বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত অক্টোবর-নভেম্বরে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত সেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শেষ পর্যন্ত হেরে সেমিফাইনালেই বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে যায়। আগে ব্যাটিংয়ে নামা পাকিস্তানের হয়ে ইনিংসে উদ্বোধনে নেমে ৫২ বলে ৬৭ রানের ইনিংস খেলেন রিজওয়ান। অবিশ্বাসের মাত্রা তাতে আরও বেড়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই যে আইসিইউতে ছিলেন রিজওয়ান!

কিন্তু পাকিস্তানের উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানকে আইসিইউতে কেন যেতে হয়েছিল? তখন শোনা গিয়েছিল, বুকে প্রচণ্ড ব্যথা, জ্বর আর কাশি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল রিজওয়ানকে। ভিডিওতে রিজওয়ান স্মৃতিচারণায় বলছিলেন, সেদিন রাতে প্রথমে পিঠের দিকে এবং পরে বুকে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছিল তাঁর। সেটি ডাক্তার সুমরুকে জানাতেই তিনি রিজওয়ানকে ওই অবস্থায়ই দলের হোটেল থেকে বেরিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলেন। কেন? ভিডিওর শেষ দিকে সুমরুর ব্যাখ্যা, ‘আমি ভেবেছিলাম আপনার হয়তো হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে!’

রিজওয়ান সে মুহূর্তের অনুভূতি জানাতে গিয়ে বললেন, ‘আমার নিশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে যখন পৌঁছালাম, আমি নিশ্বাসই নিতে পারছিলাম না। চোখের সামনে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না।’ পরে নার্সের সঙ্গে কথোপকথনের কথা জানাতে গিয়ে রিজওয়ান বললেন, নার্স তাঁকে বলেছেন, হাসপাতালে যেতে আর ২০ মিনিট দেরি হলেই রিজওয়ানের ধমনি ফেটে যেতে পারত!

default-image

সে সময়ের আবছা স্মৃতি থেকে রিজওয়ানের মনে পড়ে, হাসপাতালে যেতে না যেতেই ১২-১৩টি টেস্ট হয়েছিল তাঁর। ‘মনে হচ্ছিল যেন চুল আর নখ ছাড়া সবকিছুরই টেস্ট হয়েছে’—বলছিলেন রিজওয়ান! টেস্টের পর হাসপাতালে তাঁকে কতক্ষণ থাকতে হবে, সে নিয়েও ধোঁয়াশায় ছিলেন রিজওয়ান। দলের ডাক্তার সুমরু তাঁকে প্রথমে বলেছেন রাত শেষেই ছেড়ে দেওয়া হবে তাঁকে, কিন্তু পরের দিন এসে বলেন দুপুর পর্যন্ত থাকতে হবে। আবার হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, হাসপাতালে থাকতে বাধ্য হওয়ার সময়টা দুপুর থেকে সন্ধ্যায় গড়িয়েছে! অর্থাৎ সে সময় রিজওয়ানকে আসলে কেউ কিছু বুঝতে দিচ্ছিলেন না।

শেষে চিকিৎসকেরা রিজওয়ানকে বলেন, একেবারে ম্যাচের দিন হাসপাতাল ছেড়ে মাঠে যেতে পারেন তিনি। কিন্তু রিজওয়ানের এক কথা, ম্যাচের আগেই দলে যোগ দিতে হবে তাঁকে। কেন? রিজওয়ানের ব্যাখ্যাটা ক্রিকেটীয়, ‘আমরা শুরু থেকে সব ম্যাচে একই একাদশ রেখে নামছিলাম। এমন নয় যে আমাদের বদলি খেলোয়াড়েরা ভালো ছিল না। আমার চেয়েও ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। কিন্তু আমরা শুরু থেকেই চেয়েছিলাম একই ছন্দ ধরে রাখতে।’

হাসপাতাল থেকে ফেরার পর ম্যাচের দিন দুপুর ১২টার রোদে ফিটনেস টেস্ট দিতে হয়েছে রিজওয়ানকে। তবে সেটিই তাঁকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে বলে জানালেন রিজওয়ান। ফিটনেস টেস্টের আগপর্যন্ত তাঁর নিজেরও কিছুটা সংশয় ছিল, ম্যাচে দৌড়ানোর মতো ফিটনেস তাঁর থাকবে কি না। কিন্তু ফিটনেস টেস্টে দুপুর ১২টার রোদে প্রায় দেড় কিলোমিটার দৌড়ানোই তাঁকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে, ম্যাচে তিনি দৌড়াতে পারবেন।

অন্যদিকে ডাক্তার সুমরু বলছিলেন, ‘আপনি যখন আমাকে আপনার অবস্থা বলছিলেন, আমি ভেবেছিলাম আপনার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। আপনার হাতে অক্সিমিটার লাগিয়ে অক্সিজেন স্যাচুরেশন দেখছিলাম। সে সময় আপনার অক্সিজেনের মাত্রা কত ছিল জানেন? সাধারণত একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অক্সিজেনের মাত্রা ৯২ থেকে ৯৮-এর মধ্যে হয়, আপনার ছিল ৭০!’

রিজওয়ানকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরও কিছু জটিলতায় পড়েছিলেন বলে জানালেন ডাক্তার সুমরু। সে সময়ে হাসপাতালে কোনো সিনিয়র ডাক্তার ছিলেন না বলে হাসপাতাল থেকে রিজওয়ানকে অন্য কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ডাক্তার সুমরু তখন রিজওয়ানের অসুস্থতাকে ‘ভীষণ গুরুতর’ জানিয়ে বলেন, অন্য কোনো ডাক্তার না থাকলে তিনি নিজেই রিজওয়ানের সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাবেন।

রিজওয়ানের ১২-১৩টি নয়, মোট ২০টি টেস্ট করানো হয় বলে জানান ডাক্তার সুমরু। এর মধ্যে হার্ট, লিভার, কিডনি, ফুসফুস...সব ধরনের টেস্টই ছিল। ধরা পড়ে, তাঁর শ্বাসনালি ও খাদ্যনালি ফুলে গিয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে খেলেছেন রিজওয়ান। ব্যাট হাতে দারুণ অর্ধশতকও হাঁকিয়েছেন, যা ম্যাচের সর্বোচ্চ ইনিংস। শেষ পর্যন্ত ম্যাথু ওয়েডের ১৭ বলে ৪১ রানের অবিশ্বাস্য ক্যামিওতে অস্ট্রেলিয়া ৫ উইকেটে ম্যাচটা জিতে না গেলে রিজওয়ানের গল্পটা আরও পূর্ণ হতো।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন