default-image

কিংবদন্তি হতে আমগাছে উঠতে হয়। কিংবা টেবিল টেনিস খেলতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এই ধরুন ছয় ঘণ্টা। নাহ, মোটেও রসিকতা হচ্ছে না। শচীন টেন্ডুলকার হতে চাইলে শৈশবটা এমন রঙিন হতে হয়।

আমগাছে ওঠার অভ্যাসটা ‘বদভ্যাস’-এ রূপ নেওয়ায় বড় ভাই অজিত তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন ক্রিকেট মাঠে। বাকি ইতিহাস টেন্ডুলকার এঁকেছেন উইলোর তুলিতে, ক্রিকেট-বিশ্ব মাথায় করে রেখেছে সেসব ছবি। তেমনই এক ঐতিহাসিক ‘ছবি’র গল্প শুনুন আজ এই বিশেষ দিনে।

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে তখনো ক্রিকেট চলে। ২০০৪ সালে ডিসেম্বরের কনকনে শীতে ভারত এল বাংলাদেশে দুটি টেস্ট ও তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলতে। প্রথম টেস্টে ব্যাট করতে নেমেছিলেন মাথায় চাপ নিয়ে। ‘টেনিস এলবো’ চোট থেকে তখনো পুরোপুরি সেরে ওঠেননি। ভারী ব্যাট ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা ছিল। আগের দশ ইনিংসের মধ্যে দুই অঙ্কে পৌঁছাতে পেরেছিলেন মাত্র তিনবার।

চোট এবং রানখরা মিলিয়ে সেদিন কেউ অন্তত টেন্ডুলকারের কাছ থেকে সেরাটা আশা করেনি। টেস্ট আঙিনায় মাত্র চার বছর বয়সী বাংলাদেশের বোলাররা ছিলেন চনমনে। ৮ ওভারের মধ্যেই ২৪ রানে বীরেন্দর শেবাগ ও রাহুল দ্রাবিড়কে ফেরত পাঠানো গেছে। এই টেন্ডুলকারে ভয় কী!

আমগাছে যাঁদের ওঠার অভ্যাস আছে, মিলটা তাঁরা বুঝতে পারবেন। খসখসে বাকল ধরে ওঠা কিন্তু মোটেও সহজ কাজ নয়। একটু এদিক-সেদিক হলেই পতন। টিকে থাকতে থাকতে উঠতে হয় একটু একটু করে। বিশেষ করে গাছ লম্বা হলে তো কথাই নেই।

টেন্ডুলকারের ধান ভানতে গিয়ে এই আমগাছের গীত টেনে আনায় কারণ হলো ঢাকায় টেন্ডুলকার সেদিন যে ইনিংস খেলেছিলেন, সেটির সঙ্গে তাঁর শৈশবে আমগাছে ওঠার ভালোই মিল আছে। ইনিংসটা গাছে চড়ার মতোই, মোটেও মসৃণ ছিল না। কিন্তু গাছে চড়ার মতোই রেকর্ড গড়ার প্রতিজ্ঞা সেখানেও ছিল।

বাংলাদেশ ১৮৪ রানে অলআউট হওয়ার পর ব্যাটিংয়ে নামে ভারত। দুই উইকেট পড়লেও তাপস বৈশ্যকে ট্রেডমার্ক ড্রাইভে ইনিংসের শুরু করেছিলেন টেন্ডুলকার। এরপর ধীরে ধীরে ইনিংস গড়তে থাকেন।

সেই চিরাচরিত ড্রাইভ, কাট ও গ্যাপ বের করে ব্যাট করছিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা, মুশফিকুর রহমান, মানজারুল ইসলামদের বিপক্ষে। টেস্টের দ্বিতীয় দিনে সেঞ্চুরি তুলে নেওয়ার আগে দুটি পরিষ্কার সুযোগ দিয়েছিলেন। ইনিংসের শুরুর দিকে স্লিপে তাঁর ক্যাচ নিতে পারেননি হাবিবুল বাশার। এরপর ৪৮ রানে থাকার সময় সিলি মিডঅফে তাঁর ক্যাচ ছাড়েন রাজিন সালেহ।

বাংলাদেশের জন্য ক্যাচ ছাড়া তখন ‘রুটিন ওয়ার্ক!’ ২৯ টেস্টে ৫৩ ক্যাচ ছেড়ে ওই টেস্ট খেলতে নেমেছিল হাবিবুল বাশারের দল। এর মধ্যে শেষ ১৫ টেস্টে ফসকেছে ৩৭ ক্যাচ। তবু দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের অনেকে আক্ষেপ করে বলতে পারেন, সেদিন টেন্ডুলকারের দেওয়া সুযোগ দুহাতে গ্রহণ করলে সুনীল গাভাস্কারের ৩৪ টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড ভাঙার সঙ্গে বাংলাদেশের নাম জড়িয়ে থাকত না।

হ্যাঁ, দ্বিতীয় দিনেই সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে গাভাস্কারের রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলেছিলেন টেন্ডুলকার। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ধারাভাষ্যকক্ষে গাভাস্কারও ছিলেন। খেলার এক ফাঁকে মাঠে এসে পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন উত্তরসূরির। দুজনের ৩৪তম টেস্ট সেঞ্চুরিই এসেছে ক্যারিয়ারের ১১৯তম টেস্টে!

বিজ্ঞাপন

গ্রেট ব্যাটসম্যানরা শুধু সেঞ্চুরি করেই থেমে যান না; সেই টেস্টে ভারত মাত্র এক ইনিংস ব্যাট করতে চেয়েছিল। তা সম্ভব হয়েছিল টেন্ডুলকারের ডাবল সেঞ্চুরির জন্য। তৃতীয় দিনে ডাবলের দেখা পেয়ে যান টেন্ডুলকার।

ভারত ৫২৬ রানে অলআউট না হলে কে জানে ‘ট্রিপল’-ও হয়তো হয়ে যেত! অন্য প্রান্তে সবাই আউট হয়ে যাওয়ায় ২৪৮ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়তে হয় টেন্ডুলকারকে। তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ রানের এই ইনিংসের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম জড়িয়ে থাকত না, যদি ক্যাচ না ছাড়া হতো। এক দিন হাতে রেখে ইনিংস ব্যবধানে জিতেছিল ভারত।

সেই টেস্টে আরও একটি মজার ঘটনাও আছে। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য তা বাজে ফিল্ডিংয়ের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা—ভারতের সংগ্রহ তখন ৭ উইকেটে ৩৬৪। টেন্ডুলকার ১৭২ রানে অপরাজিত। তাপস বৈশ্যর বল অনসাইডে প্যাডে খেলে অনিল কুম্বলের সঙ্গে প্রান্ত বদল করেন তিনি। ২ রান নেওয়ার সুযোগ আছে বুঝে টেন্ডুলকার চকিত দৌড়ে ফিরতে চেয়েছিলেন স্ট্রাইকে। কুম্বলেও ওপাশ থেকে দৌড় দেন।

কিন্তু টেন্ডুলকার হুট করে থেমে যাওয়ায় কুম্বলে হতচকিত হয়ে পড়েন, তবে দৌড় না থামিয়ে সোজা চলে আসেন ননস্ট্রাইক প্রান্তে। ওদিকে টেন্ডুলকার নিশ্চিত রানআউট বুঝে স্ট্রাইকের দিকে দৌড়ান। কিন্তু বাংলাদেশের বাজে ফিল্ডিংয়ের চূড়ান্তটুকু দেখা তখনো বাকি ছিল।

ডিপ ফাইন লেগ থেকে আসা থ্রো কিপিং গ্লাভসে নিতে পারেননি খালেদ মাসুদ। কিন্তু স্টাম্প ভেঙে ফেলেন হাত দিয়ে। শতভাগ নিশ্চিত রানআউট থেকে বেঁচে যান টেন্ডুলকার। কিন্তু নাটকের সেখানেই শেষ নয়। টেন্ডুলকার যখন স্ট্রাইকের দিকে দৌড়াচ্ছিলেন কুম্বলে বোধ হয় অনুশোচনাবোধ থেকেই তাঁকে অনুসরণ করলেন!

অর্থাৎ দুই ব্যাটসম্যান এক প্রান্তে। ওদিকে খালেদ মাসুদ স্টাম্প ভেঙে আউট করতে না পারলেও হাল ছাড়েননি। ননস্ট্রাইক প্রান্ত যে তখন খালি! কোনো ব্যাটসম্যান নেই। কুম্বলের আবারও সেদিকে ফিরতি দৌড় শুরু দেখে খালেদ মাসুদ ননস্ট্রাইকে বল থ্রো করেন। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ননস্ট্রাইকে স্টাম্প ভাঙলেও রানআউট করা যায়নি। ধারাভাষ্যকার অ্যালান উইলকিনসের ভাষায়, ‘সার্কাস, নিখাদ সার্কাস!’

default-image

সেই টেন্ডুলকার সাত বছর আগে ক্রিকেট ছাড়ার সময় নিজেকে খেলাটার ইতিহাসে কোথায় রেখে গেছেন, তা সবার জানা। সর্বকালের সেরাদের ছোট্ট ব্র্যাকেটে তাঁর ঠাঁই অবিসংবাদিত। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সর্বোচ্চ রান ও সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়া এই কিংবদন্তির সঙ্গে আজ ‘৪৮’ সংখ্যাটা কীভাবে যেন খাপ খেয়ে যাচ্ছে। সেটি শুধুই আজ তাঁর ৪৮তম জন্মদিন বলে নয়।

১৭ বছর আগের সেই টেস্টে টেন্ডুলকার ৪৮ রানে থাকার সময় রাজিন সালেহর ক্যাচ ছেড়ে দেওয়া, শেষে ২৪৮ রানে তাঁর অপরাজিত থাকা...শুধু কি তাই? আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টেন্ডুলকার যত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলেছেন, তার মধ্যেও আছে এই ‘৪৮’ সংখ্যা—৮৪৮!

শুভ জন্মদিন, শচীন টেন্ডুলকার!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন