২০২০ মৌসুমে রানসংখ্যা ২০০, পরের মৌসুমে প্রায় অর্ধেক, ১১৪।

default-image

স্ট্রাইকরেট কোনোবারই ১২০-এর ঘর ছোঁয়নি। ফিসফাস নয়, ‘বুড়িয়ে গেছেন’, ‘ফুরিয়ে গেছেন’ শব্দবন্ধগুলো শোনা যাচ্ছিল রীতিমতো বজ্রনিনাদের মতো। দিল্লি ক্যাপিটালসের বিপক্ষে গতবার একবার জিতিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ‘ঝড়ে বক মরে’ প্রবাদের সার্থকতা তো অদ্বিতীয় উদাহরণগুলোর কারণেই। এমন ‘ওয়ান অফ ইনিংস’ দিয়ে কি আর সমালোচকদের মুখ বন্ধ রাখা চলে?

আর দিল্লির বিপক্ষে ইনিংসেও তো পুরোপুরি বিশ্বাস করাতে পারেনি। শেষ দুই ওভারে দরকার ২৪ রান, এমন ম্যাচ আজকের জমানায় তো ১০০ জনে ৮০ জনই জেতাবেন। কিন্তু প্রতিপক্ষের কব্জায় চলে গেছে ম্যাচ, ৫ ওভারে দরকার ৭০, শেষ ওভারে করতে হবে ২৩, ধোনি তো বিশ্বাস জোগাতেন এমন অসম্ভবেই। ২০১৯ সালের পর সেই মুহূর্তগুলোর দেখাও কি পাওয়া গেছে আর?

২০০৪ থেকে শুরু করা ক্যারিয়ারে বলতে গেলে সবই পেয়েছেন। তবুও অযথাই টেনে টেনে একে স্থিতিস্থাপকতার সীমার বাইরেই নিয়ে গেলেন ধোনি, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া ব্যক্তিদের পাল্লাই তাই ভারী হচ্ছিল ক্রমশ।

***

আইপিএলের পঞ্চদশ আসরের প্রথম ম্যাচেই ঝলক দেখিয়েছিলেন, কিন্তু হেরে যাওয়া ম্যাচ কে-ইবা বা মনে রাখে! পরের ৬ ম্যাচ মিলিয়ে করলেন ৩২, চেন্নাই সুপার কিংস যেন তাঁকে পারতপক্ষে সিন্দুক থেকে বের করতেই চাইছিল না।

তবে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের বিপক্ষে ম্যাচে বের না করে রক্ষা হয়নি আর। মুম্বাইকারদের দশাও সুবিধার নয় এবার, পয়েন্ট টেবিলে অবস্থান চেন্নাইয়েরও নিচে। আইপিএলে সবচেয়ে বেশি পাঁচবার শিরোপা জিতেছে যে দল, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর তারা তো মরণকামড়ই দিতে চাইবে।

default-image

সে চেষ্টা তারা করেছিল। চেন্নাইকে ১৫৬ রানের লক্ষ্য দিয়ে ৬ উইকেট তুলে নিয়েছিল ১০৬ রানেই। ধোনি নামার সময় সমীকরণ: ৩১ বলে ৫৪ রান। ১৩ বল পর রানের ব্যবধানটা বেড়েছে আরও ১। অর্থাৎ ১৮ বলে চাই ৪২। পূর্বজন্মে (তত আগের স্মৃতি বলেই তো ভ্রম হয়!) এমন ম্যাচগুলোকেই না ধোনি বানাতেন তাঁর ‘অসম্ভবকে সম্ভব করার’ মঞ্চ!

জয়দেব উনাদকাটের ১৮ নম্বর ওভারে এল ১৪। পরের ওভারে জসপ্রীত বুমরাহকে দুটি চার মেরে রানটাকে নাগালের মাঝে নিয়ে এলেন ডোয়াইন প্রিটোরিয়াস। তখন সমীকরণ, শেষ ওভারে ব্যাট করতে হবে ২৮৩ স্ট্রাইক রেটে। লেখার শুরুতেই তো আপনি জেনেছেন, ধোনি শেষ ওভারে ব্যাট করেন এর চেয়েও ঝোড়ো গতিতে।

তবে সমীকরণটা পুরোপুরি বদলে গেল উনাদকাটের শেষ ওভারের প্রথম দুই বল পরই। প্রিটোরিয়াস এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরার পরের বলে এল ১ রান। ৪ বলে তখন প্রয়োজন ১৬। স্ট্রাইক প্রান্তে এসেছেন ধোনি, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল শুরু হলো আরও একবার।

১৯.৩ নম্বর বলে জয়দেব উনাদকাটের একটুর জন্য ব্লক হোল মিস করা ডেলিভারিটা টের পেল ধোনির আসুরিক বটম হ্যান্ডের জোর। লং-অফের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ল সাইট স্ক্রিনে।

পরের বলটা স্লোয়ার বাউন্সার, ডিপ ইন দ্য ক্রিজে গিয়ে বসে থাকা ধোনির ব্যাটের ওপরের কানাতেই লাগল বলটা, তবে শর্ট ফাইন লেগে দাঁড়ানো ফিল্ডারের মাথার ওপর দিয়ে চার হতে তাই ছিল যথেষ্ট। ৩ নম্বর বলটা একদম ব্লক হোলে। কোনোমতে মিড উইকেটে পাঠিয়ে দুই। সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানের ক্যামেরা সঙ্গে সঙ্গেই ধরল ডাগআউটে বসে থাকা চেন্নাইয়ের ক্রিকেটারদের। তাঁরা তখন হাসছিলেন!

সম্ভবত দিব্যদর্শনের জ্ঞান তাঁদের আছে।

***

এমন টানটান উত্তেজনা ছড়ানো ম্যাচে সমাপ্তি টেনে ধোনি নিজে কী করেছেন, তা জানতে চাওয়ার বোকামি নিশ্চয়ই আপনি করবেন না। বরাবরের নির্লিপ্ত ভঙ্গি, প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মেলানোই তো দেখা গেল। ফাঁকে গিয়ে একবার দাঁড়ালেন ঈশান কিষাণের পাশে। বুঝিয়ে দিলেন, বোলার যখন ইয়র্কার করতে চাইবে, স্কয়ার লেগের ফিল্ডারটাকে আরও একটু ব্যাকওয়ার্ডে রাখতে হবে। আজ মুম্বাইয়ের হয়েও হয়নি, পরদিন ঝাড়খণ্ড বা ভারতের হয়ে নিশ্চয়ই হবে।

উচ্ছ্বাসটা বরং অন্যদেরই সংক্রমিত করল বেশি। মাঠে নেমে অধিনায়ক রবীন্দ্র জাদেজা কুর্নিশ করলেন ধোনিকে, আম্বাতি রায়ডু করলেন করজোড়ে প্রণাম। রোহিত শর্মা নিয়ম রক্ষার ম্যাচ-পরবর্তী বিশ্লেষণে বলে গেলেন, ধোনি ম্যাচ গভীরে নিয়ে গেলে কী করতে পারেন, তাঁরা জানতেন। জেনেও তাঁরা ১৩ বলে ২৮ রানের ঝড় থামাতে পারেননি।

টুইটার অবধারিতভাবেই ফেটে পড়ল উচ্ছ্বাসে। ‘গ্রেটেস্ট ফিনিশার এভার’ বহুবার ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে যাওয়া কথাটাই নতুন করে বলা হলো আবার। ‘ধোনিকে নিয়ে শেষ কথা কেবল ধোনিই বলতে পারেন’ টিভির সামনে বসে হার্শা ভোগলের উক্তিটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হতে পারে আপনারও।

কিংবা মনে হতে পারে, রাজেশ খান্না ভুল বলেছিলেন। ওই যে আনন্দ সিনেমায় তাঁর কণ্ঠে শোনা গিয়েছিল, ‘জীবন বড় হওয়া চাই, লম্বা নয়…’, কে বলেছে, উপদেশটা সবার জন্যই সত্যি হয়?

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন