default-image

ক্রিকেটে সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকারদের বহুল-ব্যবহৃত শব্দ—মিনোস। ক্রিকেটের উদীয়মান-শক্তিগুলোকে ‘মিনোস’ হিসেবে অভিহিত করতে কেন যেন ক্রিকেট-সংশ্লিষ্টরা খুব আরাম পান। আইসিসির সহযোগী কোনো সদস্য রাষ্ট্র যদি টেস্ট-খেলুড়ে দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অবতীর্ণ হয়, তাহলেই হলো, ‘মিনোস’ ‘মিনোস’ করে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন ধারাভাষ্যকার ও সাংবাদিকেরা। আভিধানিক অর্থ ‘ছোট মাছ’ হলেও উদীয়মান শক্তিগুলোর ‘দুর্বলতা’ বোঝাতে কিংবা দেশগুলোকে হাসাহাসির পাত্রে পরিণত করতে এই ‘মিনোস’ শব্দের জুড়ি মেলা ভার। আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, হল্যান্ড, আরব-আমিরাত, কেনিয়া, আফগানিস্তান—এই দেশগুলোকে তো ‘মিনোস’ হিসেবে অভিহিত করা হয়ই, অবমাননাকর শব্দটি থেকে এখনো রেহাই মেলেনি বাংলাদেশ কিংবা জিম্বাবুয়ের মতো অপেক্ষাকৃত নবীন টেস্ট-খেলুড়ে দেশগুলোরও। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে সহযোগী-সদস্য কিংবা দুর্বল টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ‘মিনোস’ শব্দটি ব্যবহার করতে অনেকেই বিব্রতবোধ করছেন। ব্যাপারটির একটা নমুনা মিললো আজ ওয়েস্ট ইন্ডিজ-জিম্বাবুয়ে ম্যাচ শুরুর আগ মুহূর্তে স্টার স্পোর্টসের ধারাভাষ্যকারদের আলাপচারিতায়।
ক্যানবেরায় অনুষ্ঠানরত এই ম্যাচটির আগে স্টারস্পোর্টসের নিয়মিত আয়োজনে এর প্রিভিউ করছিলেন ইয়ান বিশপ, শেন ওয়ার্ন ও শন পোলক। হোস্ট হিসেবে ছিলেন ক্রিকেট সম্প্রচারের নিয়মিত মুখ টেলিভিশন সাংবাদিক ও উপস্থাপক মায়ান্তি ল্যাঙ্গার। আলোচনা চলছিল বিশ্বকাপের দুই গ্রুপের দলগুলোর অবস্থান নিয়ে। আলোচনা করতে করতেই বাংলাদেশ, আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তান প্রসঙ্গে মায়ান্তি বেশ কয়েকবারই উচ্চারণ করলেন ‘মিনোস’ শব্দটি। ক্রিকেটীয় জ্ঞান আর প্রজ্ঞায় ঋদ্ধ বিশপ, ওয়ার্ন কিংবা পোলকরা কিন্তু মায়ান্তির এই শব্দ-চয়নে যথেষ্ট বিব্রত বোধই করছিলেন। কারণ দুটি গ্রুপেরই অবস্থান বলছে, তথাকথিত শক্তিধর কিংবা মূল টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর সঙ্গে এই ‘দুর্বল’ দেশগুলোরও কোয়ার্টার ফাইনালে স্থান করে নেওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। থাকতে না পেরেই বোধহয় বিশপ মায়ান্তিকে শুধরে দিলেন, ‘দয়া করে “মিনোস” শব্দটা উচ্চারণ কোরো না। আমার কাছে মনে হয় “সহযোগী সদস্য” বলাটাই সবচেয়ে বেশি মানানসই। শেন ওয়ার্ন কয়েকবার ‘মিনোস’ উচ্চারণ করলেন বটে, কিন্তু এর আগে লাগিয়ে নিলেন ‘তথাকথিত’ শব্দটি। বিশপের অনুরোধে মায়ান্তিও যেন কিছুটা বিব্রত। অনুষ্ঠানের বাকি অংশে মিনোস শব্দটির ব্যবহারও থামিয়ে দিলেন তিনি। বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ড, আফগানিস্তানের অসাধারণ পারফরম্যান্স, কিংবা বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ের সম্ভাবনা রাতারাতি ক্রিকেট-সংশ্লিষ্টদের মনোভাবে তাহলে পরিবর্তন এনেছে ব্যাপকভাবেই।
বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর থেকেই ‘মিনোস’ শব্দটির বহুল ব্যবহার শুরু হয়। বাংলাদেশ মাঠে নামলেই ধারাভাষ্যকারদের মুখে ‘মিনোস’-‘মিনোস’ করে তুবড়ি ছুটতে থাকে। বাংলাদেশের আগে জিম্বাবুয়ে যখন গোটা নব্বইয়ের দশকে ‘নবীনতম টেস্ট খেলুড়ে দেশ’ হিসেবে পরিচিত ছিল, তখন কিন্তু এই ‘মিনোস’ শব্দটি ব্যবহারে এতটা ব্যাপকতা পরিলক্ষিত হয়নি। এই শব্দটির ব্যবহার যে মর্যাদাশীল রাষ্ট্র ও জাতিকে অবমাননার শামিল—সেটা বোধহয় নতুন করে না বললেও চলে। দুর্বল ও শক্তিতে পিছিয়ে থাকা একটি দেশকে অনেকভাবেই তুলে ধরা যায়, কিন্তু এর বদলে ক্রিকেটে চলেছে অমর্যাদাকর ভাষা ব্যবহারের মহোৎ​সব। সহযোগী সদস্য দেশগুলোর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই কেবল থামিয়ে দিতে পারে এই প্রবণতা। নিউজিল্যান্ডকে ২০১০ বিশ্বকাপের আগে ধবল ধোলাই করে কিন্তু বাংলাদেশ অনেকাংশেই কমিয়েছিল এর ব্যবহার।
২০১৫ বিশ্বকাপেই কবর রচিত হোক ‘মিনোস’ শব্দটির।

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন