default-image

টেস্ট সংখ্যায় তিন অঙ্ক ছুঁতে যাচ্ছেন তিনি, সে তো জানাই ছিল। চেন্নাইয়ে আজ টস করতে নেমেই ক্যারিয়ারে ১০০তম টেস্ট খেলার স্বাদ নেওয়া হয়ে গেছে ইংল্যান্ড অধিনায়ক জো রুটের। এই ভারতের মাটিতেই ৮ বছর আগে অভিষেক হয়েছিল তাঁর, ভারতের মাটিতেই শততম টেস্টটা কীভাবে রাঙান ৩০ বছর বয়সী রুট, সেটিই ছিল দেখার।

শেষ পর্যন্ত টেস্টের ফল কী হবে, রুটের জন্য টেস্টটা কতটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে, সেটা পরের প্রশ্ন। আপাতত প্রথম দিন শেষে বলা যায়, কী দারুণভাবেই না টেস্টের প্রথম দিনটা আজ রাঙিয়ে দিলেন রুট! টেস্টের সংখ্যায় তিন অঙ্ক ছোঁয়ার দিনে তিন অঙ্ক দেখেছে তাঁর ব্যাটও। টানা তৃতীয় টেস্টে সেঞ্চুরি করে শততম টেস্টটা রাঙিয়ে দিলেন রুট। দিন শেষে অপরাজিত থেকে গেলেন ১২৮ রানে।

তাঁর পাশাপাশি দিনজুড়ে শিকড় গেড়ে বসেছিলেন ইংলিশ ওপেনার ডম সিবলিও। দিনের শেষ বলে আউট হওয়ার আগে রুটের সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে ঠিক ২০০ রানের জুটি গড়েছেন। তাতে দিনজুড়ে অসহায় হয়ে ছিল ভারত দল। বিরতি কাটিয়ে অধিনায়ক বিরাট কোহলির ফেরার টেস্টের প্রথম দিনটাতে ভারতকে হতাশা উপহার দিয়ে ইংল্যান্ড দিনটা শেষ করেছে ৩ উইকেটে ২৬৩ রান নিয়ে।

বিজ্ঞাপন
default-image

ভারতের সাবেক ওপেনার গৌতম গম্ভীর হয়তো এখন মুখ লুকানোর জায়গা খুঁজছেন। শুধু গম্ভীরই কেন, অস্ট্রেলিয়ায় ইতিহাস গড়ে দেশে ফেরা ভারত এই চার টেস্টের সিরিজে ইংল্যান্ডকে কীভাবে উড়িয়ে দেবে, সেটি নিয়ে কথার খই তো আর কম মানুষ ফোটাননি। এখনই সিরিজের প্রথম দিন শেষেই উপসংহার টানাও যায় না, তবে রুট বাধ্য করলেন গম্ভীরদের কথা গিলতে!

অন্য সবার চেয়ে গম্ভীরের কথাগুলোই হয়তো বেশি রূঢ় ছিল! সোজা বলে দিয়েছিলেন, চার টেস্টের এই সিরিজে ইংল্যান্ডের কোনো টেস্ট জেতার তেমন সম্ভাবনা তিনি দেখেন না। তার পাশাপাশি মন্তব্য করেছিলেন রুটকে নিয়েও। এই টেস্টের আগে শ্রীলঙ্কায় দুই টেস্টের সিরিজের দুই ম্যাচেই সেঞ্চুরি করেছেন রুট, একটি তো ডাবল সেঞ্চুরি। কিন্তু গম্ভীর বলেছিলেন, ভারতের মাটিতে রুটকে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখেই পড়তে হবে। আজ চেন্নাই টেস্টের প্রথম দিনে গম্ভীরের বিশ্লেষণকে কাঁচকলা দেখিয়ে দিল রুটের ব্যাট। ১৯৭ বল, ১৪ চার আর ১ ছক্কায় অপরাজিত ১২৮ রানের চোখধাঁধানো এক ইনিংসে।

শুধু রুটের কীর্তির বয়ানেই অনেক সময় পেরিয়ে যাবে। তবু একে একে বলার চেষ্টা করা যাক। বলতে গেলে ‘৩’ সংখ্যাটার ঝলকই আজ দেখিয়েছেন রুট। সেটি শুধু তাঁর টেস্টের সংখ্যা তিন অঙ্ক ছোঁয়ার কারণে নয়। রানের অঙ্কও ‘৩’ ছুঁয়েছে তো বটেই, এ নিয়ে টানা তিন টেস্টেই সেঞ্চুরি করলেন রুট। তাতে একটা রেকর্ডও হলো—প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে নিজের ৯৮, ৯৯ ও ১০০তম টেস্টে সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়লেন রুট।
শততম টেস্টে সেঞ্চুরি টেস্ট ইতিহাসই এর আগে দেখেছে হাতে গোনা। রুটকে নিয়ে এ পর্যন্ত ৯ জন হলো। এর আগের আটজনের নামগুলো দেখুন—কলিন কাউড্রে, জাভেদ মিয়াঁদাদ, গর্ডন গ্রিনিজ, অ্যালেক্স স্টুয়ার্ট, ইনজামাম–উল–হক, রিকি পন্টিং, গ্রায়েম স্মিথ ও হাশিম আমলা। এঁদের মধ্যে পন্টিং দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করেছেন। রুট পারবেন পন্টিংয়ের কীর্তি ছুঁতে?

default-image

ওহ, আরেকটা জায়গায়ও ‘৩’—এর ঝলক দেখালেন রুট। টেস্ট ইতিহাসে নবম হলেও ইংল্যান্ডের জার্সিতে তো শততম টেস্টে সেঞ্চুরি করা ক্রিকেটারদের তালিকায় রুটের জায়গা হলো ৩ নম্বরে। আগের দুজনের নাম ওপরেই আছে—কাউড্রে ও স্টুয়ার্ট।
আর কোন জায়গায় ৩-এর ঝলক? এক পঞ্জিকাবর্ষে রুটের সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরির সংখ্যায়। ২০২১ সালটা বিশেষ কোনো প্রতিজ্ঞা-টতিজ্ঞা করেই নিশ্চিত শুরু করেছেন রুট। না হলে মাঠে নেমেই এভাবে ঝলক দেখিয়ে যাওয়ার রহস্য কী? এর আগে এক বছরে টেস্টে রুটের সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরির সংখ্যা ছিল ৩টি—২০১৪ ও ২০১৫ সালে। ২০২১ সালে এ নিয়ে তৃতীয় টেস্ট খেলছেন রুট, শ্রীলঙ্কাতে দুই টেস্টে দুই সেঞ্চুরির পর তৃতীয় টেস্টেই বছরে তিন সেঞ্চুরি হয়ে গেল তাঁর! মাত্র ফেব্রুয়ারি মাসের পঞ্চম দিন চলছে। সব ঠিক থাকলে এ বছরে আরও ১৪টি টেস্ট খেলার কথা ইংল্যান্ডের! রুট কোথায় গিয়ে থামবেন!

এক রুটই কোহলির টেস্ট দলে প্রত্যাবর্তনের দিনটা মাটি করে দিলেন। সন্তান জন্মের সময়ে স্ত্রীর পাশে থাকতে অস্ট্রেলিয়ায় ভারতের ঐতিহাসিক সিরিজের প্রথম টেস্ট শেষেই দেশে ফিরেছিলেন কোহলি। তাঁকে ছাড়াই বরং পরের তিন টেস্টে দারুণ উপাখ্যান লিখেছিল ভারত। আজ কোহলি ফিরতেই আবার ভারতের হতাশা।
ররি বার্নস ও সিবলির উদ্বোধনী জুটি ভাঙে ৬৩ রানে। রবিচন্দ্রন অশ্বিনের বলে উইকেটের পেছনে ঋষভ পন্তের হাতে ক্যাচ দিয়ে বার্নস যখন ফিরছেন, তাঁর ব্যক্তিগত রান ৩৩। স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ না হতেই ফেরেন তিনে নামা ড্যান লরেন্সও, এলবিডব্লু হয়ে যান যশপ্রীত বুমরার বলে। ভারত তখন হয়তো ইংল্যান্ডের ওপর চেপে ধরার আশায়ই ছিল।

বিজ্ঞাপন
default-image

সে আশার গুড়ে বালি। ২৬তম ওভারের চতুর্থ বলে লরেন্স আউট হলেন, এরপর দিনজুড়ে রুট আর সিবলির নিরলস ব্যাটিংয়ে অসহায় ভারত। দুজন মিলে ৬৩.৫ ওভার ধরে হতাশায় ভুগিয়েছেন ভারতকে। বুমরা, ইশান্ত শর্মা, অশ্বিন, ওয়াশিংটন সুন্দর ও শাহবাজ নাদিম—ভারতের পাঁচ বোলারের কেউই কোনো ফায়দা করতে পারেননি। দারুণ সুযোগ তো নয়ই, ক্রিকেটের ভাষায় ‘হাফ চান্স’ও বলতে গেলে দেননি রুট-সিবলি।

পিচ ব্যাটিং সহায়ক ঠিকই, তার ওপর সুন্দর ও নাদিমের লাইন-লেংথে নিয়ন্ত্রণ তেমন ছিল না। চাপে ফেলার মতো চতুর্থ ও পঞ্চম বোলারের অভাববোধ করেছে ভারত। কোহলিদের ভুগিয়েছে নড়বড়ে ফিল্ডিং আর বোলারদের নো বলও। বুমরা নো বল করেছেন ৩টি, ইশান্ত ৪টি, এমনকি বাঁহাতি স্পিনার নাদিমও নো বল করেছেন ৪টি!
তার ফল? রুট-সিবলির ঠিক ২০০ রানের জুটি! ২০১২ সালে নাগপুরে জোনাথন ট্রন ও ইয়ান বেলের পর এই প্রথম ভারতের মাটিতে ভারতের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের কোনো জুটিতে ২০০ রান হলো। নাগপুরের ওই টেস্টটাও রুটের কাছে বিশেষ—রুটের অভিষেক টেস্ট ছিল সেটি। ভারতের মাটিতে এ নিয়ে ৭টি টেস্ট খেলছেন রুট। প্রতিটি টেস্টেই অন্তত এক ইনিংসে ৫০ বা তার বেশি রান দেখেছে তাঁর ব্যাট। এ নিয়ে সেঞ্চুরি দুটি, ফিফটি পাঁচটি।

রুটের প্রশংসা তো হবেই, সিবলির দারুণ ধৈর্যেরও প্রশংসা করতে হবে। তাঁর ৮৭ রানের ইনিংস এসেছে ২৮৬ বলে! চার ১২টি, কোনো ছক্কা নেই। ভারতে টেস্টের প্রথম ইনিংসে ২৫০-এর বেশি বল খেলা তৃতীয় ইংলিশ ব্যাটসম্যান তিনি। ৯০তম ওভারের তৃতীয় বলে বুমরার বলে সিবলি এলবিডব্লু হতেই দিনের খেলার শেষ ডেকে দেন আম্পায়াররা।

সংক্ষিপ্ত স্কোর: ইংল্যান্ড ১ম ইনিংস ২৬৩/৩ (রুট ১২৮*, সিবলি ৮৭, বার্নস ৩৩, লরেন্স ০; বুমরা ২/ ৪০, অশ্বিন ১/৬৮, ইশান্ত ০/২৭, সুন্দর ০/৫৫, নাদিম ০/৬৯)

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন