রাজস্থানের বিপক্ষে কাল ঝলসে উঠেছে গেইলের ব্যাট।
রাজস্থানের বিপক্ষে কাল ঝলসে উঠেছে গেইলের ব্যাট।ছবি: আইপিএল

এক আইপিএলের পর লম্বা বিরতি। এরপর মাঝে কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নেই, তাঁর ক্রিকেটে থাকা বলতেই ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (সিপিএল), দক্ষিণ আফ্রিকার টি-টোয়েন্টি লিগ (এমএসএল) আর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) মিলিয়ে সাকল্যে ২০টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। এরপর খেললেন এবার আরেক আইপিএল। মাঝে কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট না থাকলে বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে ধারবাহিকভাবে পারফরম করে যাওয়া সহজ নয়। কিন্তু কথাটা হয়তো টি-টোয়েন্টির রাজা ক্রিস গেইলের জন্য প্রযোজ্য নয়।

এবারের আইপিএলে গেইল এখন পর্যন্ত ৬ ইনিংস খেলেছেন কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের হয়ে। ছয় ইনিংসেই গেইলের শুরুটা হয়েছে দারুণ। এর মধ্যে তিনটি ইনিংস পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। কাল তো মাত্র এক রানের জন্য সেঞ্চুরি করতে পারেননি। রাজস্থান রয়্যালসের বিপক্ষে গতকালের ৯৯ রানের ইনিংসটি অনেককেই সেরা সময়ের গেইলের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। কে জানে, সেরা সময় হয়তো এখনো ফুরিয়ে যায়নি ৪১ বছর বয়সী গেইলের!

এই বয়সে, ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে আইপিএলের মতো বিশ্বমানের টুর্নামেন্টে টানা ভালো খেলে যাওয়া মুখের কথা নয়। অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, ম্যাথু হেইডেন, রিকি পন্টিং, সনাথ জয়সুরিয়া, শেন ওয়ার্ন, শন পলক, গ্ল্যান ম্যাকগ্রাদের মতো আধুনিক ক্রিকেটের কিংবদন্তিরা এমন বয়সে আলো ছড়াতে পারেননি। আইপিএলের শুরুর দিকে দলগুলো সাজানো হতো এই কিংবদন্তিদের নিয়েই। ততদিনে প্রত্যেকেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছেড়ে দিয়েছিলেন। বছরে ক্রিকেট বলতে খেলতেন শুধু আইপিএলই। এক সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দাপিয়ে বেড়ানো এই তারকাদেরও ধুঁকতে দেখা গেছে আইপিএলের দ্রুত বদলে যাওয়া ক্রিকেটে।

বিজ্ঞাপন

ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, কেভিন পিটারসনদের কথাও বলতে হয়। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে এই দুই তারকা কম দেননি। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষে আইপিএল খেলতে এসে তাঁরাও বুঝতে পেরেছেন আইপিএলের প্রতিযোগিতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়া কতটা কঠিন। শেন ওয়াটসনের কথাই ধরুন। আইপিএল কিংবদন্তিদের ছোট্ট তালিকা করলে ওয়াটসন থাকবেন নিশ্চয়ই। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সে এবারের আইপিএল খেলতে এসে শুরু থেকেই ধুঁকতে হয়েছে তাঁকে।

প্রশ্ন জাগে, গেইল কেন ব্যতিক্রম? বয়স তো তাঁরও হয়েছে। ক্রিকেটীয় যুক্তি বলে, বয়স বাড়লে ক্ষিপ্রতা, চোখ আর হাতের সমন্বয়, শক্তি, ফাস্ট বোলিংয়ে বিপক্ষে খেলার দক্ষতা কমে আসে। এসব বাকিদের মতো গেইলও হারিয়েছেন। তবু বাকিদের মতো রান করা কমছে না গেইলের। উর্বর ক্রিকেট মস্তিস্ক থাকলে যা হয়, গেইলের ক্ষেত্রে ঠিক তাই হচ্ছে। এবারের আইপিএলে গেইল দেখাচ্ছেন তিনি কতটা চালাক ক্রিকেটার।

default-image

গেইল নিজের শক্তির জায়গা সম্পর্কে নিজের কাছে খুবই পরিস্কার। আগের মতো বলে-কয়ে দুনিয়ার সেরা গতির বোলারকে বাউন্ডারি ছাড়া করতে পারেন না। কিন্তু মিডিয়াম পেস ও স্পিন পেলে ছাড় নেই। ব্যাটিংয়ে নেমে তিনি প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণের দুর্বল জায়গাটা চিহ্নিত করেন। ঘাপটি মেরে বসে থাকেন অনভিজ্ঞ তরুণ পেসার কিংবা স্পিনারদের বোলিং আসার অপেক্ষায়। কাগিসো রাবাদা, যশপ্রীত বুমরা, জফরা আর্চার, লকি ফার্গুসনদের মতো ফাস্ট বোলারদের ওভার খেলেন খুব সতর্ক থেকে। স্পিনার কিংবা মিডিয়ার পেসার এলেই হলো, সামনের পা সরিয়ে বিশাল ব্যাট আর গায়ের জোর কাজে লাগিয়ে বল পাঠান বাউন্ডারির বাইরে। একেকটি করে ওভার লক্ষ্য করে তুলে নেন ১৫-২০ রান। পুষিয়ে দেন দলের সেরা বোলারের ওভারে সতর্ক ব্যাটিংয়ের ক্ষতি।

গত পাঁচ-ছয় বছরে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটও বদলে গেছে অনেকটা। আঙ্গুলের স্পিনারদের চাহিদা কমেছে, কব্জির স্পিনারদের চাহিদা বেড়েছে বহুগুণে। ক্রিকেট বদলে যাওয়ায় সুবিধাটা হয়েছে গেইলের। অফ স্পিনাররা ছিলেন গেইলের সবচেয়ে বড় যম। গেইল বাঁহাতি, টার্ন করে বেরিয়ে যাওয়া বল খেলতে একদমই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না এই ক্যারিবিয়ান।

কিন্তু এখন টি-টোয়েন্টি দলগুলোতে একজন লেগ স্পিনার তো থাকবেনই। আর বাঁহাতি গেইলের জন্য লেগ স্পিনারদের বল স্পিন করে আসছে গেইলের শক্তির জায়গায়। সেখান থেকে সুইপ, পুল করে ছক্কা মারা কঠিন কিছু নয় তাঁর জন্যে। এবারের আইপিএলে গেইল ঠিক তা-ই করছেন। কাল ঠিক তা-ই হয়েছে। রাজস্থান যেমন দুই লেগ স্পিনারের দল। মাঝের ওভারে দুই লেগ স্পিনার রাহুল তেওয়াতিয়া ও শ্রেয়াস গোপালের আট ওভার পাচ্ছেন তিনি।

এবারের আইপিএলে আবার তিনে নামছেন গেইল। বেশিরভাগ সময় ক্রিজে আসছেন যখন দলের সেরা বোলাররা প্রথম স্পেল করে গেছেন। স্পিনাররা মাত্রই বোলিংয়ে আসছেন। আর প্রতিপক্ষ দলের স্পিনার ও মিডিয়াম পেসাররা জানেন, গেইলের কামান এখন তাঁদের দিকে। গেইলের নামের এমন চাপের মুখে অনেক বোলারই নিজের পরিকল্পনা থেকে ভুলে এলোমেলো বোলিং করেন। আর গেইল সেই সুবিধাটা দুই হাত ভরে নিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

ক্রিকেটীয় কৌশল তো আছেই। সাবেক আইপিএল কোচ ও বিশ্বকাপজয়ী সাবেক অস্ট্রেলিয়ান টম মুডিকে অবাক করছে গেইলের এখনো ভালো করে যাওয়ার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা। দুই দশক দীর্ঘ ক্যারিয়ারজুড়ে গেইল এক শ-র বেশি টেস্ট খেলেছেন, তিন শ-র বেশি ওয়ানডে খেলেছেন। যে সংস্করণটাকে নিজের করে নিয়েছেন, সেই টি-টোয়েন্টিতে ম্যাচ খেলেছেন চার শ-র বেশি। এত ক্রিকেট খেলার পরও ৪১ বছর বয়সে এসে গেইলের শরীরী ভাষায় এখনো প্রতিপক্ষকে এক চুল ছাড় দেওয়ার চিহ্ন নেই!

মুডি কাল ক্রিকইনফোর আইপিএল ম্যাচ বিশ্লেষণ অনুষ্ঠানে বলছিলেন, ‘আপনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞা দেখতে পাবেন ওর চেহারায়। নিশ্চয়ই কিছু অপ্রাপ্তি কাজ করছে ওর মধ্যে, এই ৪১ বছর বয়সে এসেও। যে পরিমাণ রান ও এই সংস্করণে করেছে, ভুলবেন না সে কিন্তু এক শ টেস্টও খেলেছে। যে পরিমান ক্রিকেট গেইল তাঁর জীবনে খেলেছে, সেটা অবাক করার মতো। এরপরও সে বলে বলে পারফর্ম করছে। এটা অবিশ্বাস্য।’

মুডির প্রশ্নের উত্তর অবশ্য কাল গেইল নিজেই দিয়ে দিয়েছেন। ৯৯ রানের ইনিংস খেলে আউট হওয়ার পর সাবেক নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটার ও জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার ড্যানি মরিসন জিজ্ঞেস করেছিলেন, এখনো কিভাবে এত ভালো খেলা সম্ভব? এত অনুপ্রেরণা কোথায় পান? গেইল স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে উত্তরে বললেন, ‘সত্যি বলতে, এটা পুরোই মানসিকতা। আমি খেলাটাকে কিভাবে দেখছি সেটাই আসল। আমি আগের মতোই খেলা উপভোগ করছি। এখনো ভালো করে যেতে চাই। আমি খুব করে চাই একবার আইপিএল শিরোপা জিততে।’

ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে দুবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছেন গেইল। কিন্তু আইপিএল শিরোপা জেতা হয়নি। কলকাতা নাইট রাইডার্স, রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু হয়ে এখন খেলছেন কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের হয়ে। দীর্ঘ আইপিএল ক্যারিয়ারে গেইলের অপ্রাপ্তি বোধহয় এই একটিই।

মন্তব্য পড়ুন 0