সাকিব আইপিএলে এখন পর্যন্ত ব্যর্থ।
সাকিব আইপিএলে এখন পর্যন্ত ব্যর্থ। ছবি: কেকেআরের টুইটার

পাড়ার ক্রিকেটে এমন হয়। সামনে কোনো সাদামাটা খেলা। দলের প্রাণভোমরাকে নিয়ে লড়াইয়ের অঙ্ক কষা হচ্ছে। এর মধ্যে সেই ‘প্রাণভোমরা’টি জানালেন, পাশের পাড়ায় বেশ জমকালো এক টুর্নামেন্ট হবে। সেখানে তিনি খেলতে চান। দলের ভবিষ্যৎ ভেবেই এ সিদ্ধান্ত। জমজমাট সে টুর্নামেন্টে অত্র এলাকার সেরাদের সঙ্গে খেলবেন, তাতে নিজের দক্ষতা আরও বাড়বে। আর এর ফল পাড়ার দল ভবিষ্যতে বুঝে নেবে তাঁর উন্নত পারফরম্যান্স।

শুরুতে সবার একটু গাঁইগুঁই করা স্বাভাবিক। নিজের দল ছেড়ে অন্য দলে ‘ভাড়া খাটা’ তো কেউ ভালো চোখে দেখে না। ‘লোভী’—তকমাটা তাই মনে আসেই। ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কথাটা ঠিক না ভুল তা তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু এই আমজনতার বিতর্কের ফাঁকে মাঝেমধ্যে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি মনঃকষ্ট হয় বোধ হয় সেই প্রাণভোমরা এবং তাঁর দলের অধিনায়কের।

default-image

প্রতিপক্ষ দলে অভিষিক্ত এক বাঁহাতি স্পিনার। দুই ইনিংসেই তাঁর সামনে খাবি খেল দল। ওদিকে নিজ দলের ‘প্রাণভোমরা’ সামর্থ্যে সেই বোলারের চেয়েও যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে। কিন্তু পাশের পাড়ায় খেলতে যাওয়ায় মাথা চাপড়ানো ছাড়া উপায় নেই। অধিনায়কের মনে শূন্যতাবোধের সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। অমন উইকেটে ‘প্রাণভোমরা’র ব্যাটিংয়ের মূল্যের কথা না হয় তোলাই থাকল। এর উল্টো দিকটাও দেখা যাক।

পাশের পাড়ায় ‘খ্যাপ’ খেলতে গিয়েও খেলাটা আর হচ্ছে না। বাজে পারফরম্যান্সের জন্য নিয়মিত সুযোগ পাচ্ছেন না দলে। শেষ কয়েক ম্যাচে ডাগআউটে বসে আর সবার মতোই খেলা দেখে সময় কেটেছে। তখন তাঁর কেমন লেগেছে?

ভণিতা রেখে সোজা করেই বলে ফেলা যাক কী নিয়ে কথা হচ্ছে—সাকিব আল হাসান, আইপিএল, বাংলাদেশ দল ও শ্রীলঙ্কা সফর।

বিজ্ঞাপন

অনুশীলনে ব্যস্ত না থাকলে হোটেলে নিজের কামরায় সাকিব নিশ্চয়ই পাল্লেকেলে টেস্ট দেখেছেন। আর সরাসরি দেখার সুযোগ না পেলে হাইলাইটসে মন ভরেছেন। প্রভিন জয়াবিক্রমা আর তাঁর পারফরম্যান্স দেখে ভালো বোধ করার কথা নয়। দুজনেই বাঁহাতি স্পিনার, এর মধ্যে জয়াবিক্রমার আবার অভিষেক ম্যাচ—উইকেট ‘কথা’ বলায় জয়াবিক্রমা যেখানে বল লাট্টুর মতো ঘোরাচ্ছিলেন, সাকিব সেখানে নিশ্চয়ই আরও ভালো করতেন! সামর্থ্য বিবেচনায় যেকোনো বিশ্লেষকই ‘হ্যাঁ’সূচক এমন মত দেবেন।

default-image

কিন্তু শ্রীলঙ্কা সফরে সাকিবের অনুপস্থিতি কি টেস্ট সিরিজ ১-০ ব্যবধানে হারের কারণ? মোটেই না। ক্রিকেট কখনো একজনের খেলা নয়, এটা দলীয় খেলা। যে কেউ যেকোনো সময় না-ই থাকতে পারেন। তাঁর শূন্যতা পুষিয়ে নিতে না পারলে সাকিবের জন্য কান্নার কী অর্থ? দলের চেয়ে কি ব্যক্তি-খেলোয়াড় বড়?

অবশ্যই না। বরং বলা ভালো, পাল্লেকেলেতে দ্বিতীয় টেস্টে যাঁরা (স্পিনার) ছিলেন, তাঁদের ব্যর্থতা অথবা সাফল্যের ঘাটতিই সাকিবকে মনে করতে বাধ্য করছে। শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় ইনিংসে ৭২ রানে ৫ উইকেট নেওয়া তাইজুল ইসলামকে নিয়েই কথাটা তোলা যায়। তাইজুল ভালো বল করেছেন। সেটি চতুর্থ দিনে উইকেট ভাঙতে শুরুর পর। কিন্তু এ ম্যাচে ১১ উইকেট নেওয়া জয়াবিক্রমার সঙ্গে বোলিংয়ে বুদ্ধির ব্যবহারের পার্থক্যে প্রমাণ ব্যবধান।

default-image

প্রথমেই বলের গতি। ভঙ্গুর ও বাঁক নিচ্ছে এমন উইকেটে একটু জোরের ওপর বল করলে প্রত্যাশিত বাঁকটুকু মেলে না। আস্তে ছাড়তে হয় একটু ঝুলিয়ে। তাতে ব্যাটসম্যানের বলের ওপর চোখ রাখতে যেমন সমস্যা, তেমনি প্রচুর বাঁকও নেয় এবং বল ওঠেও—বিশেষ করে আঙুলের পেছন থেকে বল ছাড়লে।

এবার তাইজুল ও জয়াবিক্রমার অ্যাকশনে আসা যাক। তাইজুলের বোলিং অ্যাকশন অন্য যেকোনো বাঁহাতি স্পিনারের চেয়ে দ্রুতগতির। তাই বোলিংয়ে গড় গতিবেগও ঘণ্টায় প্রায় ৮৫ কিলোমিটার। ওদিকে জয়াবিক্রমা গড়ে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার বেগে বল করেছেন। উইকেট থেকে সাহায্য আদায় করে নেওয়া যদি যোগ্যতা হয়—তবে সেই মানদণ্ডে ৩৩ টেস্ট খেলা তাইজুলের তুলনায় প্রথম টেস্ট আর মাত্র ১১তম দীর্ঘ ব্যাপ্তির ম্যাচ খেলতে নামা জয়াবিক্রমা এগিয়ে বুদ্ধির মারপ্যাঁচে।

বোলিং ক্রিজে কোণের ব্যবহারেও এগিয়ে ছিলেন জয়াবিক্রমা। তাইজুল বেশির ভাগ সময়ই ক্রিজের মাঝ থেকে বল করে গেছেন। স্টাম্প ঘেঁষে কিংবা ক্রিজের প্রস্থ ব্যবহার করে বাঁকে অদল-বদল আনার চেষ্টাও করেননি। জয়াবিক্রমা সেটি করেছেন বলেই একই জায়গার বল একেক রকম বাঁক নিয়েছে, তাতে বিভ্রান্ত হয়েছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। প্রশ্ন হলো, সাকিবের আলাপে তাইজুলের দুর্নাম কেন?

কারণ, সাকিব এ কাজগুলো করতে সিদ্ধহস্ত। মন্থর, বাউন্সি ও বাঁক-নির্ভর উইকেটে তাঁর মতো ভয়ংকর স্পিনার খুব বেশি দলে নেই। প্রাণহীন উইকেটেও বুদ্ধির ব্যবহারে সাকিবের মতো পারঙ্গম বোলার খুব কম। আর তিনি নেই বলেই তাইজুলদের হারে সাকিবের না থাকার প্রসঙ্গ উঠছে। আইপিএলে শেষ চার ম্যাচে সাকিবের অনুপস্থিতি আরও বেশি করে চোখে বিঁধছে। কিন্তু এই আবেগাক্রান্ত অনুভূতির রাহুতে সবাই যেন ভুলে গেছে, কারও জন্য কোনো কিছু শূন্য পড়ে থাকে না—কথাটা চিরকালীন, শুধু বাংলাদেশ দল বাদে!

একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান—বাংলাদেশ দল টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর বিদেশের মাটিতে সাকিব ছাড়া কখনো প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট নিতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন