রানের জন্য দৌড়াচ্ছেন দিমুথ করুনারত্নে। সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি।
রানের জন্য দৌড়াচ্ছেন দিমুথ করুনারত্নে। সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি।ছবি: এএফপি

‘নিয়মিত টেস্ট জিততে প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট নিতে হবে। হ্যাঁ, রানও করতে হবে কিন্তু প্রতিপক্ষকে অলআউট করতে না পারলে কত রান করলেন, তাতে কিছু যায় আসে না’—কথাটা গ্লেন ম্যাকগ্রার।

অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তির এ কথার সঙ্গে পৃথিবীর সব ক্রিকেটারই সম্ভবত একমত হবেন। টেস্ট জিততে প্রতিপক্ষকে অলআউট করতেই হবে। ঘরের মাঠ হলে এ লক্ষ্যে বাড়তি কিছু সুবিধা মেলে। প্রতিপক্ষের মাঠে খানিকটা অসুবিধা হলেও বড় দলগুলো কিন্তু এ কাজটা নিয়মিতই করছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কেন পারছে না? বড় দল হয়ে উঠতে পারেনি বলেই?

কথাটা অজুহাতের মতো শোনায়। ঘরের মাঠে চেনা কন্ডিশন ও পিচে প্রতিপক্ষকে ভালোই নাকানি-চুবানি খাওয়াতে পারেন বোলাররা। আরও খোলাসা করে বললে স্পিনাররা। কিন্তু প্রতিপক্ষের মাঠে কী পেসার, কী স্পিনার—সবাইকে ভুগতে হয়। সেশনের পর সেশন বল করে হাত লম্বা করে ফেললেও প্রতিপক্ষকে দুই ইনিংসে অলআউট করার স্বাদ মিলেছে খুব কম।

বিজ্ঞাপন

চলতি শ্রীলঙ্কা সফরের কথাই ধরুন। প্রথম টেস্টে পাল্লেকেলের উইকেট না হয় চূড়ান্তরকম ব্যাটিংবান্ধব ছিল, তাই সেই টেস্ট দিয়ে উদাহরণ চলে না, যেখানে দুই দল মিলে মোট ৪০ উইকেটের মধ্যে মাত্র ১৭ উইকেট ফেলতে পেরেছে। কিন্তু এই যে দ্বিতীয় টেস্ট চলছে, সেখানে এখন পর্যন্ত কী সাফল্য?

প্রথম সেশনে একটা ক্যাচ তোলা গেছে—এই তো! সেটা আবার ফসকেছেও। আর লিখতে হচ্ছে, এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বাংলাদেশ দল এখনো শ্রীলঙ্কার কোনো উইকেট ফেলতে পারেনি। আসলে টেস্টে বোলিংয়ে কন্ডিশন ও পিচের আচরণেও চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বোলারের সামর্থ্য ও বুদ্ধিমত্তা। কোনো সন্দেহ নেই বাংলাদেশের বোলাররা এখানে পিছিয়ে।

default-image

তবে সাকিব আল হাসান থাকলে কিছুটা রক্ষে! বুদ্ধিমত্তা, সামর্থ্য ও বৈচিত্র্যে তিনি-ই বাংলাদেশের সেরা ক্রিকেটার। শ্রীলঙ্কা সফরে এই স্পিন অলরাউন্ডারের না থাকার প্রভাবটা তো সাদা চোখেই বোঝা যাচ্ছে। আরও বেশি করে টের পাওয়া যাবে টেস্টের পরের চার দিনেও।

দ্বিতীয় টেস্টের উইকেট প্রথম টেস্টের মতো নয়। আজ প্রথম দিনে সকালের সেশনে সিম মুভমেন্ট পেয়েছেন পেসাররা। স্পিনারেরা বাঁক না পেলেও স্কিড করেছে কিছু ডেলিভারি। পিচ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেষ তিন দিনে স্পিনাররা সহায়তা পেতে পারেন।

কিন্তু তার আগে তো দুটি দিন কাটাতে হবে, এ সময়ের মধ্যে শ্রীলঙ্কাকে কি প্রথম ইনিংসে অলআউট করা সম্ভব? পরিসংখ্যান-পোকারা বলতে পারেন, সাকিব থাকলে হয়তো সম্ভব ছিল।

পরিসংখ্যানের হোসেন দেওয়ার আগে মাঠের খেলা নিয়েও যুক্তি দেওয়া যায়। সকাল থেকে মেহেদী হাসান মেরাজ ও তাইজুল ইসলাম ভালো জায়গায় বল করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনো বৈচিত্র্য নেই। সেই একই ফ্লাইট ও একই জায়গায় বল ফেলার প্রবণতা—ওদিকে দুই লঙ্কান ওপেনার উইকেটে ‘সেট’।

দুই স্পিনারের বল কোথায় পড়ে কোথায় আসবে, সেটা চোখ বুঁজে খেললেও তাদের কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সাকিব এ জায়গাটায় আলাদা। আর্মার, ফ্লাইটে (বল ঝুলিয়ে ছাড়া) বৈচিত্র্য এবং ব্যাটসম্যানের দুর্বলতা বুঝে বল করার সামর্থ্যের জন্যই তিনি আলাদা।

default-image

এর সঙ্গে যোগ করুন ঠিক জায়গায় ফিল্ডার রাখার দক্ষতা, যেটা ভালো বোলারদের রপ্ত করাটা সহজাত। সম্ভবত এসব দক্ষতার অনুপস্থিতির জন্যই ঘরের বাইরে সাকিব ছাড়া বাংলাদেশ দল কখনো প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট নিতে পারেনি।

পরিসংখ্যানটি নির্মম হলেও সত্য। সাকিবকে (তাঁর অভিষেকের পর) ছাড়া ঘরের বাইরে কোনো টেস্টে প্রতিপক্ষের দুই ইনিংস মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৪ উইকেট ফেলতে পেরেছে বাংলাদেশ। সেটি ২০১৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেন্ট লুসিয়া টেস্টে।

বিজ্ঞাপন

শ্রীলঙ্কার মাটিতে সাকিব ছাড়া কোনো টেস্টে প্রতিপক্ষের সর্বোচ্চ ১৩ উইকেট নিতে পেরেছে বাংলাদেশ ২০১৩ সালে কলম্বো টেস্টে। আর আজ যে দ্বিতীয় টেস্ট চলছে, তার ভেন্যু পাল্লেকেলেতে?

সেটি হয়ে গেছে চলতি সিরিজের প্রথম টেস্টেই—দৃষ্টিকটুরকম ব্যাটিংবান্ধব উইকেটে ৮ উইকেট নিতে পেরেছিলেন বাংলাদেশের বোলাররা। আরও নির্মম বিষয় হলো, টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত শুধু সাকিবকে সঙ্গে নিয়েই ঘরের বাইরে প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট ফেলতে পেরেছে বাংলাদেশ। সাকিবের অভিষেকের আগে প্রতিপক্ষের মাঠে সর্বোচ্চ ১৯ উইকেট নিতে পেরেছে বাংলাদেশ, ২০০৩ সালে মুলতানে পাকিস্তানের বিপক্ষে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, সাকিবকে নিয়েই প্রতিপক্ষের মাঠে এমন আহামরি কি বল করেছে বাংলাদেশ? অন্তত সাকিবের অনুপস্থিতিতে যে দশা হয়, তার চেয়ে ভালো বলা যায়। ঘরের বাইরে সাকিবকে নিয়ে এ পর্যন্ত পাঁচবার প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট (দুই ইনিংসেই অলআউট করা) নিতে পেরেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে হেরেছে শুধু এক টেস্ট, বাকি চার টেস্টেই মিলেছে জয়ের দেখা। হ্যাঁ, ম্যাকগ্রার কথারই প্রতিফলন!

তিনবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং একবার করে শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ে—সাকিবকে নিয়ে এই তিন দলের বিপক্ষে পাঁচবার ২০টি করে উইকেট নিতে পেরেছে বাংলাদেশ। ২০০৯ সালের সেই ঐতিহাসিক ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে এমন দেখা গেছে দুবার।

এরপর ২০১৩ সালে হারারেতে জিম্বাবুয়ে, ২০১৭ সালে কলম্বোয় শ্রীলঙ্কা এবং পরের বছর কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দুই ইনিংসেই অলআউট করেছে বাংলাদেশ। এই পাঁচ দফায় প্রতিপক্ষকে অলআউট করতে সাকিবের অবদান চোখে পড়ার মতো।

২০১৮ সালে কিংস্টন টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই ইনিংস মিলিয়ে ৬ উইকেট নেন সাকিব। এর মধ্যে শুধু দ্বিতীয় ইনিংসেই নিয়েছিলেন ৬ উইকেট। তার আগের বছর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও ৬ উইকেট, এর মধ্যে দ্বিতীয় ইনিংসে নেন ৪ উইকেট।

হারারেতে জিম্বাবুয়ের দুই ইনিংস মিলিয়ে পেয়েছেন ৪ উইকেট। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেই দুই টেস্ট মিলিয়ে নিয়েছিলেন ১৩ উইকেট। এর মধ্যে ইনিংসে ৫ উইকেটও রয়েছে।

পাল্লেকেলেতে দ্বিতীয় টেস্টে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ দল যেভাবে বল করছে তাতে শ্রীলঙ্কাকে অলআউট করার সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে সামান্যই। ব্যাটসম্যানেরা ভুল না করলে বোলাররা নিজেদের সামর্থ্যের ঝুলি থেকে সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছেন না।

চা বিরতির আগ পর্যন্ত বিনা উইকেটে ১৮৮ রান তুলেছে শ্রীলঙ্কা। সেঞ্চুরি পেয়েছেন করুনারত্নে (১০৬)। ৮০ রানে অন্য প্রান্তে অপরাজিত লাহিরু থিরিমান্নে। উইকেটে দুজনের জমে যাওয়া দেখে সাকিবকে মনে পড়াই স্বাভাবিক।

default-image

সাকিবেরও নিশ্চয়ই এখন বাংলাদেশকে মনে পড়ছে! বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিতে তিনি এখন ব্যস্ত আইপিএলে। ব্যস্ত—বলাটা ভুল হলো। কলকাতা নাইট রাইডার্সের একাদশে নিয়মিত হতে পারেননি সাকিব। আপাতত বসে থাকতে হচ্ছে বেঞ্চে। যে কোনো ক্রিকেটারেরই বেঞ্চি গরম করাটা অপছন্দের। সবাই খেলতে চায়।

সাকিব কি ভাবছেন, এই টেস্ট সিরিজ খেললেই বরং মাঠে বেশি সময় থাকতে পারতেন? কে জানে, তবে বাংলাদেশ যে সাকিবের অভাব টের পাচ্ছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন