সেই তাসকিন, এই তাসকিন...মাঝে ৮ বছর আর ৪৬ ম্যাচের অপেক্ষা

ওয়ানডে ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বার পাঁচ উইকেটের দেখা পেলেন তাসকিনছবি: এএফপি

হয়তো তাঁর উন্নতির প্রমাণ রাখতেই এমন সময়ে তাসকিন আহমেদের পাঁচ উইকেট পাওয়ার দরকার ছিল।

তাঁর বোলিংয়ে একটু-আধটু উন্নতি দেখা যাচ্ছে তো বছরখানেক ধরেই। অভিষেকে প্রতিভার ঝলক দেখানো তাসকিন আহমেদ কি অবশেষে তাঁর প্রতিভার ছাপ পারফরম্যান্সে ফেলতে পারছেন কি না, এ আলোচনাও তাই অনেকটা নিয়মিত। আলোচনায় জোর বাড়াতে তাসকিন আহমেদ এমন কিছু করলেন যা তিনি এর আগে শুধু করেছিলেন ২০১৪ সালে ওয়ানডে অভিষেকের ম্যাচটিতেই—ইনিংসে পাঁচ উইকেট প্রাপ্তি! মাঝে কেটে গেছে ৮ বছর আর ৪৬ ম্যাচ।

দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথম ম্যাচ জয়ের সিরিজে সেখানে বাংলাদেশের প্রথম সিরিজ জয়ের সম্ভাবনা যে আজ তৃতীয় ম্যাচের অর্ধেক শেষে জ্বলজ্বলে, সে তো তাসকিনের অসাধারণ বোলিংয়ের কারণেই। ৯ ওভারে ৩৫ রানে ৫ উইকেট তাঁর, তাতে দক্ষিণ আফ্রিকা ৩৭ ওভারেই অলআউট ১৫৪ রানে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডেতে দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বনিম্ন স্কোর।

তাসকিনের কীর্তিটা কত বড়, সেটির একটা বড় প্রমাণ হতে পারে এটি যে, দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ওয়ানডেতে কোনো পেসারের সর্বশেষ পাঁচ উইকেট পাওয়ার কীর্তিটা এক-দুই নয়, পুরো দশ বছর আগের গল্প! ২০১২ সালের জানুয়ারিতে লাসিথ মালিঙ্গার পর প্রতিপক্ষ কোনো পেসারকে এত দাপট দেখাতে দেখল নিজেদের মাটিতে নিজেরাই দাপট দেখাতে অভ্যস্ত প্রোটিয়ারা।

সেঞ্চুরিয়নে প্রথম ওয়ানডেতে তিনি ম্যাচ সেরার স্বীকৃতি পাননি, সেটি সাকিব আল হাসানের পাওনাই ছিল। কিন্তু সেদিন বাংলাদেশ একটা দল হয়ে খেলে জেতার একটা বড় প্রমাণ হয়তো এটিই ছিল যে সেদিনের এক ম্যাচে বাংলাদেশের ‘মেন অব দ্য ম্যাচ’ ছিলেন অনেকে। সাকিব, মিরাজ...তাসকিনও। মাঝে সেঞ্চুরিয়ন থেকে জোহানেসবার্গে দ্বিতীয় ওয়ানডেটা বাংলাদেশের জন্য ভুলে যাওয়ার মতো কেটেছে। তাসকিনের জন্যও।

জোহানেসবার্গ ঘুরে সেঞ্চুরিয়নে ফিরেছে সিরিজ। বাংলাদেশ ফিরেছে প্রথম ম্যাচের ছন্দে, আরও ভয়ংকর হয়েই। সেটি প্রথম ম্যাচের চেয়ে ভয়ংকর তাসকিনের সৌজন্যেই।

ডি কককে আজ দারুণ কৌশলে ফিরিয়েছে বাংলাদেশ
ছবি: এএফপি

দ্বিতীয় ম্যাচে ঝড় তোলা কুইন্টন ডি কককে আগে ফেরানো কতটা দরকার ছিল, সেটি দ্বিতীয় ম্যাচের গা কাঁপানো স্মৃতিই বুঝিয়ে দেবে। বাংলাদেশ আজ দারুণ পরিকল্পনায়ই ঝড় তোলার আগেই ফিরিয়েছে ডি কককে। বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ক্রিজে থাকলেই অফস্পিনারকে আক্রমণে আনার ‘টোটকা’ আজ আবার অব্যর্থ প্রমাণিত। পাশাপাশি বাংলাদেশ ডি কককে স্ট্রাইক না দিয়ে ভুগিয়েছে। স্ট্রাইকই না পেলে ঝড় তুলবেন কীভাবে!

প্রথম দুই ওভারে কোনো বল খেলতে পারেননি ডি কক, প্রথম চার ওভার শেষে তাঁর ইনিংস হলো মাত্র চার বলের। স্ট্রাইক না দেওয়ার পরিকল্পনাটা কেমন ছিল তা সম্ভবত এখানেই স্পষ্ট যে, সপ্তম ওভারের পঞ্চম বলে মিরাজের স্পিনে মাহমুদউল্লাহর হাতে ক্যাচ দিয়ে ডি কক যখন ফিরছেন, তাঁর নামের পাশে ৮ বলে ১২ রান। অন্য প্রান্তে ইয়ানেমান মালানের রান ততক্ষণেই ৩৩ বলে ২৯। মালানও কম যাননি, কিন্তু বাংলাদেশ সম্ভবত তাতে গা করেনি। মালান তো আর ডি কক নন!

এরপর? তাসকিন শো!

ডি ককের বিদায়ের অপেক্ষায়ই বুঝি ছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক তামিম ইকবাল, ডি কক ফিরতেই বোলিংয়ে তাসকিন। প্রথম দুই ওভারে ৫ রান দিলেন। কিপ্টে বোলিংই, কিন্তু বাংলাদেশের তো দরকার উইকেট। হলো প্রান্ত বদল। মাঝে সাকিবকে বোলিংয়ে এনে তাসকিনকে অন্য প্রান্ত থেকে নিয়ে এলেন তামিম। প্রথম বলে ভেরেইনার চারে যদি মনে হয়ে থাকে ‘কী দরকার ছিল প্রান্ত বদলের’, দুই বলই পরই দরকারটা চোখে পড়ল। দরকারটা যে ছিল উইকেটের।

অনেকটা ভাগ্যের জোরেই পাওয়া, তাসকিনের শর্ট লেংথের বলটা অফ স্টাম্পের বাইরেই ছিল। কিন্তু মারতে গিয়ে টাইমিংয়ে গড়বড় করে ফেললেন ভেরেইনা, বল তাঁর ব্যাটের নিচের কানায় লেগে স্টাম্পে! ভাগ্যই সই, ভাগ্যও তো আর সবাইকে সঙ্গ দেয় না।

তাসকিন বাংলাদেশকে উইকেটগুলো এনে দিয়েছেন বড় প্রয়োজনের সময়ে
ছবি: এএফপি

পরের ওভারে আবার তাসকিনের উইকেট, এবার বড় শিকার। ইয়ানেমান মালান। এবার আর ভাগ্য-টাগ্য নয়, বাউন্স আর মুভমেন্টের বদলে উইকেট শিকার। ফুল লেংথে বল করতে করতে হঠাৎ শর্ট লেংথে পঞ্চম স্টাম্পে বলটা ফেললেন তাসকিন, দু পা এগিয়ে খেলতে গেলেন আগের ৫৫ বলে ৩৯ রান করে ফেলা মালান। বল তাঁর ব্যাটের কানায় লেগে উইকেটের পেছনে মুশফিকের গ্লাভসে। একটু আগে ১ উইকেটে ৬৫ রানে বড় স্কোরের দিকে ধীর পায়ে এগোতে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকার ১৫ ওভারের শেষেই ৬৯ রানে ৩ উইকেট নেই।

তাসকিনে শুরু ধংসযজ্ঞে ঘৃতাহুতি সাকিব-শরীফুলের। পরের ওভারে সাকিবের বলে রিভিউ নিয়েও এলবিডব্লু থেকে বাঁচতে পারেননি বাভুমাকে, দুই ওভার বিরতির পর শরীফুলের বাড়তি বাউন্সের শিকার ফন ডার ডুসেন। ১৯ ওভারও শেষ না হতে ৮৩ রানেই ৫ উইকেট নেই দক্ষিণ আফ্রিকার!

আরও পড়ুন

তবু বাংলাদেশের দ্রুতই দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংস মুড়িয়ে দেওয়ার আশায় একটু বাধো বাধো লেগেছে ডোয়াইন প্রিটোরিয়াস আর ডেভিড মিলার ছিলেন বলে। ছয় ওভারের বেশি হয়ে গেল, জুটিটাতে রান হতে হতে ২৪ হয়ে গেল। এই বুঝি দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে দাঁড়াল! শঙ্কাটা শেষ হলো কার বলে? তাসকিন! ২৫তম ওভারে প্রিটোরিয়াসকে ফেরালেন, এরপর ২৯তম ওভারে আবার জোড়া ধাক্কা, চার বলের ব্যবধানে!

প্রথমে ‘কিলার’ মিলারকে উইকেটের পেছনে মুশফিকের ক্যাচ বানালেন। দুই বল পরই তাসকিনের পঞ্চম উইকেট হাতছাড়া হওয়ার আফসোস। দ্বিতীয় স্লিপে ক্যাচ তুলেছিলেন রাবাদা, কিন্তু তাসকিন যে বল করছিলেন প্রথম স্লিপে ফিল্ডার রেখে। কিন্তু আফসোসটা এক বলও স্থায়ী হলো না। আবার বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং তাসকিনের। ফুল লেংথে অফ স্টাম্পের বাইরের বলে নতুন ব্যাটসম্যান রাবাদাকে স্ট্রোকে লোভ জাগালেন, কিন্তু ঝুঁকিতে প্রাপ্তিই হলো। বল ব্যাটের কানায় লেগে মুশফিকের হাতে।

মিলারকেও ফিরিয়েছেন তাসকিন
ছবি: এএফপি

মুশফিক অবশ্য উদ্‌যাপনে হাত ছুঁড়তে গিয়ে ব্যথা পেলেন। তাসকিনের অবশ্য ওদিকে খেয়ালই নেই। দেখেনইনি সম্ভবত। একদিকে মুশফিকের দিকে ছুটে গেছেন কয়েকজন সতীর্থ, অন্যদিকে তাসকিনকে ঘিরে বাকিদের উদ্‌যাপন।

১২৬ রানেই ৮ উইকেট হারানো দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১৫০-এর ভেতরে আটকাতে পারেনি বাংলাদেশ, সেটি কেশব মহারাজের ৩৯ বলে ২৮ রানের সৌজন্যেই। তবু ১৫৫ রানের লক্ষ্যটা হয়তো পেরোনো খুব একটা কঠিন হবে না বাংলাদেশের জন্য, হওয়া উচিত নয়।

শেষ পর্যন্ত যদি লক্ষ্যটা পেরিয়েই যায় বাংলাদেশ, যদি সিরিজ জিতেই যায়, এই তিন ম্যাচ বারবার তাসকিনের গল্পই বলবে। তাসকিনের প্রতিভা প্রমাণের গল্প।