default-image

বাংলাদেশের জয়ের পর তখন পেরিয়ে গেছে দেড় ঘণ্টা। পি সারা ওভালে নেমে এসেছে সুনসান নীরবতা। মাঠকর্মীরা নেমে পড়েছেন তাঁদের নৈমিত্তিক কাজে। ভেজানো হচ্ছে পিচ, মাঠের ঘাস। অন্য কর্মীরা চেয়ারগুলো গুছিয়ে নিচ্ছেন, বিজ্ঞাপনী হোর্ডিংগুলো সরাচ্ছেন। চারদিকে শেষের সুর। কিন্তু এই নীরবতা ও বিদায়ী সুরের মধ্যেই জেগে উঠছে অন্য রকম কোলাহল, নতুন এক আলো।

সামনের যে পিচ পানিতে ভিজে একাকার, সেখানেই খানিক আগে নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন এক ইতিহাস। শ্রীলঙ্কাকে তাদেরই মাটিতে ৪ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশ তার শততম টেস্টে পেয়েছে স্বপ্নের মতো এক জয়। টেস্ট পরিবারে সবার শেষে এসে চতুর্থ দল হিসেবে এই কীর্তিটা গড়া সামান্য প্রাপ্তি নয়। এর আগে নিজেদের শততম টেস্ট জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান। এবার জিতল বাংলাদেশ।
জিজ্ঞেস করে দেখুন, বাংলাদেশের শততম টেস্টে হেরে বিশেষভাবে দুঃখিত কিংবা বিচলিত কি না শ্রীলঙ্কা। শ্রীলঙ্কানদের মন খারাপ হারটা ঘরের মাঠে বলে এবং প্রতিপক্ষ ‘পুঁচকে’ বাংলাদেশ বলে। ম্যাচের পর শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক রঙ্গনা হেরাথ যেমন বলে গেলেন, এটি তাদের নিকৃষ্টতম পরাজয় ঠিক নয়, তবে নিকৃষ্ট পরাজয়গুলোর একটি। আসলে শততম টেস্ট একটা সংখ্যা এবং ধারণা ছাড়া আর কিছু তো নয়!
তা হোক, এই মাঠের মধ্যে কাল যে ছবিটা আঁকা হলো, যে আনন্দের মুহূর্তগুলো রচিত হলো, সেসব চিরটা কাল একটি জ্বলজ্বলে সুখের অনুভূতি হয়ে রইবে বাংলাদেশের ক্রিকেট মানসে। এসব ছবির অনেকগুলোই দেয়ালে দেয়ালে ঝুলবে। জয় বাংলা কাপ নামের ট্রফিটি ধরে আছেন দুই অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম ও রঙ্গনা হেরাথ। গল টেস্টে হারের পর পি সারায় জিতে বাংলাদেশ সিরিজটিকে অমীমাংসিত রেখেছে বলেই এই ছবি। ম্যাচসেরার স্বীকৃতির স্মারক হাতে তামিম ইকবাল, সিরিজ-সেরার স্বীকৃতি নিয়ে সাকিব আল হাসান। তারপর গোটা বিজয়ী দলের একসঙ্গে ফ্রেমবন্দী হওয়া। এগুলো শুধু বাংলাদেশের ক্রিকেটেরই নয়, ক্রিকেট ইতিহাসেরই অমর ছবি হয়ে ঢুকে গেল ইতিহাসে।
কিন্তু কালকের কোন ছবিটাকে আপনি হৃদয়ের সবটুকু আকুতি দিয়ে এঁকেছেন? নিশ্চিত করেই চা-বিরতির ঠিক ৪৮ মিনিট পর ৫৮তম ওভারের পঞ্চম বলে যখন ২টি রান নিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। রঙ্গনা হেরাথ বল করছিলেন প্রেসবক্স প্রান্ত থেকে। তিন বল আগে তাঁর টার্ন ও বাউন্সে পরাস্ত হয়ে ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হয়ে এসেছেন মোসাদ্দেক হোসেন। মিরাজ পঞ্চম বলটি সুইপ করলেন স্কয়ার লেগে। বল যতটা গিয়েছিল, হতে পারত ৩ রান। কিন্তু জয়ের জন্য দরকার ২ রান, তা-ই নিয়ে উল্লাসে হাওয়ায় দুহাত ছুড়লেন মিরাজ। জিতে গেল বাংলাদেশ। উইকেটে থাকা অধিনায়ক মুশফিকের আলিঙ্গনে বাঁধা মিরাজ। চির-অমলিন ছবি! তারপর যা হয় আর কী, বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো মানুষের স্রোত ছুটল মাঠের দিকে। না, আসলে ছুটতে চেয়েছিল আর কী! এ তো আর ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম নয়, এ যে বিদেশবিভুঁই। তারপরও যে গুটিকতক সমর্থক এখানে শততম টেস্টে জয়ের সুবাস পেয়ে ছুটে এসেছিলেন, তাঁরা এবং বাংলাদেশি সাংবাদিকের বহরটিই মাঠখানাকে লোকে লোকারণ্য বানিয়ে দিল। নিরাপত্তারক্ষীরা বাধা দিতে গিয়েও নিরুপায়। এমন দৃশ্য কখনো দেখেননি তাঁরা।
কেমন করে এটি সম্ভব হলো? এককথায় বলা যেতে পারে বদল। দলের মানসিকতায় বদল। দলের সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের মধ্যে বদল। সেরা পেসার মোস্তাফিজের বদলে যাওয়া একটি বোলিং স্পেল এবং সর্বশেষ তামিমের মানসিকতার বদল। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে রান পান না বলে যে তামিমের ছিল চিরকালীন আক্ষেপ, সেই তামিম কাল লাঞ্চের পর বদলে যাওয়া ব্যাটসম্যান। ১৯১ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশ হেরাথের করা অষ্টম ওভারে বিপর্যস্ত, শেষ দুই বলে সৌম্য ও ইমরুলের উইকেট দুটি হারিয়ে ২২/২। বাংলাদেশ লাঞ্চ করতে যায় ২ উইকেটে ৩৮ রানে।
কিন্তু লাঞ্চের পর বদলে যাওয়া তামিম সাব্বিরকে নিয়ে খেলতে থাকলেন দুর্দান্ত। দ্রুত প্রান্তবদল। মারার বল ছাড়া নয়। ছাড়ার বল ছেড়ে দেওয়া। এই করে করেই তৃতীয় উইকেটে ১০৯ রানের জুটি ২৮.৫ ওভারে। দিলরুয়ান পেরেরার অফ স্পিনে তুলে মারতে গিয়ে তামিম যখন ডিপ মিডঅনে ক্যাচ হলেন, ১২৫ বলে তাঁর রান ৮২, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট-সর্বোচ্চ। যাতে সাতটি চারের সঙ্গে ছিল একটি ছক্কা, সেটি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন প্রেসবক্সের ছাদের ওপর। এখান থেকে দরকার ছিল আর মাত্র ৬০ রান। অনভ্যস্ততায় আরও ৩ উইকেট পড়েছে, সাব্বির এলবিডব্লু হয়ে ফিরেছেন ৪১ রানে। ম্যাচের নায়ক সাকিব ওই পেরেরার বলে অদ্ভুতভাবে বোল্ড। খেলা শেষের তিন বল আগে ফিরলেন অভিষেকের আলোয় উজ্জ্বল মোসাদ্দেক।
বাংলাদেশ ম্যাচটি জিতেছে আসলে সাকিবের অলরাউন্ড নৈপুণ্যে। দ্বিতীয় দিন বিকেলে পাগুলে ব্যাটিংয়ে ভয় ধরিয়ে দেওয়া সাকিব প্রথম ইনিংসে করেছেন সেঞ্চুরি। তারপর বোলিংয়ে ৪ উইকেট নিয়ে শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংস মুড়ে দিয়েছেন ৩১৯ রানে। ম্যাচে তাঁর ৬ উইকেট, রান ১৩১। এর সঙ্গে গল টেস্টের ৩ উইকেট ও ৩১ রান, যোগ্যতম খেলোয়াড়ের গলাতেই উঠেছে সিরিজ-সেরার স্বীকৃতি।
তবে জয়ের পেছনে অনেক টুকরো অবদান থাকে, সেগুলোও মনে করা উচিত। যেমন চতুর্থ দিন লাঞ্চের পর ৭ ওভারের আগুনে স্পেলে মোস্তাফিজের ৩ উইকেট তুলে নেওয়া। কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে এই জয়ের পেছনে ওই স্পেলটাকে মানছেন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কাল শর্ট স্কয়ার লেগ থেকে শুভাশিসের ওই মিসফিল্ডিং এবং তা থেকে ৫০ রানে দিলরুয়ানের রানআউট হওয়াও কি নয়! দিলরুয়ান ওভাবে রানআউট না হলে শ্রীলঙ্কা আরও রান করতেই পারত। আরেকটা কথাও মনে থাকবে। রোমাঞ্চকর এই টেস্টটি জিততে কষ্ট হয়েছে সুন্দরম রবি নামের একজন আম্পায়ার ছিলেন বলে। জয়ের জন্য ২৩ রান দরকার, এমন সময় ওই আম্পায়ার অফ স্টাম্পের এক হাত বাইরের বলে এলবিডব্লু দিয়ে দিয়েছিলেন মুশফিককে। ভাগ্যিস, ডিআরএস নেওয়া হয়েছিল!
তবে এটি ইতিহাসের গায়ে একটু আঁচড়ও কাটতে পারবে না। ইতিহাসে জ্বলজ্বল করে জ্বলবে শুধু এই সত্য, বাংলাদেশ জিতেছে তার শততম টেস্টে।

শ্রীলঙ্কা: ৩৩৮ ও ৩১৯
বাংলাদেশ: ৪৬৭ ও ১৯১/৬
ফল: বাংলাদেশ ৪ উইকেটে জয়ী

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন