default-image

ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছেন। এবার তিনি আর মাঠে নেই। তবে গত বিশ্বকাপের মতো এবারও বিশ্বকাপদূত। স্টার স্পোর্টসে হার্শা ভোগলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শচীনটেন্ডুলকারফিরে তাকিয়েছেন নিজের বিশ্বকাপভ্রমণে। সেটিই তুলে দেওয়া হলো প্রথমআলোর পাঠকদের জন্য
প্রথম বিশ্বকাপ স্মৃতি...
শচীন টেন্ডুলকার: ১৯৮৭ বিশ্বকাপে ছিলাম বলবয়। তখনই আমার কথা অনেকে জানতেন। ওয়াংখেড়েতে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ম্যাচ শেষে গাভাস্কার আমাকে ড্রেসিংরুমে নিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন সবার সঙ্গে। শ্রীকান্ত, শাস্ত্রী, কপিল, ভেংসরকার—বিস্ময়-আনন্দে অসাড় হয়ে গিয়েছিলাম। ওই স্মৃতি কখনোই ভোলার নয়।
নিজের প্রথম বিশ্বকাপ...
টেন্ডুলকার: ১৯৯২ বিশ্বকাপও ভুলব না। বিশেষ করে সিডনিতে পাকিস্তানের সঙ্গে ম্যাচটা। অমন আবহে তখন পর্যন্ত খেলিনি। তত দিনে পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ায় খেলেছি। কিন্তু নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ভারত-পাকিস্তান বিশ্বকাপ ম্যাচেও যে উত্তেজনা, আবহ, রোমাঞ্চ—ওই রকম অভিজ্ঞতার মতো কিছু তখন পর্যন্ত হয়নি আমার। দর্শকের চিৎকার-চেঁচামেচি দেখে আমরা নিজেরা ‘চিয়ারআপ’ করছিলাম। জীবনে প্রথমবার আমার গলা ভেঙে গিয়েছিল ওই ম্যাচের পর। জয়ের রাতে এমন চিল্লাচিল্লি করেছিলাম!

১৯৯৬ বিশ্বকাপে নিজের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স, কিন্তু ইডেন-হতাশা...

টেন্ডুলকার: ১৯৯৬ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে বেঙ্গালুরুতে পাকিস্তানকে হারিয়ে আমরাই ছিলাম হট ফেবারিট। ওই ম্যাচের পর যে উৎসব, উদ্‌যাপন...সেমিফাইনাল খেলতে কলকাতায় যেভাবে বরণ করে নেওয়া হয়েছিল আমাদের, ধরেই নেওয়া হয়েছিল আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছি। শ্রীলঙ্কা তখন দারুণ খেলছিল। কিন্তু বিশ্বাস ছিল আমরা ওদের চেয়ে ভালো দল এবং সামর্থ্য অনুযায়ী খেললে আমরাই জিতব। ওদের দুই ওপেনার জয়াসুরিয়া ও কালুভিতারানা দুর্দান্ত খেলছিল। ম্যাচের আগের দিন মিটিংয়ে আমরা লম্বা সময় আলোচনা করেছিলাম ওই দুজনকে নিয়েই। ওরা দুজনই আউট প্রথম ওভারেই, আমরা তখন উড়ছিলাম। কিন্তু অরবিন্দ ডি সিলভা দুর্দান্ত একটি ইনিংস খেলল।

তার পরও আপনি যতক্ষণ উইকেটে ছিলেন, জয়ের পথে ছিল ভারত...

টেন্ডুলকার: জয়াসুরিয়ার যে বলে আউট হলাম, সাধারণত লেগ স্টাম্পে অমন বল আমি গুলির বেগে স্কয়ার লেগ, ফাইন লেগে পাঠিয়ে দিই। ওই বলে টাইমিং হলো না। বল উইকেটকিপারের পাশেই থাকল। কিন্তু শটটা খেলার গতিবেগ আমাকে সামনে ঠেলে দিল। স্টাম্পড হলাম। ড্রেসিংরুমে গিয়ে নিজেই নিজেকে বলছিলাম বারবার, ‘এটা কী করলে তুমি!’

২০০৩ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্যাডিককে মারা ক্রিকেট-গাথার সেই ছক্কা...

টেন্ডুলকার: ডারবানের ওই ম্যাচে বাড়তি বাউন্স ছিল উইকেটে। এমনিতে প্রথম সহজাত প্রবৃত্তি থাকে সামনের পায়ে থাকা। কিন্তু সেদিন ঠিক করেছিলাম ব্যাকফুটেই থাকব বেশি। ওই বলটির সময়ও তাই, ধরেই নিয়েছিলাম ক্যাডিক শর্ট অফ লেংথ করবে। ঠিক করেছিলাম ওই লেংথে করলে ওকে ছাড়ব না। সেটাই হলো, বলটাকে মাঠের বাইরে উড়ে যেতে দেখা ছিল দারুণ!

পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই মহাকাব্যিক ইনিংস...

টেন্ডুলকার: লাঞ্চের সময় ড্রেসিংরুমে এক কোনায় বসে ইয়ারফোন কানে গান শুনছিলাম। বিশাল এক বাটি আইসক্রিম খেতে বসলাম, সবাইকে বললাম আমার শক্তি দরকার। জানতাম ওয়াসিম-ওয়াকার-শোয়েব শুরুতেই আমাদের বিপাকে ফেলতে চাইবে। ড্রেসিংরুমে আলোচনা ছিল তাই শুরুতে উইকেট যেন না পড়ে। আমিও এমনটাই ভেবেছিলাম, প্রয়োজন হলে কয়েক ওভার মেডেন যাক। মাঠে নামার পরই হঠাৎ বীরুকে (বীরেন্দর শেবাগ) বললাম, ‘আজ আমি স্ট্রাইক নেব।’ এমনিতে সব সময় নন-স্ট্রাইকে থাকতে পছন্দ করি। সৌরভ কতবার আমাকে বলেছে, ‘একবার স্ট্রাইক নিয়ে দেখো!’ আমি বলতাম, ‘দাদা, জানোই তো সব সময় ওই পাশে থাকি, কেন খোঁচাও!’ কিন্তু ওই দিন আমি নিজে থেকেই স্ট্রাইক নিয়েছিলাম। তারপর যা করতে চাইলাম, সব হলো...।

২০১১ বিশ্বকাপ...সতীর্থরাও বলছিল শচীনের জন্য জিততে হবে...

টেন্ডুলকার: আমি জানতাম, ওরাও জানত ওটাই আমার শেষ বিশ্বকাপ। ২০০৭ বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিয়ে দেশে ফিরেছিলাম ভাঙা মনে। অজিতদা বললেন, ‘মন খারাপ কেন করছ? ২০১১ বিশ্বকাপে নিজের মাঠ ওয়াংখেড়েতে তোমার হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি উঠবে!’ সেটিই হলো। ফাইনালের শুরুতেই আউট হয়ে পুরো সময় ড্রেসিংরুমে এক জায়গায় বসে প্রার্থনা করছিলাম শুধু। ধোনির জয়সূচক শটও আমি দেখিনি। অনেকেই ডাকাডাকি করছিল, ‘জিতে গেছি প্রায়, এখন আসো।’ কিন্তু আমি নড়িনি। এমনকি শেবাগকেও পুরো সময় জোর করে বসিয়ে রেখেছিলাম আমার পাশে। এ মুহূর্তগুলোই আসলে স্মৃতিতে অম্লান থাকে।

জয়ের পর শিশুর মতো আনন্দে মাঠে ছুটে যাওয়া...

টেন্ডুলকার: ওই সব মুহূর্তে ছেলেমানুষ হয়ে যেতে হয়। নিজের মতো উদ্‌যাপন করতে হয়। সত্যি বলতে, ভেতরের ওই ছেলেমানুষটাই আমাকে ২৪ বছর ধরে খেলে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।

এবারের বিশ্বকাপ...

টেন্ডুলকার: দেখব অবশ্যই। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, আমাদের খুব ভালো সম্ভাবনা আছে। শুধু নিজেদের কাজটা ঠিকঠাক করতে পারলে ফলাফল এমনিতেই পক্ষে আসবে। প্রত্যাশা অনেক বেশি। সেটাই স্বাভাবিক! যত ভালো দল, তত বেশি প্রত্যাশা। সেটার সঙ্গে মানিয়ে নিতেই হবে।

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন