১৯ বছর আগে ধর্মঘট দেখেছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট

বিজ্ঞাপন
default-image

দেশের ক্রিকেটে যেভাবে চলছে, তা নিয়ে অসন্তুষ্ট ক্রিকেটাররা। সেটা যে কত তীব্র আকার ধারণ করেছে, সেটা বোঝা গেল আজ। আনুষ্ঠানিকভাবে ১১ দফা দাবি জানিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাকিব-তামিম-মুশফিকেরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের ক্রিকেট-কার্যক্রম বন্ধই ঘোষণা করেছেন তাঁরা। অন্যভাবে বলতে গেলে ধর্মঘটে গেছেন বাংলাদেশের পেশাদার ক্রিকেটাররা।

আজ যে ১১ দফা দাবি জানিয়েছেন ক্রিকেটাররা, তার প্রতিটিই যুক্তিযুক্ত। বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে যত সমস্যার কথা বহুদিন, বহু বছর ধরে আলোচনা হয়, প্রায় সবই এতে স্থান পেয়েছে। উন্নত অনুশীলন ব্যবস্থা, স্থানীয় ক্রিকেটার ও কোচদের মূল্যায়ন, মাঠকর্মীদের বেতন–ভাতা বৃদ্ধি, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের উন্নতির সব ধরনের উদ্যোগ স্থান পেয়েছে সেখানে। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ধর্মঘটে যাওয়ার মতো ঘটনা কিন্তু একেবারে বিরল নয়।

নিকট অতীতে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় ক্রিকেটারদের সর্বশেষ এভাবে জড়ো হওয়ার ঘটনা ৬ বছর পুরোনো। ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল বিসিবি কার্যালয়ের সামনে ৬০ জনের মতো ক্রিকেটার হাজির হয়েছিলেন। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ দ্রুত শুরু করার দাবি জানিয়ে অবস্থান কর্মসূচি করেছিলেন জাতীয় দলের বাইরে থাকা ক্রিকেটাররা। সে আন্দোলন বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসানের দেওয়া প্রতিশ্রুতির মুখে আর খুব বেশি এগোয়নি। ক্রিকেটীয় কার্যক্রম থামিয়ে দেওয়া আন্দোলনের হদিস নিতে চাইলে যেতে হবে আরও এক যুগ পেছনে। বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার বছর, অর্থাৎ আজ থেকে ১৯ বছর আগে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের পথযাত্রায় বড় ভূমিকা রাখা এমসিসি সর্বশেষ সফরে এসেছিল ২০০০ সালে। সফরের একমাত্র চার দিনের ম্যাচটি শুরু হয়েছিল ১৮ জানুয়ারি। সেটি বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পাঁচ মাস আগে (২০০০ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পায় আনুষ্ঠানিকভাবে, প্রথম টেস্ট খেলে সে বছরেরই ১০ নভেম্বর) এমসিসির সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয় দলের খেলার কথা ছিল। কিন্তু এমসিসি অধিনায়ক মিনাল প্যাটেলের সঙ্গে সেদিন টস করতে নামা খেলোয়াড়টিকে বাংলাদেশের কোনো সাধারণ দর্শক চিনতে পারেননি। চেনাটা কঠিনই ছিল। প্রথম বিভাগের উত্তরা স্পোর্টিং দলের অধিনায়ক মাহফুজুর রহমানকে সেদিন নামতে হয়েছিল টস করতে। কারণ জাতীয় দল তো বটেই, একজন বাদে প্রিমিয়ার লিগের কোনো ক্রিকেটারকেই সে ম্যাচের জন্য পাওয়া যায়নি। সে দলকে তাই বাংলাদেশ বা বোর্ড একাদশ বলেও নামানোর সাহস দেখায়নি বিসিবি। ঢাকা মেট্রো নামে এক দল খেলেছিল রায়ান সাইডবটমদের বিপক্ষে। নিজেদের দাবি আদায়ে আন্দোলনরত ক্রিকেটাররা সেদিন গ্যালারিতে বসে খেলা দেখেছিলেন।

default-image

খেলোয়াড় আন্দোলনের কথা উঠলেই ২০০০ সালের জানুয়ারির সে ম্যাচের কথা স্মৃতিতে ভেসে ওঠে। তবে এ আন্দোলনের বীজ পোঁতা হয়েছিল দুই মাস আগেই। ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে প্রথম খেলোয়াড়দের অসন্তোষের কথা প্রকাশ্যে আসে। ১৫ নভেম্বর প্রথমবারের মতো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট শুরু হওয়ার আগেই নিজেদের দাবি জানাতে চেয়েছিলেন ক্রিকেটাররা। তাঁদের আয়ের একমাত্র উৎস ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের দলবদল যেন জাতীয় লিগ শুরু হওয়ার আগেই করা হয়, ৮ নভেম্বর সে দাবি জানিয়েছিলেন ক্রিকেট খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতি। এ দাবিতে পরদিন তারা একটি র‍্যালি করে দাবির কথা বোর্ড অফিসে জানিয়ে এসেছিলেন।

এ পর্যায়ে সিসিডিএমের এক সিদ্ধান্ত আন্দোলনকে তীব্র করে তোলে। দাবি আদায়ের জন্য ক্রিকেটারদের রাস্তায় র‍্যালি করা আর ক্লাব, বোর্ডকে ‘অপমান করা’য় পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ঢাকা মহানগর ক্রিকেট কমিটি বা সিসিডিএম। জাতীয় দলের তারকা আমিনুল ইসলাম, খালেদ মাহমুদ, এনামুল হক ও মোহাম্মদ রফিকের সঙ্গে মিনহাজুল আবেদীন, ফারুক আহমেদ ও মাহবুবুর রহমান সেলিমকে ৫ বছরের জন্য সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিল সিসিডিএম। এ কারণে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের প্রথম রাউন্ডের ম্যাচে খেলেননি দেশ সেরা ক্রিকেটারদের কেউই।

প্রাথমিকভাবে দাবি আদায়ের প্রতিশ্রুতির পর খেলোয়াড়েরা সবাই ফিরেছিলেন জাতীয় লিগে। এবং কোনো ঘটনা ছাড়াই বছর শেষ হয়। নতুন ঝামেলার শুরু ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি। আন্দোলনের সময় সিসিডিএমের সাসপেন্ড করা সাত ক্রিকেটারের দলবদল স্থগিত করা হয়েছিল। ফলে, আবারও খেপে ওঠেন ক্রিকেটাররা। এরই মাঝে সে সময়কার বোর্ড সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরীর পরামর্শে এমসিসির বিপক্ষে প্রথম তিন দিনের ম্যাচে নিয়মিত অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম ও বাঁহাতি স্পিনার এনামুল হককে বাদ দেওয়া হয়েছিল। সে ম্যাচ শেষ হওয়ার পরই বিস্ফোরণ ঘটে। সিরিজের বাকি সময়ের জন্য খেলোয়াড় পেতে সমস্যা হবে ভেবে ৩৯ জন ক্রিকেটারকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সে ডাকে প্রথমে ছয়জন খেলোয়াড় সাড়া দিলেও ম্যাচের আগের দিন তাঁরাও আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন।

এভাবেই এমসিসির মতো এক দলের বিপক্ষে প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগের ক্রিকেটারদের নিয়ে কোনোমতে একটি দল গড়া হয়েছিল। তিন দিনের সেই ম্যাচ ড্র করে বেশ প্রশংসা পেয়েছিল সে দল। কিন্তু এভাবে যে ক্রিকেট চলতে পারে না, সেটা দ্রুতই বুঝেছে বোর্ড। ২৩ জানুয়ারি দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়। খেলোয়াড় ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় সেদিনই। সব দাবি মানা না হলেও কিছু কিছু দাবি আদায়ের ব্যাপারে বোর্ড সভাপতির আশ্বাস পেয়ে ২৭ জানুয়ারি জাতীয় লিগের ম্যাচে ফিরেছিলেন সব ক্রিকেটার। নভেম্বরে দলবদলের দাবিতে আন্দোলনে নামা ক্রিকেটাররা জানুয়ারির শেষভাগে এসে কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা ছাড়াই সেই আন্দোলন বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

সে অর্থে আজকের আগে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় আন্দোলনকে পুরোপুরি সফল বলা যায় না কোনোভাবেই। 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন