২০১১ সালের পর এ নিয়ে দ্বিতীয়বার সাকিব নেই আইপিএলে।
২০১১ সালের পর এ নিয়ে দ্বিতীয়বার সাকিব নেই আইপিএলে।ফাইল ছবি

২০১৯ আইপিএলে সাকিব আল হাসান নিয়মিত সুযোগ পাননি সানরাইজার্স হায়দরাবাদের একাদশে। বেশিরভাগ ম্যাচেই তাঁকে হাত–পা গুটিয়ে বসে থাকতে হয়েছে। কিন্তু মাঠের বাইরে বাঁহাতি অলরাউন্ডার নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন অন্য কাজে। পুরোনো কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে ঢাকা থেকে ভারতে উড়িয়ে নিয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন বিশ্বকাপের জন্য। সেই প্রস্তুতি তাঁর কতটা কাজে দিয়েছে, বিশ্বকাপের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই তা বলে দিয়েছে। বিশ্বকাপ চলার সময়ই হায়দরাবাদ কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত ভেবে রেখেছিল, সাকিবকে এবার আর বসিয়ে রাখা যাবে না!

সাকিবকে এবার আক্ষরিক অর্থেই দর্শক হয়ে দেখতে হচ্ছে আইপিএল। আইসিসির নিষেধাজ্ঞায় বাঁহাতি অলরাউন্ডার আছেন ক্রিকেটের বাইরে। তবে সাকিবকে যে এবার হায়দরাবাদ খুব মিস করবে, তা নিয়ে হয়তো সংশয় সামান্যই। দুদিন আগে এক বিশ্লেষণীতে ধারাভাষ্যকার হার্শা ভোগলে বলেছেন, ‘এটাই হতে পারত সাকিব আল হাসানের টুর্নামেন্ট।’ হার্শার যুক্তি, মিডল অর্ডারে রানের চাকা সচল রেখে দলকে কাঙ্ক্ষিত স্কোর এনে দেওয়া আর বাঁহাতি স্পিনে ৪টা ওভার—সাকিবের এই সেবাটা পেলে হায়দরাবাদ অনায়াসে হয়ে উঠত শিরোপার বড় দাবিদার।

বিজ্ঞাপন
default-image

সাকিব আইপিএল খেলছেন ২০১১ থেকে। শুধু ২০১৩ সালে টুর্নামেন্টটি খেলা হয়নি বাংলাদেশ দলের সিরিজ থাকায়। আইপিএলে নিজের প্রথম ছয় মৌসুম খেলেছেন কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে খেলেছেন হায়দরাবাদের হয়ে। আইপিএলের ৬৩ ম্যাচে ৭৪৬ রান আর ৫৯ উইকেট নেওয়া সাকিবের গুরুত্ব শুধু খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, তাঁর উপস্থিতি ফ্র্যাঞ্চাইজির বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আইপিএলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন সাকিব থাকা মানেই বঙ্গীয় বদ্বীপের কোটি কোটি দর্শক আগ্রহী চোখে তাকিয়ে থাকেন আইপিএলে।

শুধু কি সাকিব? গত চার বছরের আরও একটি নাম আইপিএলের প্রতি মনোযোগ বাড়িয়েছে বাংলাদেশি দর্শকদের—মোস্তাফিজুর রহমান। ২০১৬ আইপিএলে হায়দরাবাদের হয়ে ধারাবাহিক যে দুর্দান্ত বোলিং করেছিলেন বাঁহাতি পেসার, শুধু বাংলাদেশে কেন; সেটি আলোড়ন তুলেছিল পুরো ক্রিকেট বিশ্বেই। তুলবে না–ই বা কেন, মোস্তাফিজের বোলিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল হায়দরাবাদের শিরোপা জয়ে। সেবার টুর্নামেন্টের সেরা উদীয়মান ক্রিকেটারের পুরস্কার জিতেছিলেন বাংলাদেশের পেসার। মোস্তাফিজ ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নন বলে হায়দরাবাদের কোচ টম মুডি আর অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার তাঁকে নিয়ে বাংলায় পর্যন্ত টুইট করেছেন!

বিজ্ঞাপন
default-image

গত চার বছরে বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে আপিএল মানেই সাকিব আর মোস্তাফিজ। দুই তারকার খেলা কবে, কখন—বাংলাদেশি দর্শক সূচিতে এটিই খুঁজেছেন। সন্ধ্যায় টিভি শো রুমের সামনে পথচারীরা দাঁড়িয়ে চোখ রেখেছে দুই তারকার ম্যাচে। বাংলাদেশের দর্শকদের এই আগ্রহ দেখে সাকিব–মোস্তাফিজকে নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা নানা প্রচারণায় নিয়মিত কাজে লাগিয়েছে তাঁদের ফ্র্যাঞ্চাইজি।

বাংলাদেশের এই দুই খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তা বেশ আঁচ করা গেছে গত নভেম্বরে ভারত সফরেও। বাংলাদেশের সাংবাদিক দেখলেই ভারতীয় দর্শকেরা খুব আগ্রহ নিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন সাকিবের। জানতে চেয়েছেন মোস্তাফিজের সাম্প্রতিক ফর্ম নিয়ে। বাংলাদেশ দলের বেশিরভাগ সংবাদ সম্মেলনেও দুই খেলোয়াড়কে নিয়ে প্রশ্ন থাকত ভারতীয় সাংবাদিকদের।

বিজ্ঞাপন
আইপিএলের সর্বশেষ নিলামটা ছিল বাংলাদেশিশূন্য। মুশফিকুর রহিমের সুযোগ পাওয়া নিয়ে গুঞ্জন উঠলেও সেটি দ্রুতই মিলিয়ে যায় হাওয়ায়।

এবার সাকিবকে যে পাওয়া যাচ্ছে না, সে তো জানাই। তবে মোস্তাফিজকে নেওয়ার চেষ্টা করেছে অন্তত তিনটি ফ্র্যাঞ্চাইজি—মার্চে রাজস্থান রয়্যালস আর টুর্নামেন্টের আগ মুহূর্তে মুম্বাই ইন্ডিয়ানস আর কলকাতা নাইট রাইডার্স। মুম্বাই চেয়েছিল লাসিথ মালিঙ্গার বিকল্প হিসেবে। আর কলকাতা চেয়েছিল বাঁহাতি ইংলিশ পেসার হ্যারি গার্নির জায়গায়। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সফর হবে ভেবে ‘ফিজ’কে ছাড়তে চায়নি বিসিবি।

২০১৬ থেকে আইপিএলে বাংলাদেশের বড় দুই বিজ্ঞাপন সাকিব–মোস্তাফিজ হলেও ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের শুরুতে কিন্তু ঝড় তুলেছিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। ঝড়টা অবশ্য নিলাম কক্ষেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। ২০০৯ সালে তাঁকে নিয়ে রীতিমতো দড়ি টানাটানি হয়েছিল কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিকদের একজন জুহি চাওলা আর কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের মালিক প্রীতি জিনতার মধ্যে। তখন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম লড়াইটার নাম দিয়েছিল ‘ব্যাটল অব বলিউড।’

বিজ্ঞাপন

বলিউডের দুই নায়িকার টানাটানিতে ৬ লাখ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪ কোটিতে কলকাতা নাইট রাইডার্সে নাম লিখিয়েছিলেন মাশরাফি। যেটি এখন পর্যন্ত আইপিএলের নিলামে বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ দর। যাঁকে নিয়ে এই আগ্রহ, মাশরাফি নিজেও হয়তো অনেক আশা নিয়ে আইপিএল খেলতে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রত্যাশার পারদ যতটা ঊর্ধ্বমুখী ছিল, ততটাই বাজে হয়েছিল তাঁর আইপিএল-অভিজ্ঞতা।

প্রথম আইপিএলে বেঙ্গালুরুর হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন আবদুর রাজ্জাক। মাশরাফির মতো তাঁরও এক ম্যাচেই সীমাবদ্ধ থেকেছে আইপিএল–অভিজ্ঞতা। ২০০৯ আইপিএল খেলা মোহাম্মদ আশরাফুলও প্রত্যাশা মেটাতে পারেননি, ১ ম্যাচে করেছিলেন ২ রান। তাঁর আর সুযোগ হয়নি আইপিএলে। ২০১২ সালে পুনে ওয়ারিয়র্স তামিম ইকবালকে দলে নিয়ে একটি ম্যাচেও খেলার সুযোগ দেয়নি।

বিজ্ঞাপন

আইপিএলের সর্বশেষ নিলামটা ছিল বাংলাদেশিশূন্য। মুশফিকুর রহিমের সুযোগ পাওয়া নিয়ে গুঞ্জন উঠলেও সেটি দ্রুতই মিলিয়ে যায় হাওয়ায়। নিজেদের দেশের কোনো ক্রিকেটার না থাকলেও আরব আমিরাতে বাংলাদেশি দর্শকেরা হয়তো ঠিকই চোখ রাখবেন আজ শুরু ১৩তম আইপিএলে। এই মহামারিতে এখন আইপিএলই যে বড় ক্রিকেট–বিনোদন, যেখানে সম্মিলন ঘটবে ক্রিকেট বিশ্বের সব বড় বড় তারকাদের। এই টুর্নামেন্ট নিয়ে বাংলাদেশের দর্শকেরা যদি আগ্রহী হন, তাহলে তাদের খেলোয়াড়দের কেন মিস করবে না আইপিএল!

মন্তব্য পড়ুন 0