default-image

‘সৌম্যকে দিয়ে শুরু, সৈকতকে (মোসাদ্দেক) দিয়ে শেষ। এই প্রজন্ম বুঝিয়ে দিল তারাও দায়িত্ব নিতে জানে’—কাল জয়ের পর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন সাকিব-মুশফিকদের শৈশবের গুরু নাজমুল আবেদীন।

মাঝে তরুণ ক্রিকেটারদের নিয়ে অনেক কথাই হয়েছে। সিনিয়রদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছেন না, নিজেদের প্রতিভার সুবিচার করছেন না। এই ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশ দলের তরুণ ক্রিকেটাররা অন্তত জানিয়ে দিয়েছেন—তাঁরাও দায়িত্ব নিতে জানেন।

মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ—বাংলাদেশ ক্রিকেটের পাঁচ ‘প্রাণভোমরা’। অনেকে ভালোবেসে ডাকেন ‘পঞ্চপাণ্ডব’। তাঁরা একসঙ্গে খেলা শুরুর পর থেকেই দৃশ্যটা প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের কোনো ম্যাচ জয়ে তাঁদের কারও না কারও সিংহভাগ অবদান আছেই। মাঝেমধ্যে তা এতই নিয়মিত হয়ে উঠেছে যে ব্যর্থ হলেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে দলের অপেক্ষাকৃত তরুণ ক্রিকেটারদের।

এবার ত্রিদেশীয় সিরিজে কিছুটা হলেও এ দৃশ্য যে পাল্টাল, দ্বিমত করার সুযোগ নেই। এই ত্রিদেশীয় সিরিজে যে চারটি ম্যাচ বাংলাদেশ জিতেছে প্রতিটিতেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তরুণেরা। যে তিনটা ম্যাচসেরার পুরস্কার বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের হাতে উঠেছে, তিনটিই পেয়েছেন তরুণ ক্রিকেটাররা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে অসাধারণ বোলিংয়ে ম্যান অব দ্য ম্যাচ মোস্তাফিজুর রহমান, আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের নায়ক আবু জায়েদ। আর কাল ফাইনালে ম্যাচসেরা মোসাদ্দেক।

এখানে মোসাদ্দেকের কথাই আগে বলতে হবে। ফাইনাল মানে আলাদা একটা চাপ। সঙ্গে যোগ করুন বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচ। যেখানে অনেকক্ষণের বিরতিতে মনঃসংযোগ নষ্ট হতে পারে, টান টান পেশি হয়ে পড়ে শিথিল। আর স্কোরকার্ডে লক্ষ্যটাও ছিল বেশ কঠিন। ২৪ ওভারে ২১০ রান। ওভারপ্রতি ৮.৭৫ রান করে তোলার চ্যালেঞ্জ। মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরা এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার ভালোই চেষ্টা করেছেন। ভীষণ প্রয়োজনের মুহূর্তে মুশফিকের ২২ বলে ৩৬ আর শেষ দিকে মাহমুদউল্লাহর অপরাজিত ২১ বলে ১৯ পথ দেখিয়েছে বাংলাদেশকে।

তবে এই বন্ধুর পথের যত ‘কাঁটা’ সব সরিয়েছেন দুই তরুণ। কাঁটা মানে ক্যারিবীয় পেস অ্যাটাক সামলে প্রয়োজনীয় রানরেটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাট করা, আর চাপের মুহূর্তে মাথা ঠান্ডা রেখে রান বের করা। যে দুই তরুণ অসমসাহসিকতা দেখিয়ে এ কাজ করলেন, তাঁদের নিয়ে অতীতে কম সমালোচনা হয়নি। কখনো তাঁদের ধারাবাহিক ব্যর্থতার জন্য আবার কখনো হয়তো গোটা দল বাজে পারফর্ম করায় হতে হয়েছে ‘বলির পাঁঠা’। ক্রিকেটে একটা কথা প্রচলিত, একটা ইনিংস পাল্টে দিতে পারে ক্যারিয়ারের মোড়, ঘুরিয়ে দিতে পারে সমালোচকদের মন। সৌম্য ও মোসাদ্দেক কাল যে দুটি ইনিংস খেলেছেন, তাতে কিছুদিনের জন্য হলেও সমালোচকদের মন ঘুরে যাওয়ার কথা। ওয়ানডে টুর্নামেন্টের প্রথম শিরোপাজয়ের উল্লাসে তাঁরাও বলতে পারেন, বিশ্বকাপের আগে ওই তো নতুনের কেতন ওড়ে!

নতুন বলতে আনকোরা নতুন নয়। কিন্তু পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটারের অভিজ্ঞতার তুলনায় নতুনই তো? এবার বিশ্বকাপের আগে একটা কথা চাউর হয়েছে, ইংল্যান্ডে (বিশ্বকাপ) ভালো করতে তরুণদেরও ধারাবাহিক অবদান রাখতে হবে। পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটারের ওপর আর কত? আর কী বিপদ দেখুন, কাল ফাইনালে সাকিবও ছিলেন না। বল হাতে সিনিয়রদের মধ্যে অধিনায়ক মাশরাফি যতটা পেরেছেন কৃপণ হওয়ার চেষ্টা করেছেন। ব্যাটিংয়েও সাকিবের অনুপস্থিতিতে দুশ্চিন্তা কম ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের ইনিংসে তাকালে কী দেখা যায়? মাঝে ছোট্ট এক ফালি মড়ক ছাড়া দুর্দান্ত শুরুটা করেছিলেন এক তরুণ—সৌম্য, আর শেষটাও হয়েছে আরেক তরুণ—মোসাদ্দেকের দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে।

default-image

অনেকে বলতে পারেন, এই তো চাই! পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটারের বয়স হচ্ছে। দলের তরুণদের ধীরে ধীরে দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার এই তো সময়। ওয়ানডে টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের প্রথম শিরোপাজয়ের আখ্যানে কিন্তু লেখা থাকবে সৌম্য দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিলেন। এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান (৩ ম্যাচে ১৯৩) যে তাঁর। আর মোসাদ্দেক? ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর ফিনিশ করার ক্ষমতা নিয়ে চর্চা কম হয়নি। মোসাদ্দেক কাল দেখিয়ে দিয়েছেন, সেই চর্চা কোনো অংশেই ‘ফ্লুক’ নয়, বরং দিনে দিনে হয়ে উঠতে পারেন আরও ধারালো।

তামিমের কাঁধে যত দূর সম্ভব ইনিংস টেনে নেওয়ার দায়িত্ব। ওদিকে কাঙ্ক্ষিত রানরেট আটের ওপরে হওয়ায় চড়াও হতে হতো সৌম্যকে। তামিম যখন ১০ বলে ১০ সৌম্য তখন ২০ বলে ৩৯। এরপর দুটি চার মেরে আউট হলেন তামিম। ওই ওভারে ফিরলেন সাব্বির রহমানও। কিন্তু সৌম্য আক্রমণ থামাননি। জয়টাই যেহেতু লক্ষ্য তাই যা–ই ঘটুক না কেন, রানের চাকা যতটা সম্ভব সচল রাখতেই হতো। ৩ ছক্কা ও ৯ চারে ঠিক পথেই রেখেছিলেন দলকে। যখন ফিরলেন জয় থেকে বাংলাদেশ ৭৫ বলে ১০১ রানের দূরত্বে।

এরপর তিন ওভারের ব্যবধানে মুশফিক-মিঠুন ফিরলে সেই পুরোনো ভয়টা জেগে উঠেছিল। এবারও স্বপ্নভঙ্গ! লক্ষ্যটা ২৪ বলে ৩৯ রানে নেমে আসার পরও দ্বিধায় ভুগেছেন অনেকে। কারণ এসব জায়গা থেকে বাংলাদেশের হারের নজির কম নেই। প্রায় প্রতিষ্ঠিত হতে থাকা এই দুশ্চিন্তাটুকুই কাল ঘুরিয়ে দিয়েছেন মোসাদ্দেক। ২১তম ওভারে মোসাদ্দেক ব্যাকফুটে দাঁড়িয়ে কেমার রোচকে যে ছক্কাটা মারলেন, তাতে সম্ভাব্য ফাঁদে পা দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না ক্যারিবীয় অধিনায়ক জ্যাসন হোল্ডারের। পেস অ্যাটাকে রান আরও বেশি যেতে পারে সম্ভবত এ ভাবনাতেই পরের ওভারে বাঁ হাতি স্পিনার ফাবিয়েন অ্যালেনের হাতে বল তুলে দিয়েছিলেন হোল্ডার। বাকিটা ইতিহাস।

ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রচলিত কথা, মোসাদ্দেক স্পিনে বেশি ভালো। পায়ের সঙ্গে মস্তিষ্কও খুব ভালো ব্যবহার করতে পারেন। ২২তম ওভারে সেটাই দেখা গেল। ১৮ বলে ২৭ রানে সমীকরণে ছিল বাংলাদেশ। অ্যালেনের প্রথম বলেই মারলেন সুইচ হিটে ছক্কা—দুর্দান্ত ফিনিশাররা ম্যাচের এ পর্যায়ে যেমন হয়ে থাকেন আরকি। পরের বলে পায়ের ব্যবহারে লং অফ দিয়ে আরেকটি ছক্কা। আর তৃতীয় বলে তাঁর লেট কাটে চার ও চতুর্থ বলে ইনসাইড আউটে ছক্কা মারা ছিল পরিণত মস্তিষ্কের প্রতিচ্ছবি। ওই ওভারে একাই ২৫ তুলে মোসাদ্দেক যেন বুঝিয়ে দিলেন, বিশ্বকাপে এমন আরও হবে!

তেমনটি হলেই ভালো। তামিম ইকবাল একবার বলেছিলেন, ‘আমরা (পাঁচ সিনিয়র) যখন খেলা ছাড়ব পরবর্তী প্রজন্মও যেন একই ধারার পারফরম্যান্স করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এই ধারা শুধু পারফরম্যান্স দিয়েই বজায় রাখা সম্ভব।’ ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ সাফল্য পেয়েছিল সিনিয়র-তরুণদের দুর্দান্ত রসায়নে। এই ত্রিদেশীয় সিরিজেও দেখা গেল, সিনিয়রদের সঙ্গে তরুণেরা জ্বলে উঠলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন