আরামবাগের বড় শাস্তি: কী বলছেন সাবেক তারকারা

স্পট ফিক্সিংসহ অন্যান্য অভিযোগে আরামবাগকে প্রথম বিভাগে নামিয়ে দিয়েছে বাফুফে। ব্রাদার্সের বিপক্ষে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

সাবেক তারকারা বলছেন উপযুক্ত শাস্তিই হয়েছে আরামবাগেরছবি: প্রথম আলো

২০১৯ সালে ক্যাসিনো–কাণ্ডে অন্য পাঁচটি ক্লাবের সঙ্গে আরামবাগের প্রধান ফটকেও তালা ঝুলছে। সেটি ঝুলে আছে আজও। এরই মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে অনলাইন বেটিংসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে ক্লাবটির বিরুদ্ধে। সেসব অভিযোগের প্রমাণ পেয়ে শাস্তি হিসেবে ৬৩ বছরের পুরোনো ক্লাবটিকে গতকাল প্রথম বিভাগে নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। নেওয়া হয়েছে আরও কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও। ক্লাবটির কর্মকর্তা ও দেশি-বিদেশি ১৪ জন খেলোয়াড়কে বিভিন্ন মেয়াদে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট গত ১৩ জানুয়ারি শুরু হওয়া চলতি ত্রয়োদশ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার ফুটবল লিগ। প্রায় শেষের দিকে থাকা এই লিগের শুরুর দিকে আরামবাগ তিনটি ম্যাচে লাইভ বেটিং ও স্পট ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে বলে অভিযোগ পায় এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। ম্যাচগুলো ছিল মোহামেডান, ঢাকা আবাহনী ও শেখ রাসেলের বিপক্ষে। একই সঙ্গে ব্রাদার্সের বিরুদ্ধেও অনলাইন বেটিংয়ের অভিযোগ ওঠে। তবে গোপীবাগের দলটির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে জানিয়েছে বাফুফে।

১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের বিরুদ্ধে ‘লাইভ বেটিং, স্পট ফিক্সিং, ম্যাচ ম্যানিপুলেশন ও অনলাইন বেটিং’য়ের সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে দেশীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা বাফুফে। এর আগে এএফসির নির্দেশে বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য বাফুফে তাদের পাতানো খেলা শনাক্তকরণ কমিটির কাছে পাঠায়। কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে বাফুফের শৃঙ্খলা কমিটি ২৬ আগস্ট সভায় বসে আরামবাগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেয়। পেশাদার লিগের দ্বিতীয় স্তরে এমনিতেই এবার অবনমিত হয়েছে আরামবাগ। বেটিংয়ের শাস্তি হিসেবে দলটিকে আরেক ধাপ নিচে প্রথম বিভাগে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামী দুই বছর আরামবাগকে খেলতে হবে প্রথম বিভাগেই।

এ ব্যাপারে দেশের ফুটবলের সাবেক তারকারা কে কী ভাবছেন, আসুন জেনে নিই...

উপযুক্ত শাস্তিই হয়েছে: গোলাম সারোয়ার টিপু

গোলাম সারোয়ার টিপু
ফাইল ছবি

বাফুফের দেওয়া এই শাস্তি ঠিকই আছে। এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখে অন্যরা আর সাহস পাবে না। আরামবাগ প্রথমে ভারত থেকে যাদের কোচিং স্টাফ হিসেবে এনেছিল, ওদের দেখেই বোঝার কথা ক্লাবের উদ্দেশ্য ভালো নয়। কোচ হিসেবে ভারতের সুব্রত ভট্টাচার্যের নাম শুনে প্রথমে মনে করেছিলাম মোহনবাগানের সাবেক ফুটবলার ও কোচ সুব্রত ভট্টাচার্যকে আনা হয়েছে। পরে দেখলাম অন্য কেউ। কোচিং স্টাফের নামে ভারতীয়রা এখানে এসে যেভাবে শুরু করেছিল, সবকিছু শেষ করে দিত। আমাদের ফুটবল এমনিতেই শেষ। বেটিং নামের এই ব্যাধি সংক্রমিত হয়ে বিপদ বাড়ত আরও।

এখন অন্যরা ভয় পাবে: আশরাফউদ্দিনআহমেদ চুন্নু

আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু
ছবি: প্রথম আলো

আরামবাগের সৌজন্য স্পট ফিক্সিংয়ে যে ঘটনার কথা শুনেছি, এমন কিছু সত্যিই ঘটে থাকলে শাস্তি ঠিকই আছে। এ ধরনের অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই হওয়া উচিত। এক ধাপ নামিয়ে দিয়ে আরামবাগকে প্রথম বিভাগে দুই বছর খেলানো দৃষ্টান্ত হয়েই থাকবে। সঙ্গে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার সিদ্ধান্তেরও প্রশংসা করি। আরামবাগের কর্মকর্তা, কোচিং স্টাফসহ দোষী খেলোয়াড়দের শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখে অন্যরা ভয় পাবে। আশা করি আমাদের ফুটবল সঠিক পথে চলবে।

খেলার নামে প্রতারণা অন্যায়: শেখ মোহাম্মদ আসলাম

শেখ আসলাম
ফাইল ছবি

অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আশা করব, আর কোনো ক্লাব বা খেলোয়াড় এমন কর্মকাণ্ডে জড়াবে না। ভবিষ্যতে এমন কিছু হলে যেন আরও কঠিন শাস্তি দেওয়া হয়। কারণ, মাঠে খেলার নামে প্রতারণা করা অন্যায়। তাই কোনো ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে আরামবাগের জন্য খারাপ লাগছে। আমাদের সময়ে এই দলটি অনেক চমক দিত। নিজেদের দিনে যেকোনো দলকে হারিয়ে দিতে পারত। বড় দলগুলোর সঙ্গে অনেক ম্যাচেই তারা ড্র করেছে। সেই ক্লাবের এমন পরিণতি সত্যিই দুঃখজনক।

কর্মকর্তাদের প্রশ্রয়েই এসব: আলফাজ আহমেদ

আলফাজ আহমেদ
ফাইল ছবি

খেলার নামে বেটিংয়ে জড়ানো জঘন্য অপরাধ। আমি বলব, আরামবাগের দলীয় কর্মকর্তাদের প্রশ্রয়েই এসব অনৈতিক কাজ হয়েছে। আমাদের ফুটবলে কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে এ ঘটনা। আসলে আরামবাগ বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্যাসিনো–কাণ্ড দিয়ে যার শুরু ২০১৯ সালে। এরপর বেটিং–কাণ্ডে ক্লাবটি অস্তিত্ব–সংকটে পড়ে গেল। এ জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা ভালো হয়েছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আরও বড় শাস্তি হওয়া উচিত ছিল। আশা করি, এ থেকে শিক্ষা নেবে অন্য ক্লাবগুলো। তবে একসময় আমি নিজে আরামবাগে খেলেছি। তাই ক্লাবটির জন্য কষ্টও লাগছে।

আরামবাগের যত শাস্তি

  • প্রথম বিভাগে নামিয়ে দেওয়াসহ পাঁচ লাখ টাকা আর্থিক জরিমানা। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাফুফেকে দিতে হবে এই টাকা। ১৪ খেলোয়াড়সহ মোট ২০ জনের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি।

  • সাবেক সভাপতি ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক এম স্পোর্টসের প্রধান মিনহাজুল ইসলাম, সাবেক দলীয় ম্যানেজার গওহর জাহাঙ্গীর, সাবেক ভারতীয় ফিটনেস ট্রেনার মাইদুল ইসলাম ও সাবেক সহকারী ম্যানেজার আরিফ হোসেন বাংলাদেশের ফুটবলে আজীবন নিষিদ্ধ।

  • সাবেক ভারতীয় ফিজিও সঞ্জয় বোস, ভারতীয় গেম অ্যানালিস্ট আজিজুল শেখ বাংলাদেশের ফুটবলে ১০ বছর নিষিদ্ধ।

  • সাবেক গোলকিপার আপেল মাহমুদকে দেওয়া হয়েছে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা।

  • সাবেক খেলোয়াড় আবুল কাশেম, আল আমিন, মোহাম্মদ রকি, জাহিদ হোসেন, কাজী রাহাদ মিয়া, মোস্তাফিজুর রহমান, শামীম রেজা, ব্রাডি স্মিথের (অস্ট্রেলিয়া) নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ তিন বছর।

  • সাবেক নাইজেরিয়ান খেলোয়াড় ক্রিস্টোফার চিজোবা, ওমর ফারুক, রাকিবুল ইসলাম, মেহেদী হাসান ফাহাদ ও মিরাজ মোল্লার নিষেধাজ্ঞা দুই বছর।