default-image

লোহা ও টিনের পাত দিয়ে তৈরি চারকোনা বোর্ড, পেছনে ত্রিপলের ছাউনি। দেখতে অনেকটা ঘরের মতো। এখানেই সাত-আটজনের কর্মস্থল। ক্রিকেট মাঠের এই ‘ঘরে’র নাম স্কোরবোর্ড। যেখানে ক্রিকেট মাঠে রান, আউট, ওভার হলেই দুই-তিনজন নড়েচড়ে বসেন। কিছু সংখ্যা এদিক-ওদিকে করেন। সেই সংখ্যাই ক্রিকেট ম্যাচের গল্প বলে। লোহা, টিন ও ত্রিপলের তৈরি ঘর থেকে তখন নড়াচড়ার শব্দ আসে। প্রতিটি রান, উইকেটেই নড়াচড়া, একই শব্দ। চট্টগ্রাম এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের অ্যানালগ স্কোরবোর্ডের গল্পটা এ রকমই।

আশির দশকে এমএ আজিজের স্কোরবোর্ড ছিল মূল মাঠেই। তখন প্রতিদিন স্কোরবোর্ডের জন্য ১০০ টাকা করে পেতেন আবদুল আউয়াল, যিনি এখন চট্টগ্রাম আম্পায়ার ও স্কোরার অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। ১৯৮৮ এশিয়া কাপের ম্যাচে কপিল দেব, দিলীপ ভেংসরকারদের খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। ঠিক বাউন্ডারির পাশেই যে ছিল স্কোরবোর্ড। এখন সেই স্কোরবোর্ড স্টেডিয়ামের গ্যালারির ওপরে।

default-image
বিজ্ঞাপন

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও বিসিবি একাদশের প্রস্তুতি ম্যাচে নতুন স্কোরবোর্ডের ছায়ায় বসে অতীতের গল্প করছিলেন আবদুল আউয়াল, ‘আমি তখন বোর্ডে কাজ করতাম। তখন তো ক্রিকেটারদের খুব কাছেই থাকতে পারতাম। আমার সামনে সারা দিন ফিল্ডিং করেছিল কপিল দেব। আরও কত ক্রিকেটারকে এই বোর্ডে কাজ করার সুবাদে কাছ থেকে দেখেছি।’

এখনকার গল্পটা ভিন্ন। চট্টগ্রাম আম্পায়ার ও স্কোরার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা ঘুরেফিরে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে স্কোরবোর্ডে কাজ করেন। তাঁদের ব্যবস্থাপনায় আছেন আজিজুল হক, সিনিয়র বোর্ড অপারেটর। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম, এমএ আজিজ—দুই স্টেডিয়ামেই টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট, ক্লাব ক্রিকেটের ম্যাচে স্কোরিং করেন আজিজুল ও তাঁর দল। প্রতি ম্যাচে সাত-আটজন ঘুরেফিরে কাজ করে যান নিরলসভাবে।

টিনের তৈরি চারকোনা ঘরের পাশঘেঁষা সিঁড়ি বেয়ে এসে স্কোরাররা বসেন যে যাঁর জায়গায়। এরপর চলে খুনসুটি, আড্ডা আর ক্রিকেট দেখা। কে কেমন ক্রিকেটার, আগে কোথায় খেলেছেন, বড় অর্জন কী—স্কোরারদের ক্রিকেট আড্ডা চলতেই থাকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও বিসিবি একাদশের প্রস্তুতি ম্যাচে যেমন স্কোরারদের দলটা আড্ডায় মাতেন লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেনকে নিয়ে। একজন বলছেন, ‘রিশাদ তো অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ছিল, তাই না?’ সায় দিয়ে অন্যজন বলেন, ‘অনেক লম্বা লেগ স্পিনার কিন্তু।’

ঠিক তখনই ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাটসম্যান শেন মোজলে বোল্ড হন রিশাদের লেগ স্পিনে। হঠাৎই আড্ডা থামে সবার। শুরু হয় সংখ্যায় ক্রিকেটের গল্প বলা। ১, ২, ৩ সংখ্যা লেখা টিনের কার্ডগুলো থেকে টুংটাং আওয়াজ আসতে থাকে। টিনের কাঠামোয় গড়া স্কোরবোর্ডে স্কোরারদের হাঁটাচলার শব্দ জোরালো হতে থাকে। নতুন ব্যাটসম্যান ব্যাটিংয়ে না নামা পর্যন্ত এই ব্যস্ততা চলতে থাকে। কিছুক্ষণ পর আবার বোলার বল শুরু করেন। স্কোরাররা অপেক্ষা করেন রান কিংবা উইকেটের।

এই কাজের জন্য প্রতিদিন ৬০০ টাকা করে পান স্কোরাররা। স্কোরার আনিসুজ্জামানের অবশ্য এ নিয়ে আক্ষেপ নেই খুব একটা, ‘আমরা মনের আনন্দে কাজ করি। খেলা দেখি। আড্ডা দিই। ভালোই লাগে। ভালো লাগা থেকেই এটা করা।’

কিন্তু আনিসুজ্জামানদের ভালো লাগার কাজটা আজকাল কয়জন–ই বা দেখেন! কে কত রানে করলেন, কত উইকেট পেলেন—এসব তথ্য জানতে আজকাল মাথা উঁচু করে মাঠের বিশাল স্কোরবোর্ডে তাকানোর দরকার পড়ে না। মোবাইলের চার-পাঁচ ইঞ্চি স্ক্রিনেই তো সব তথ্য চলে আসে। আর মাঠে ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ড তো আছেই। অ্যানালগ স্কোরবোর্ডে এত আয়োজনের কী দরকার? আজিজুল হকের কথায় প্রশ্নটার উত্তর পাওয়া গেল, ‘ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ডে যান্ত্রিক জটিলতা হতে পারে। অনলাইনে নানা কারণে আপলোডে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু আমরা সারাক্ষণ আছি, থাকব।’

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন