default-image

টেনিসে বরিস বেকার আর স্টিফেন এডবার্গের লড়াইয়ের ইতিহাসটা জানেন? সাধারণ দ্বৈরথে এই দুজনের লড়াইটা ২৫-১০ ব্যবধানে বেকারের দিকে হেলে থাকলেও গ্র্যান্ডস্লাম লড়াইয়ে কেন যেন বরিস বেকার স্টিফেন এডবার্গের সঙ্গে পেরে উঠতেন না! টেনিসের এলিট লড়াইয়ে এই দুজনের চারটি লড়াইয়ের তিনটিতেই জিতেছেন এডবার্গ। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তান লড়াইটাও ঠিক এমনরূপেই হাজির ক্রিকেটপ্রেমী জনতার কাছে।
ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেট দ্বৈরথে জয়ের পাল্লা সব সময় পাকিস্তানের দিকেই ভারী। এই দুই দলের ১১২টি লড়াইয়ে পাকিস্তান জিতেছে ৭২টিতে, ভারত ৫০টিতে। কিন্তু বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তানের পাঁচটি লড়াইয়ের একটিতেও জেতেনি পাকিস্তান! কেন জেতেনি, সেটা ক্রিকেট দুনিয়ার কাছে এক বিরাট রহস্য। কাল অ্যাডিলেডে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় কর্মদিবসেই এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াইটা তাই এ রহস্য উন্মোচনের প্রাসঙ্গিকতা পাচ্ছে বেশ জোরের সঙ্গেই।
১৯৯২ সালের বিশ্বকাপের কথাই ধরুন। সিডনিতে সেবার ভারত-পাকিস্তান প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয়েছিল বিশ্বকাপের লড়াইয়ে। সেই ম্যাচের আগের ২১টি ম্যাচের ১৮টিতে জিতে সেবার সিডনিতে পরিষ্কার ফেবারিট হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছিল পাকিস্তান। জয়ের জন্য মাত্র ২১৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করেও সেবার ৪৩ রানে হার মেনেছিল পাকিস্তান। সেই থেকে শুরু। এরপর একে একে ১৯৯৬, ১৯৯৯, ২০০৩ আর ২০১১ সালে চারটি ম্যাচে হেরে এই লড়াইটাকে ঘিরে এক ধরনের ধূম্রজালই তৈরি করে দিয়েছেন পাকিস্তান। বিশ্বকাপে ভারতকে পাকিস্তান হারাতে পারে না, এই ধারণাটাই এখন পোক্ত।
পুরো বিষয়টি যথেষ্ট বিব্রতকর পাকিস্তানের জন্য। সম্প্রতি অ্যাডিলেড-লড়াইয়ের হাইপ তৈরি করতে যেয়ে স্যাটেলাইট চ্যানেল স্টার স্পোর্টস যে বিজ্ঞাপনটি তৈরি করেছে, সেটাতেও এ প্রসঙ্গে খোঁচাটা খুব তীক্ষ্ণ। কেবল বিশ্বকাপের পাঁচটি ম্যাচের রেকর্ডেই ভারতের বিপক্ষে ক্রিকেট মাঠে পাকিস্তানের স্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব ঢাকা পড়ে গেছে।
মিসবাহ-উল–হক যথেষ্ট সচেতন ব্যাপারটিকে ঘিরে। তিনি কালকের ম্যাচে মাঠে নামার আগে ইতিহাসকে একটু দূরেই ঠেলতে চেয়েছেন। সেই সঙ্গে চেয়েছেন ইতিহাসকে পাল্টে দিতে। ব্যাপারটা এমন অবস্থায় চলে গেছে যে, নিজেদের মান রক্ষার স্বার্থেই ভারতের বিপক্ষে এই ম্যাচটা জিততে চাচ্ছে পাকিস্তান।
ম্যাচের আগে তাই মিসবাহর কণ্ঠে স্পষ্টতই প্রতিজ্ঞার সুর, ‘ইতিহাসকে পাল্টে দেওয়ার সুযোগ এসেছে আমাদের সামনে। এই ইতিহাস নতুন ইতিহাস গড়ারও।’ ভারতীয় অধিনায়ক অবশ্য এসব ইতিহাস-টিতিহাসের দিকে খুব একটা তাকাতে চান না। তিনি সোজা-সাপ্টাই জানিয়ে দিয়েছেন, ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ে পুরোনো পরিসংখ্যানের ব্যাপারটি খুব কমই প্রভাব তৈরি করে।
ধোনি যা-ই বলুন না কেন, বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান লড়াই কিন্তু কিছু পরিসংখ্যানকে আপন করে নিয়েছে বেশ অদ্ভুতভাবেই। যে বোলিং শক্তি নিয়ে পাকিস্তানের এত গর্ব, সেই শক্তিশালী বোলিং বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে দ্বৈরথে এসে কেন যেন বড্ড ম্রিয়মাণ। ভাবা যায়, ওয়াসিম আকরামের মতো বোলার এই দ্বৈরথে তিন ম্যাচে শিকার করেছেন মাত্র দুই উইকেট! শোয়েব আকতার দুই ম্যাচে দুই উইকেট নিয়েছেন ৬৩ গড়ে! ওয়াকার ইউনুস ১৮.৪ ওভার বল করে ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন ৭.৩৯!

অন্যদিকে ফিরে তাকান, যে ফাস্ট বোলিংকে ভারতের দুর্বলতার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, বেশ অনেক বছর ধরেই সেই ফাস্ট বোলিং অনেকবারই জয় এনে দিয়েছে ভারতকে। পাকিস্তানের বিপক্ষে লড়াইয়ে ভেঙ্কটেশ প্রসাদের ৮ উইকেট এসেছে মাত্র ৯ গড়ে। জাভাগাল শ্রীনাথ চার ম্যাচে সাত উইকেট নিয়েছেন মাত্র ২৫.১৪ গড়ে। বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ে পরিসংখ্যানের উল্টে যাওয়ার ব্যাপারটি রীতিমতো রহস্যমণ্ডিত।
একটা দিক দিয়ে এই লড়াইয়ে পরিসংখ্যান কিন্তু ঠিক পথেই হেঁটেছে। সেটা হচ্ছে ব্যাটিং। এই দ্বৈরথে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহকারী ব্যাটসম্যান কিন্তু শচীন টেন্ডুলকারই। শীর্ষ রান সংগ্রাহক পাঁচ ব্যাটসম্যানের তালিকায় টেন্ডুলকারসহ তিনজনই ভারতীয়। বাকি দুজন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন ও রাহুল দ্রাবিড়। যে দুজন পাকিস্তানি এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন—সাঈদ আনোয়ার ও আমির সোহেল। এ তালিকায় কিন্তু নেই পাকিস্তান গ্রেট ব্যাটসম্যান ইনজামাম-উল হক। বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে লড়াইয়ে ‘ইনজি’ ভীষণ ‘ফ্লপ’!

কাল অ্যাডিলেডের লড়াইয়ে একদিক দিয়ে স্বস্তি দিচ্ছে পাকিস্তানকে। প্রতিপক্ষে ভারতীয় দলে যে এবার নেই শচীন টেন্ডুলকারের নাম। ২০১১ বিশ্বকাপে ওয়াহাব রিয়াজের দুর্দান্ত বোলিংয়ের পরও এই টেন্ডুকারই কিন্তু পাকিস্তানের নাগালের বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজেদের লক্ষ্যমাত্রাকে। এবার লড়াইয়ে এক টেন্ডুলকারের অনুপস্থিতি কি একটুও বদলে দেবে না পাকিস্তানিদের ভাগ্য? পাকিস্তানি সমর্থকদের এমন প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে কয়েক ঘণ্টা পরই।

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন