default-image

ওটা ছিল ভারতের তৎকালীন অধিনায়ক কপিল দেবের ক্রীড়াসুলভ মানসিকতার চর্চাই। ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচে একটি ছোট্ট বিভ্রান্তির হাত থেকে মাঠের আম্পায়ারকে মুক্তি দিতেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন ক্রীড়াসুলভ মানসিকতার পথ। কিন্তু দিন শেষে কপিলের ওই বিনয়, ওই ক্রীড়াসুলভ মানসিকতাই তাঁর দল ভারতকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল এক রানের এক দুর্ভাগ্যজনক হারের। একই বিশ্বকাপে নিজের ক্রিকেটের চেতনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে গিয়ে খেসারত গুনেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ফাস্ট বোলার কোর্টনি ওয়ালশ। তাঁর ভদ্রতা ও ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা ওয়েস্ট ইন্ডিজেরও একটি দুঃখজনক হারের কারণ হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, ওয়ালশের ক্রীড়াসুলভ আচরণ বিশ্বকাপ থেকে ক্যারিবীয়দের বিদায়ও করেছিল ত্বরান্বিত।

ঘটনা দুটি হয়তো অনেকেরই জানা। ১৯৮৭ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্যায়ের খেলায় মাদ্রাজে মুখোমুখি হয়েছিল ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। প্রথমে ব্যাট করে অস্ট্রেলিয়া স্কোরবোর্ডে ২৭০ রান তুললেও কপিল দেব একটু কড়া হলেই সংগ্রহটা হয়ে যেতে পারত ২৬৮। অস্ট্রেলীয় ইনিংসের একপর্যায়ে মনিন্দর সিংয়ের বলে অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যান ডিন জোনস মিড অফের ওপর দিয়ে একটি বাউন্ডারি হাঁকান। ফিল্ডার রবি শাস্ত্রীকে জিজ্ঞেস করে আম্পায়ার ডিকি বার্ড সংকেত দেন চারের। কিন্তু সমস্যা বাধান ডিন জোনস নিজেই। তিনি আম্পায়ারের কাছে গিয়ে ছক্কার দাবি জানাতে থাকেন। আরও একটু ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য আম্পায়ার ডিকি বার্ড জোনসকে বলেন, এই সিদ্ধান্তটি দেওয়া হবে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের পরপরই। স্কোরবোর্ডে ২৬৮ নিয়েই অস্ট্রেলিয়া শেষ করে তাদের ইনিংস।
ভারতের ইনিংস শুরু হওয়ার পর স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকদের অবাক হওয়ার পালা। তাঁরা দেখেন স্কোরবোর্ডে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ দেখাচ্ছে ২৭০। বিভ্রান্ত দর্শকেরা তখনো জানতেন না, পর্দার আড়ালে খোদ ভারতীয় অধিনায়কের সম্মতিতেই অস্ট্রেলিয়ার ২ রান বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিরতির সময় ডিকি বার্ড জোনসের অভিযোগের ব্যাপারে শুনানি ডাকলে কপিল বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেন জোনসের আবদার কিংবা দাবি। কপিলের সম্মতিতে ওই বাউন্ডারিটি চার না দিয়ে দেওয়া হয় ছয়। দুঃখের বিষয় ম্যাচটিতে পুনর্নির্ধারিত ২৭১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে ভারত হেরে যায় মাত্র এক রানে।

কোর্টনি ওয়ালশের বিনয়ের খেসারত অবশ্য কপিল দেবের চেয়েও বেশি। সাতাশির বিশ্বকাপেই ভারতের অপর গ্রুপে খেলছিল পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। লাহোরে গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপ ম্যাচে পাকিস্তান ছিল পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। খেলার একেবারে অন্তিম বলটিতে জয়ের জন্য পাকিস্তানের দরকার পড়ে দুই রানের। বল করছিলেন ওয়ালশ। ব্যাটিংয়ে স্ট্রাইকিং প্রান্তে ছিলেন আবদুল কাদির ও নন স্ট্রাইকিংয়ে ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান সেলিম জাফর। এই দুই ব্যাটসম্যানের ব্যাটিং-ক্ষমতাও ছিল তথৈবচ। এমন একটি মুহূর্তে শেষ বলটি করার জন্য ক্রিজে পা রাখতেই ওয়ালশ দেখেন সেলিম জাফর বেরিয়ে গেছেন অনেকটা দূর। ইচ্ছা করলেই জাফরকে রানআউট করে দিতে পারতেন ওয়ালশ। কিন্তু তা না করে জাফরকে সতর্ক করে দেন তিনি। জাফরকে নিরাপদে ক্রিজে ফেরত আসার সুযোগও তৈরি করে দেন তিনি। এটা ওয়ালশের বোকামি ছিল, নাকি উদারতা—সেটা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ওয়ালশের আচরণ ছিল পুরোপুরিই ক্রীড়াসুলভ। ক্রিকেটের চেতনার বিরুদ্ধে না যাওয়ার মানসিকতা থেকেই সেদিন উদারতার পরিচয় দিয়েছিলেন ওয়ালশ। শেষ বলটিতে কাদির উড়িয়ে মেরে দুই রান তুলে নেন সহজেই। এক উইকেটে ম্যাচটি জিতে পাকিস্তান স্থান করে নেয় সেমিফাইনাল লড়াইয়ে। এই একটি হারেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় হয়ে যায় দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন রিচার্ডস, হেইন্স, গ্রিনিজদের ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
এই দুটি ঘটনাকে কপিল-ওয়ালশের ভালো মানুষীর খেসারত বলতে পারেন, যদি আপনার হৃদয়টা এই দুই গ্রেটের মতো না হয়!

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন