default-image

পরিকল্পনাটা বাস্তব হয়ে গেলে ফুটবলের জন্য সম্ভবত সেটি ভালো হবে না। গত কয়েক বছর ধরেই চলছে পরিকল্পনাটা। সেটি এই, ইউরোপের সেরা ক্লাবগুলো মিলে চ্যাম্পিয়নস লিগের বদলে আলাদা একটা টুর্নামেন্ট করবে, ‘ইউরোপিয়ান সুপার লিগ’ নামের সেই টুর্নামেন্টে শুধু গুটিকয়েক বড় দলই খেলবে।

চ্যাম্পিয়নস লিগের জন্য সেটি ভালো খবর নয়। ভালো নয় ইউরোপজুড়ে লিগগুলোর জন্যও। ছোট যে দলগুলো ইউরোপের কুলীন টুর্নামেন্টে এসে চমক দেখানোর আশায় থাকে, তাদের কপালেও হাত দেওয়ার জোগাড়।

কিন্তু ফিফা সেটি হতে দিতে রাজি নয়। সে কারণেই কিনা, আজ এক বিবৃতিতে ফিফা হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে, যেসব ক্লাব এই বিকল্প টুর্নামেন্টে খেলবে, সেই ক্লাবগুলো এবং তাদের খেলোয়াড়দের ফিফা ও এর মহাদেশীয় অঙ্গসংগঠনগুলো আয়োজিত কোনো টুর্নামেন্টে খেলতে দেওয়া হবে না। নিষিদ্ধ হবে সেই ক্লাবগুলো, নিষিদ্ধ হবেন সেই খেলোয়াড়েরা।

সে কারণেই প্রশ্নটা উঠছে, আইসিএলে খেলে বাংলাদেশের আফতাব আহমেদ, হাবিবুল বাশার  কিংবা শাহরিয়ার নাফীসদের যে পরিণতি হয়েছিল, লিওনেল মেসি, নেইমার কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোদেরও কি সেই পরিণতি হবে? ২০২২ বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন না এই মহাতারকারা?

বিজ্ঞাপন
default-image

আইসিএল আর আফতাবদের সঙ্গে ইউরোপিয়ান সুপার লিগ আর মেসি-নেইমারদের তুলনা কেন? দুটি টুর্নামেন্টই যে একই রকম। টুর্নামেন্ট আয়োজনের সত্যিকারের উদ্দেশ্য দুরকম হতে পারে, তবে একটা জায়গায় দুটি টুর্নামেন্টে মিল এই—গতানুগতিক ধারা থেকে বেরোনোর প্রয়াসেই আইসিএল এসেছিল ক্রিকেটে, তেমনি ফুটবলে ইউরোপিয়ান সুপার লিগ আসার সম্ভাবনা।

ভারতের কিংবদন্তি অধিনায়ক কপিল দেবের আশীর্বাদপুষ্ট আইসিএল হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) ও বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে। তেমনি ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোও ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা আর বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার শাসানি উপেক্ষা করে এই টুর্নামেন্ট আয়োজনের স্বপ্নে মত্ত।

আর টুর্নামেন্টটা শেষ পর্যন্ত সত্যিই আয়োজিত হলে আর ফিফার হুঁশিয়ার বাস্তব রূপ পেলে সে ক্ষেত্রে মেসি-নেইমার-রোনালদোদের পরিণতি তো আফতাব-হাবিবুলদের মতো হতেই পারে!

একদিক থেকে ভাবলে যত নষ্টের গোড়া আসলে ইউরোপের ফুটবলে মৌসুমপূর্ব প্রীতি টুর্নামেন্ট ইন্টারন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নস ট্রফিই! কীভাবে? ফুটবলের গোপন বিষয় ফাঁস করে বিখ্যাত হয়ে যাওয়া জার্মান সাময়িকী ডার স্পিগেল ২০১৮ সালের নভেম্বরে বোমা ফাটায় এই বলে যে ২০১৬ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের বড় কয়েকটি ক্লাবের কর্তাব্যক্তিরা লন্ডনে বৈঠক করেছেন আমেরিকান ব্যবসায়ী চার্লি স্টিলিটানোর সঙ্গে। এই স্টিলিটানোই ইন্টারন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আয়োজক। ওই বৈঠকেই সবকিছু চূড়ান্ত হয়নি, তবে এরপর থেকেই মেইল চালাচালির মাধ্যমে ইউরোপিয়ান সুপার লিগের ধারণাটা আরও ছড়িয়ে পড়ে—এমনটাই জানায় ডার স্পিগেল।

default-image

কারা খেলবে এই ইউরোপিয়ান সুপার লিগে? ডার স্পিগেল জানিয়েছে সেটিও। এখানে আবার ‘জাতিভেদ’ও আছে। ইউরোপের ১১টি বড় ক্লাব হবে এই টুর্নামেন্টের ‘উদ্যোক্তা’—স্পেনের বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ, ফ্রান্সের পিএসজি, ইংল্যান্ডের চেলসি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, আর্সেনাল, লিভারপুল ও ম্যানচেস্টার সিটি, ইতালির জুভেন্টাস ও এসি মিলান আর জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ।

আর ৫টি ক্লাব খেলবে ‘অতিথি’ হিসেবে। প্রাথমিকভাবে ওই পাঁচ ক্লাব হিসেবে আতলেতিকো মাদ্রিদ, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড, ইন্টার মিলান, রোমা ও মার্শেইয়ের কথা শোনা গিয়েছিল। পাশাপাশি উত্তরণ-অবনমন রাখার জন্য আরও কিছু দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে দ্বিতীয় স্তরের একটা লিগেরও পরিকল্পনা ছিল। তবে এই লিগে ‘উদ্যোক্তা’ ক্লাবগুলো যেমনই খেলুক, নিয়ম রাখা ছিল, প্রথম ২০ বছরে এই ক্লাবগুলোর কোনোটি দ্বিতীয় স্তরে অবনমিত হবে না। প্রাথমিকভাবে ২০২১ সাল থেকে এই টুর্নামেন্ট শুরুর পরিকল্পনা ছিল। দুদিন আগে রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ ও জুভেন্টাস সভাপতি আন্দ্রেয়া আগনেল্লির বৈঠকও সেটি নিয়েই হয়েছে বলেই অনুমান অনেকের।

বায়ার্ন মিউনিখ ও ক্লাবটির চেয়ারম্যান কার্ল-হাইঞ্জ রুমেনিগে অবশ্য এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরই দাবি করেছেন, তাঁরা এই পরিকল্পনার সঙ্গে নেই। বার্সেলোনার সভাপতি নির্বাচনে বর্তমান প্রার্থীরাও এই ইউরোপিয়ান সুপার লিগের বিপক্ষে মত দিয়েছেন, যদিও বার্সেলোনার সাবেক সভাপতি জোসেপ মারিয়া বার্তোমেউ তাঁর শেষ বক্তব্যে বার্সেলোনার এই লিগে খেলার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। স্প্যানিশ লিগের সভাপতি হাভিয়ের তেবাসও এই পরিকল্পনার বিপক্ষে কথা বলেছেন।

প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনাটা লোভনীয় মনে হয়েছিল ফুটবলবিশ্বে অনেকের কাছে। বার্সা-রিয়াল কিংবা জুভেন্টাস-পিএসজির মতো দলগুলোর খেলা সব সময় দেখা যাবে—এই আকর্ষণটাই অনেকের কাছে বেশি মনে হয়েছিল। কিন্তু সেটিই আবার পাল্টা যুক্তি হয়ে এসেছে। এই ম্যাচগুলো চ্যাম্পিয়নস লিগে যখন হয়, তখন এই ম্যাচগুলো নিয়ে আকর্ষণ বেড়ে যাওয়ার বড় কারণগুলোর মধ্যে দুটি এই যে এই ম্যাচগুলো সব সময় হয় না বলেই এর আকর্ষণ বেশি। আর দুই, এই ম্যাচগুলোর ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। হয়তো নকআউট পর্বে একটা ধাপ পেরোনো, কিংবা ফাইনাল জেতা...বা এমন কিছু। কিন্তু সেই বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, কিংবা পিএসজি, জুভেন্টাস যদি সারা বছরই খেলে এবং সেখানে কোনো উত্থান-পতনের হিসাব না থাকে, তাহলে সেটির আকর্ষণ আর কত দিন থাকবে? ফুটবলের নখকামড়ানো রোমাঞ্চই তো থাকবে না!

বিজ্ঞাপন
default-image

আর ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এর বিপক্ষে যাচ্ছে, কারণ এই লিগ আয়োজিত হলে শুধু বড় ক্লাবগুলোরই আয় হবে, ছোট ক্লাবগুলো আরও বিপদে পড়বে। এখন যেমন চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা ঘরোয়া লিগগুলোর আয় ভাগাভাগি হয়ে যায়, সেটির সুযোগই তো আর থাকবে না। আর বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ স্প্যানিশ লিগ থেকে বেরিয়ে গেলে, কিংবা লিভারপুল-ম্যান ইউনাইটেড-ম্যান সিটির মতো দলগুলো ইংলিশ লিগ থেকে বেরিয়ে গেলে ওই লিগগুলোর আকর্ষণ আর আয়ই–বা কেমন থাকবে? সে ক্ষেত্রে ওই লিগের অন্য দলগুলোও তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে!

সে কারণেই আজ ফিফা বিবৃতিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছে—এই লিগে খেলার ফল মানে নিষেধাজ্ঞা। ‘কয়েকটি ইউরোপিয়ান ক্লাব মিলে শুধু নিজেদের অংশগ্রহণের সুযোগ রেখে ইউরোপিয়ান সুপার লিগ তৈরি করতে যাচ্ছে বলে সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন এসেছে। সেটির পরিপ্রেক্ষিতে ফিফা ও এর ছয়টি কনফেডারেশন আরেকবার জোর দিয়ে মনে করিয়ে দিতে চায়, ফিফা বা কোনো মহাদেশীয় কনফেডারেশন এমন টুর্নামেন্টকে স্বীকৃতি দেবে না’—বিবৃতিতে লিখেছে ফিফা।

তারপরও এই লিগ হলে, তাতে ক্লাবগুলো খেললে, সেটির পরিণতি জানিয়ে দিয়েছে ফিফা, ‘কোনো ক্লাব বা খেলোয়াড় এই টুর্নামেন্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে তার পরিণতি হিসেবে তাদেরকে ফিফা বা এর আঞ্চলিক কনফেডারেশনগুলো আয়োজিত কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নিতে দেওয়া হবে না।’

ফিফার অধীনে বর্তমানে ক্লাব টুর্নামেন্ট হিসেবে চালু আছে ‘ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ’, যেটি ২০২১ সাল থেকে নতুন ছকে, আরও বেশি দল নিয়ে আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। আর জাতীয় দলগুলোর জন্য মহাদেশীয় কনফেডারেশনগুলোর নিজস্ব চ্যাম্পিয়নশিপের (এশিয়ান কাপ, ইউরো, কোপা আমেরিকা) তো আছেই, ফিফার আয়োজনে আছে বিশ্বকাপ!

এই বছর বা আগামী বছরের মধ্যে ইউরোপিয়ান সুপার লিগ আয়োজিত হলে, তাতে বার্সা-রিয়াল-পিএসজি-জুভেন্টাস খেললে, আর ফিফার শাস্তি কার্যকর হলে ২০২২ বিশ্বকাপ তো মেসি-নেইমার-রোনালদোদের ছাড়াই হবে!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন