আহমেদাবাদে স্পিনের সামনে টিকতে পারেনি ইংল্যান্ড
আহমেদাবাদে স্পিনের সামনে টিকতে পারেনি ইংল্যান্ডছবি: বিসিসিআই

আফগানিস্তান এখন মুখ বাঁকিয়ে বলতে পারে, ‘আমরাই তো ইংল্যান্ডের চেয়ে ভালো ছিলাম! ভালো ছিলাম বাংলাদেশের চেয়েও!’

রোহিত শর্মার বিশাল ছক্কায় আহমেদাবাদে আজ ইংল্যান্ডকে ভারত যখন ১০ উইকেট হারানো নিশ্চিত করল, টেস্টের দ্বিতীয় দিনে তখনো ২৫ ওভারেরও বেশি বাকি। ভারতের মাটিতে এর আগে দুই দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে, এমন টেস্ট ছিল শুধু একটি। তিন বছর আগে বেঙ্গালুরুতে যে টেস্টে আফগানিস্তানকে হারিয়েছে ভারত। সেই হিসাবে আজ ইংল্যান্ডকে ‘আফগানিস্তান’ বানিয়েই হারিয়েছে বিরাট কোহলির দল।

বাংলাদেশ এদিক থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। গত বছর কলকাতায় বাংলাদেশের প্রথম গোলাপি বলের টেস্টকে হতাশার নীল উপাখ্যান বানিয়ে ভারত যখন ম্যাচ জিতছে, তখন তৃতীয় দিন সকালে রোদের তেজ মাত্র গায়ে লাগতে শুরু করেছে। তাহলে আফগানিস্তান ইংল্যান্ড-বাংলাদেশের চেয়ে ভালো হলো কীভাবে?

বিজ্ঞাপন

সে উত্তর খুঁজতে গেলে ইংল্যান্ডের জন্য লজ্জার আরেক রেকর্ডের দেখা মিলবে। আহমেদাবাদে ভারত-ইংল্যান্ড টেস্টের স্থায়িত্ব হলো মাত্র ১৪০.২ ওভার। বলের হিসাবে ৮৪২ বল।

আফগানিস্তানকে হারাতে তিন বছর আগের সেই টেস্টে এর চেয়ে ১৮৬ বল বেশি খেলতে হয়েছিল ভারতকে, সেই টেস্টের স্থায়িত্ব ছিল ১০২৮ বল। কলকাতায় ভারত-বাংলাদেশ টেস্ট ছিল ৯৬৮ বলের।

বলের হিসাবে ভারতের সবচেয়ে ক্ষণস্থায়ী টেস্টে জয় তো বটেই, ক্রিকেট ইতিহাসেই ক্ষণস্থায়িত্বের তালিকায় ৭ নম্বরে জায়গা করে নিল আহমেদাবাদ টেস্ট। টেস্ট ক্রিকেট এর চেয়ে কম বলে ম্যাচের মীমাংসা হতে সর্বশেষ দেখেছে ৮৬ বছর আগে। আর সবচেয়ে কম রানের (মীমাংসা হয়েছে) বিচারে এটি দশম টেস্ট। আহমেদাবাদের আগে ৯টি টেস্টে এর চেয়েও কম রান হয়েছে।

default-image

সেই টেস্টে অবশ্য জয়ী দলের নাম ছিল ইংল্যান্ড। ১৯৩৫ সাল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়েছিল ইংলিশরা। ব্রিজটাউনে সিরিজের প্রথম টেস্ট। মাত্র ১১২ ওভার বা ৬৭২ বল স্থায়ী সেই টেস্টটা অদ্ভুতুড়ে এক টেস্ট–ই ছিল বটে!

ইংল্যান্ড অধিনায়ক বব উইয়াট টস জিতে স্বাগতিকদের ব্যাটিংয়ে পাঠান। শুরুতে কেন ফার্নসের ফাস্ট বোলিং ও পরে জর্জ পেইন ও এরিক হোলিসের স্লো বলে নাকাল ক্যারিবীয়রা।

শুধু ‘কৃষ্ণাঙ্গ ব্র্যাডম্যান’ জর্জ হ্যাডলিই যা প্রতিরোধ গড়েছিলেন, তা-ও ইনিংসে দুবার সুযোগ দিয়ে। ১০২ রানে অলআউট ওয়েস্ট ইন্ডিজ, রানআউট হওয়ার আগে হ্যাডলির রান ৪৪। বাকি কেউ দুই অঙ্কও ছুঁতে পারেননি।

এতটুকু পর্যন্ত সাধারণ লড়াই মনে হতে পারে। তবে এরপর বৃষ্টি, ঝড় আর দুই অধিনায়কের দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত মিলিয়ে টেস্ট নয়, নাটক হলো।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভালো ব্যাটিং করতে পারেনি, ইংল্যান্ডের ব্যাটিংয়ের অবস্থাও তথৈবচ। প্রথম দিন যখন শেষ হচ্ছে, ইংল্যান্ডের রান ৫ উইকেটে ৮১। পঞ্চম উইকেটের পতন অবশ্য আরও ২৭ রান আগেই হয়েছে।

এক ওয়ালি হ্যামন্ড ছিলেন বলে ইংল্যান্ড দ্বিতীয় দিনে ভালো কিছুর আশায় ছিল। কিন্তু আশার গুড়ে বালি! নাকি আশার গুড়ে বৃষ্টি বলা উচিত? রাতে বৃষ্টি হলো। তখন তো আর উইকেট ঢাকার নিয়ম নেই, পরের দিন চা-বিরতির আগে খেলা শুরু করা গেল না।

যখন শুরু করা গেল, ইংল্যান্ড ধসের মুখে—৮১/৫ থেকে দিনের প্রথম ওভার শেষেই ৮১/৭। উইকেট ব্যাটসম্যানদের জন্য নরকসম দেখে ওই অবস্থাতে ২১ রানে পিছিয়ে থাকা অবস্থায়ই ইনিংস ঘোষণা করে দেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক উইয়াট।

নাটকের সেটি মাত্র শুরু! ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাটিং অর্ডার ওলট–পালট করে দেখেছিল, লাভ হয়নি। ওই কন্ডিশনে লাভের আশাই হয়তো ভুল ছিল। দ্বিতীয় দিন শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসে রান ৩ উইকেটে ৩৩।

তা-ও ভালো, ওপেনার লেসলি হিলটন আর উইকেটকিপার সাইরিল ক্রিস্টিয়ানি কিছুটা লড়াই করেছিলেন। লড়াই না বলে সংগ্রামই বলা ভালো। তবে তাঁদের সংগ্রামের ফলেই ৪ রানে ৩ উইকেট হারানো উইন্ডিজ সেদিন আর উইকেট হারায়নি। রাতের বেলায় আবার বৃষ্টির হানা। এবার আরও জোরে। উইকেট পানিতে ভেসে গেছে।

পরের দিন বিকেল সাড়ে তিনটার আগে খেলা শুরু করা যায়নি। কিন্তু একে বৃষ্টিতে ভেজা পিচ, তারও পর বাতাসও ছিল। ৫১ রানেই ৬ উইকেট নেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের, এর মধ্যে চারজনই ফিরেছেন ০ রানে।

বিজ্ঞাপন

তখনই অভাবনীয় টুইস্ট! ইংল্যান্ড অধিনায়ক উইয়াট দল পিছিয়ে থাকা অবস্থায় ইনিংস ঘোষণার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন (নাকি প্রতিপক্ষকে এমন উইকেটে ব্যাটিংয়ে ঠেলে দেওয়ার চাল?), ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক জ্যাকি গ্রান্টের মনে হলো, বুদ্ধিটা খারাপ নয়।

দলের ৫১ রান তখন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের লিড মাত্র ৭২ রানের, এই অবস্থাতেই ইনিংস ঘোষণা করে দিলেন গ্রান্ট! ইংল্যান্ড দুই বোলার কেন ফার্নস আর জিম স্মিথকে ইনিংস উদ্বোধন করতে পাঠিয়ে পাল্টা চাল দিয়েছিল, কাজে লাগেনি। ৭ রানে দুজনের বিদায়।

২৫ রানে তৃতীয় উইকেট গেল, ২৯ রানে চতুর্থ। চারে নেমে ২০ রান করা প্যাটসি হেনড্রেন ফিরলেন দলকে ৪৩ রানে রেখে, ৫ রান পর ষষ্ঠ উইকেটও হারাল ইংল্যান্ড। তখনো টান টান উত্তেজনা! কিন্তু উইয়াটকে (৬*) নিয়ে হ্যামন্ড (২৯*) তরি ভিড়িয়ে দিলেন জয়ের বন্দরে।

নাটকীয় টেস্টটা ৬৭২ বলে শেষ হলো বটে, কিন্তু ক্ষণস্থায়ী টেস্টের তালিকায় তিন বছর আগের দক্ষিণ আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া টেস্টকে পেছনে ফেলতে পারেনি। সেই টেস্টেও দুই দিন পর বৃষ্টি এমনই হানা দিয়েছিল যে তৃতীয় দিনে খেলাই হয়নি।

কিন্তু তার আগে-পরে অস্ট্রেলিয়ান দুই ফাস্ট বোলার লরি ন্যাশ আর বার্ট আয়রনমঙ্গারের ধ্বংসযজ্ঞ চলল। প্রথম ইনিংসে ৩৬ রানে অলআউট দক্ষিণ আফ্রিকা, যদিও এর চেয়ে কম রানে অলআউট হওয়ার অভিজ্ঞতা এর আগেই প্রোটিয়াদের দুবার হয়েছিল। দ্বিতীয় দিনে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস শেষ হয়ে গেল ১৫৩ রানে।

তৃতীয় দিনের বৃষ্টিবিরতির পর আবার যখন আয়রনমঙ্গারের সামনে পড়ল দক্ষিণ আফ্রিকা, এক ওপেনার সিড কনরো ছাড়া কেউ দুই অঙ্কের বেশি যেতে পারেননি। ৪৫ রানে গুটিয়ে গিয়ে ইনিংস ও ৭২ রানে হার দক্ষিণ আফ্রিকার। দুই ইনিংস মিলিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ৮১ রান এখনো টেস্টে দুই ইনিংসে কোনো দলের সবচেয়ে কম রানের রেকর্ড।

আর মেলবোর্নে মাত্র ১০৯.২ ওভার বা ৬৫৬ বলে শেষ হওয়া সেই টেস্ট এখনো টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে ক্ষণস্থায়ী টেস্ট। আজ আহমেদাবাদে ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট এই তালিকায় সপ্তম। স্বাভাবিকভাবেই এই তালিকায় টেস্ট ক্রিকেট শুরুর দিকের টেস্টেরই ‘দাপট’। উইকেট তখন এত ব্যাটিংসহায়ক ছিল না, উইকেট ঢাকাও থাকত না, ব্যাটসম্যানের তখন শরীর ঢাকার মতো এত গার্ড ছিল না...টেস্ট তো দ্রুত শেষ হবেই!

টেস্টে সবচেয়ে ক্ষণস্থায়ী টেস্টের তালিকা

বল টেস্ট ভেন্যু তারিখ
৬৫৬, অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা, মেলবোর্ন, ১৯৩২
৬৭২, ওয়েস্ট ইন্ডিজ-ইংল্যান্ড, ব্রিজটাউন, ১৯৩৫
৭৮৮, ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া, ম্যানচেস্টার, ১৮৮৮
৭৯২, ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া, লর্ডস, ১৮৮৮
৭৯৬, দক্ষিণ আফ্রিকা-ইংল্যান্ড, কেপটাউন, ১৮৮৯
৮১৫, ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকা, ওভাল, ১৯১২
৮৪২, ভারত-ইংল্যান্ড, আহমেদাবাদ, ২০২১

* স্বাগতিক দল প্রথমে।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন