বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ
সময়কে হারিয়ে দেওয়া এক কিংসমিড
৩১ মার্চ ডারবানের কিংসমিডে শুরু হবে সিরিজের প্রথম টেস্ট। তার আগে কিংসমিডের উইকেট নিয়ে আশাবাদী হতে পারেন বাংলাদেশের স্পিনাররা।
দুই দিন ছিল বিশ্রাম। বৃষ্টিতে খেলা হয়নি এক দিন। বাকি ৯ দিনই দুই দল ছিল মাঠে। সব মিলিয়ে টেস্টটা হয়েছিল ১২ দিনের। সেটি আরও বাড়ত যদি না ইংল্যান্ড দলের জাহাজ ধরার তাড়া থাকত।
১৯৩৯ সালের ৩ মার্চ শুরু হওয়া টেস্ট ম্যাচটা ফলাফল না হওয়ার পরও ১৪ মার্চে বাধ্য হয়ে শেষ করতে হয়েছিল ইংল্যান্ড দলকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জাহাজ বন্দর থেকে ছেড়ে দিচ্ছিল বলে। নয়তো সময়কে হারিয়ে দেওয়া ডারবানের কিংসমিডে ইতিহাসের সর্বশেষ ‘টাইমলেস টেস্ট’টা হতে পারত আরও দীর্ঘ, ক্রিকেট ইতিহাসের দীর্ঘতম ম্যাচের দৈর্ঘ্য বাড়তে পারত আরও। ৫৪৪৭ বল আর ১৯৮১ রানের ম্যাচে তখন সবই যেত আরও বেড়ে।
এমন এক ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকাটা কিংসমিডের মাঠের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি বদলেছে। এখন যেমন বলা হয়, এ মাঠের উইকেট আফ্রিকার প্রথাগত পেসবান্ধব উইকেটের চেয়ে একটু আলাদা। বল আসে কিছুটা ধীরে। সমুদ্রপারের শহর বলে ডারবানের উষ্ণতা বেশি। জোহানেসবার্গ, সেঞ্চুরিয়নের মতো পাতলা গরম কাপড়ও গায়ে রাখতে হয় না বেশির ভাগ সময়। এমন আবহাওয়ায় টেস্টের উইকেট একটা সময়ে ভাঙাটাও স্বাভাবিক।
তাই বলে পেসারদের হটিয়ে কিংসমিড পুরোপুরি স্পিনারদের স্বর্গরাজ্য হয়ে যায়নি। এখনো এ মাঠের উইকেটে পেসাররাই বেশি উইকেট নেন, তবে স্পিনারদের উইকেট পাওয়ার হার আগের তুলনায় বাড়ছে। ১৯৯২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার পর থেকে এ পর্যন্ত এ মাঠে বোলাররা ২৫ ম্যাচে ২৯.৬৭ গড়ে মোট উইকেট নিয়েছেন ৭৭০টি, ৫ উইকেট পাওয়ার ঘটনা আছে ৩৩ বার।
এর মধ্যে ২৯.০১ গড়ে পেসাররা নিয়েছেন ৫৯১ উইকেট, ৫ উইকেট ২৩ বার। উল্টো দিকে স্পিনাররা ১০ বার ৫ উইকেট নিয়ে ৩১.১৮ গড়ে পেয়েছেন মোট ১৭৭ উইকেট। এখান থেকে গত ১০ বছরের হিসাব আলাদা করলেই কিংসমিডে স্পিনারদের ভালো করার প্রবণতাটা ফুটে ওঠে।
এই সময়ে এ মাঠে পেসাররা মাত্র দুবার ৫ উইকেট পেলেও স্পিনাররা পেয়েছেন চারবার। উইকেটপ্রতি রানেও স্পিনারদের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। ৫ টেস্টে ২৯.৪৭ গড়ে তাঁরা নিয়েছেন ৪৮ উইকেট। পেসারদের অর্জন ২৬.৭৭ গড়ে ১০৯ উইকেট। কিংসমিডে টেস্টের এক ইনিংসে সেরা দুই বোলিং পারফরম্যান্সের কৃতিত্বটাও এখনো একজন স্পিনারেরই। ১৯৫৭ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার অফ স্পিনার হিউ টেইফিল্ড ৬৯ রানে নিয়েছিলেন ৮ উইকেট। এর আগে ১৯৫০ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাঁর নেওয়া ২৩ রানে ৭ উইকেট এখনো টেস্টে কিংসমিডের দ্বিতীয় সেরা বোলিং পারফরম্যান্স।
৩১ মার্চ শুরু দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের স্পিনাররাও এ উইকেটে স্পিনারদের ভালো করার প্রবণতাটা ধরে রাখতে পারবেন কি না, সেটাই এখন প্রশ্ন। সাকিব আল হাসানের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ দলের স্পিন নেতৃত্বের ভার যার কাঁধে থাকবে, কেপটাউনে ১৪ দিনের ক্যাম্প করে ডারবানে এসে সেই তাইজুল ইসলাম কিন্তু আশাবাদী। পরশু রাতে ডারবানের টিম হোটেলের সামনে বাঁহাতি স্পিনার বলছিলেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার উইকেটে নিখুঁত বোলিং করাটাই আসল। ভালো জায়গায় বল ফেলতে পারলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।’
কেপটাউনে প্রস্তুতি ক্যাম্পের দায়িত্ব থাকা জেমি সিডন্স অবশ্য সব সময় সবকিছু নিয়েই আশাবাদী এক মানুষ। প্রস্তুতি ক্যাম্প কেমন হলো জানতে চাইলে এই অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটিং কোচ বলেছেন, ‘আমরা সেখানে সেন্টার উইকেটে তিনটি অনুশীলন সেশন করেছি। দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে নতুন বলে খেলার অভ্যাসটা রপ্ত করতে এটা ছিল ব্যাটসম্যানদের জন্য দারুণ সুযোগ। সেখানকার উইকেটে প্রাণ থাকায় ব্যাটসম্যানদের চ্যালেঞ্জেও পড়তে হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্যাম্পটা খুব ফলপ্রসূই হয়েছে বলব।’
কিংসমিডের উইকেট আর তাইজুল-সিডন্সের কথার সঙ্গে একটি পরিসংখ্যান সামনে আনলে ডারবান টেস্ট নিয়ে বাংলাদেশের আশাটা বাড়বে বৈ কমবে না। এই মাঠে ৪৪টি টেস্ট খেলে দক্ষিণ আফ্রিকার হারের পাল্লাটাই সামান্য ভারী। ১৪টি করে ম্যাচে জয় আর ড্র, হার বাকি ১৬ টেস্টেই।
সময়কে হারিয়ে দেওয়া কিংসমিডে এবার বাংলাদেশও পারবে তো দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাতে?