শেষ পর্যন্ত সব সমীকরণ পাল্টে দিতে পারবেন ধোনি-ওয়াটসনরা?
শেষ পর্যন্ত সব সমীকরণ পাল্টে দিতে পারবেন ধোনি-ওয়াটসনরা?ছবি: বিসিসিআই

‘ড্যাডস আর্মি।’

দুই বছর নিষেধাজ্ঞার কাটিয়ে ২০১৮ সালে আইপিএলে ফেরার পর মহেন্দ্র সিং ধোনির দলকে এই নামে ডাকা হচ্ছিল। দলটায় ক্রিকেটারদের গড় বয়স ছিল ৩৩-এর ওপর। ২০১৮ সালে আইপিএলের বড় নিলাম থেকে ইচ্ছে করেই চেন্নাই দল সাজায় চেনা মুখদের দিয়ে। শেন ওয়াটসন, ফাফ ডু প্লেসি, ইমরান তাহির, সুরেশ রায়না, আম্বাতি রাইডু, হরভজন সিংরা কতটা কী করতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় ছিলই।

এঁদের নিয়ে গড়া চেন্নাইকে বিশেষজ্ঞরা আইপিএলের শেষ চারেও দেখছিলেন না। ‘টি-টোয়েন্টি তরুণদের খেলা’—এই স্লোগান শোনা যাচ্ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই ড্যাড’স  আর্মিই হয়েছে ২০১৮ আইপিএল চ্যাম্পিয়ন। অথচ ক্রিকেটের যুক্তিতে সেটা হওয়ার কথা ছিল না। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বদলে গেছে আইপিএলের ১০ বছরে। বিশেষজ্ঞে ভরা ক্রিকেটার নিয়ে একাদশ সাজায় প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি। ব্যাটসম্যানদের স্ট্রাইক রেট লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। পেসাররা গতির ঝড়ের পাশাপাশি কাটার-স্লোয়ার শিখছেন। স্পিনাররা আরও বৈচিত্র্যময় হচ্ছেন। ফিল্ডিং দিয়ে টি-টোয়েন্টি ম্যাচের জেতা-হারা নিশ্চিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
default-image

এসবের কিছুতেই ধোনির দল এগিয়ে ছিল না। উল্টো অনেকক্ষেত্রে ছিল পিছিয়ে। তবু সব যুক্তি হার মেনেছে ধোনি ও স্টিভেন ফ্লেমিংয়ের বুদ্ধির কাছে। চেন্নাই ঘরের মাঠে দাপট দেখিয়ে প্লে অফ নিশ্চিত করে। এরপর খেলাটা অভিজ্ঞতার। প্লে-অফের বড় ম্যাচে ওই বুড়োরাই চেন্নাইকে জিতিয়েছেন শিরোপা। আর শেন ওয়াটসন ছিলেন ফাইনালের জয়ের নায়ক।

অভিজ্ঞতার মূল্য কতটা, সেটা দেখা গেছে সেই ফাইনালেই। সানরাইজার্স হায়দরাবাদ ছিল চেন্নাইয়ের ২০১৮ আইপিএল ফাইনালের প্রতিপক্ষ। লেগ স্পিনার রশিদ খান সেই আইপিএলে ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। ফাইনালেও নিজের ইনিংসের শুরুতে রশিদকে খেলতেই পারছিলেন না ওয়াটসন। তবে অভিজ্ঞ ওয়াটসন চাপে ভাঙেননি। রশিদকে শুরুতে সম্মান দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরি করে চেন্নাইকে শিরোপা জিতিয়েছেন।

সেই ম্যাচে হায়দরাবাদের কোচ ছিলেন টম মুডি। দুই বছর পর অভিজ্ঞতার গুরুত্ব বোঝাতে সেই ফাইনালের উদাহরণ টেনে মুডি বলছিলেন, ‘সেই ম্যাচে ওয়াটসনের জায়গায় তরুণ কোনো ব্যাটসম্যান থাকলে তেড়েফুঁড়ে মেরে আউট হয়ে যেত। ওয়াটসন আগে এমন অবস্থায় বহুবার খেলেছে। সফল হয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে। সে জানত ওই অবস্থায় কী করতে হয়। শেষ পর্যন্ত ওয়াটসনই চেন্নাইকে ফাইনাল জিতিয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

পরের আইপিএলেও ঠিক তা-ই। সেই ওয়াটসন ২০১৯ আইপিএল ফাইনালেও সেঞ্চুরি করে চেন্নাইকে শিরোপা প্রায় জিতিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ওপাশে আরেক অভিজ্ঞ মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের লাসিথ মালিঙ্গার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠেননি ওয়াটসন। প্রচণ্ড চাপের মুখে অভিজ্ঞতাই যে পারফর্ম করে, সেটি দেখা গেছে গত দুই আইপিএলের ফাইনালে।

পরপর দুই বছর আইপিএল ফাইনাল খেলা চেন্নাইয়ের এবারের আইপিএল যাত্রাটা এগোচ্ছে কিছুটা ভিন্ন পথে। গত দুই আইপিএল গ্রুপ পর্বে দাপট দেখালেও এবার চেন্নাই এগোচ্ছে কচ্ছপের গতিতে। ৮ ম্যাচ খেলে ফেলেছে, মাত্র ৩ জয়। দলের চেনা মুখ সুরেশ রায়না না থাকায় এবারের আইপিএলের শুরুতে ব্যাটিং ভুগিয়েছে চেন্নাইকে। সঙ্গে আম্বাতি রাইডুর চোট আরও বড় ধাক্কা হয়ে আসে।

তবে আইপিএলের মাঝপথে এসেই সাধারণত চেন্নাই খুঁজে পায় নিজেদের সেরা ছন্দ। ধোনি ৬-৭ জন বোলার নিয়ে খেলতে পছন্দ করেন। যখন যাঁকে মনে হবে ব্যবহার করা দরকার তাঁকেই বল তুলে দেন। গত দুই আইপিএলে এক ঝাঁক বোলারের দল ছিল চেন্নাই। কিন্তু এবার শুরুতে চেন্নাই ছিল মাত্র পাঁচ বোলারের দল। গত দুই ম্যাচে চেহারা পাল্টেছে। ধোনি খেলছেন এখন ছয় বোলার নিয়ে। ফর্মে ফিরেছেন ওয়াটসন, রাইডুরা। শেষ ম্যাচে চেন্নাইকে জিতিয়েছেন রবিন্দ্র জাদেজা।

বিজ্ঞাপন
default-image

আর ধোনির ফর্মও খারাপ নয়। অন্তত সংখ্যা তা-ই বলে। সাত ইনিংসে ৩৩.২৫ গড়ে ১৩৩ রান করেছেন, স্ট্রাইক রেট ১৩৫। তবে তাঁর ব্যাটিংয়ের ধরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বেশ। দলের প্রয়োজনের মুহুর্তের আগের মতো ফিনিশার ধোনি হয়ে দেখা দিতে পারছেন না। চার-ছক্কা মারছেন ঠিকই, কিন্তু দু-তিনটি ম্যাচে তা মেরেছেন দলের হার প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর। ২০১৯ বিশ্বকাপের পর থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে থাকা, করোনার কারণে অনেকদিনের মরচে পড়ে যাওয়া ৩৯ বছর বয়সী ধোনির ব্যাটেরও চেনা ছন্দে ফেরা জরুরি চেন্নাইয়ের জন্য।

চেন্নাই সবচেয়ে বড় সুবিধাটা পাবে এবারের আইপিএলের উইকেট থেকে। টুর্নামেন্টের শুরুতে উইকেট ছিল ব্যাটিং সহায়ক। তিন ভেন্যু বার বার ব্যবহার হওয়ায় উইকেট হচ্ছে মন্থর। আর উইকেট মন্থর হওয়া মানেই ধোনিদের সোনায় সোহাগা। চেন্নাইয়ের চিদাম্বরম স্টেডিয়ামের উইকেটও সবসময়ই মন্থর। আইপিএলে চেন্নাইয়ের তিনবারের শিরোপা জয়ের মূল কারণ ঘরের মাঠের উইকেট। আরব আমিরাতেও সেই ঘরের মাঠের আমেজ পেতে শুরু করেছে চেন্নাই। সর্বশেষ ম্যাচে সেই সুবিধাটা নিয়ে জিতেছে চেন্নাই। সেজন্যই এখনো চেন্নাইকে শেষ চারের দৌড় থেকে বাদ দেওয়া যায় না।

আর চেন্নাই ভক্তরা হয়তো ২০১০ সালের আইপিএলের কথা মনে করিয়ে দিতে পারেন! ২০১০ সালেও এবারের মতো প্রথম ৮ ম্যাচে ৩ জয় পেয়েছিল চেন্নাই। শেষ পর্যন্ত শিরোপা গিয়েছিল চেন্নাইয়ের ঘরেই। এবার কি হয় সেটাই দেখার অপেক্ষা!

মন্তব্য পড়ুন 0