বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত সেপ্টেম্বরে রিয়াল কোচের পদে ফিরে আসেন আনচেলত্তি। ২০২০-২১ মৌসুমে রিয়াল কোনো শিরোপা জিততে পারেনি, ২০০৯-১০ মৌসুমের পর সেটাই রিয়ালের প্রথম রিয়ালের ট্রফিহীন মৌসুম।

এরপর রিয়ালের কোচের পদ ছেড়ে জিনেদিন জিদান চলে যান, রিয়ালের দীর্ঘদিনের ‘নেতা’ সের্হিও রামোসও সম্পর্ক ছিন্ন করে যোগ দিয়েছেন পিএসজিতে। রক্ষণভাগে রামোসের সঙ্গী রাফায়েল ভারানও মাদ্রিদ ছেড়ে যান ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। অর্থাৎ পরিস্থিতি আর যা–ই হোক স্বস্তির ছিল না, অনেকটাই কাদাজলে পড়ার মতো।

default-image

রিয়াল সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ তখন বুদ্ধি করে একটি সিদ্ধান্ত নেন। সবার আগে এসব অস্বস্তি কাটিয়ে উঠতে হবে, ক্লাবের পরিস্থিতি শান্ত করতে হবে, অস্বস্তি-অনিশ্চয়তার কাদাজল থেকে তুলতে হবে রিয়ালকে। সে জন্য সংক্ষিপ্ত মেয়াদে একজন কোচ খুঁজছিলেন পেরেজ, যিনি ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামলে রিয়ালকে পথে ফেরাতে পারবেন। আনচেলত্তি ছাড়া আর কে এই কাজে যোগ্য!

রিয়ালের হয়ে আগের মেয়াদে জিতেছেন চ্যাম্পিয়নস লিগ, কোপা দেল রে। কোচিংটা তিনি ঠান্ডা মাথায় করাতেই অভ্যস্ত, এর সঙ্গে যোগ করুন পিতৃস্নেহে ছাড় দিয়ে তারকাদের সামলানোর দক্ষতা। আনচেলত্তি আসার পর তাই রিয়ালে শৃঙ্খলা ফিরতে সময় লাগেনি।

শুধু শৃঙ্খলা নয়, লিগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো দলগুলোর বাজে পারফরম্যান্সের পূর্ণ সদ্ব্যবহারও করেছেন আনচেলত্তি। অধারাবাহিক আতলেতিকো মাদ্রিদ, বার্সেলোনার জঘন্য শুরু, সেভিয়ার গোল করার লোকের অভাব—এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে শিরোপা জয়ের দৌড়ে এখন আনচেলত্তির রিয়ালই এগিয়ে।

তাতে অনন্য এক রেকর্ডও হাতছানি দিয়ে ডাকছে ইতালি, জার্মানি, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ঘরোয়া ফুটবলে শিরোপাজয়ী আনচেলত্তিকে। প্রথম কোচ হিসেবে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের শিরোপা জয়ের কীর্তি গড়বেন আনচেলত্তি, যদি তাঁর অধীনে রিয়াল এবার লিগ জিততে পারে।

default-image

কোভিডে আক্রান্ত হওয়ায় এর আগে জানা গিয়েছিল, করিম বেনজেমা-ভিনিসিয়ুসদের সঙ্গে লন্ডনে যেতে পারেননি আনচেলত্তি। আজ রিয়াল বিবৃতিতে জানিয়েছে, কোভিড পরীক্ষায় নেগেটিভ হওয়ায় লন্ডনে শিষ্যদের সঙ্গে যোগ দেবেন তিনি। আজ রাতের ম্যাচের তাঁকে ডাগআউটে দেখার কথা জানিয়েছে রিয়াল।

এখন প্রশ্ন হলো, আনচেলত্তিকে আগামী মৌসুমেও কি দেখা যাবে রিয়ালের ডাগআউটে?

বিবিসি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাকিয়েছে রিয়ালের পারফরম্যান্সে। এ মৌসুমে পয়েন্ট টেবিল যতটা রিয়ালের পক্ষে কথা বলছে, পারফরম্যান্স কিন্তু ততটা বলছে না। অর্থাৎ লিগের পয়েন্ট তালিকা বলছে রিয়াল শীর্ষে এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে, কিন্তু মাঠে তাকালে দেখা যাচ্ছে আক্রমণভাগে করিম বেনজেমা ও গোলপোস্টে থিবো কোর্তোয়া ছাড়া আর কেউ-ই তেমন ধারাবাহিক নন!

বেনজেমাকে ছাড়া রিয়াল কতটা অসহায় তা বোঝা গেছে সর্বশেষ ‘এল ক্লাসিকো’য়—বার্সার কাছে ৪-০ গোলে হেরেছিল রিয়াল। আনচেলত্তিকে নিয়ে একটা প্রচলিত সমালোচনা হলো, খেলোয়াড়দের তিনি অদলবদল করে মাঠে নামার সুযোগ দেন না। প্রায় একই একাদশ বারবার মাঠে নামান। কে কেমন খেলছে, কতটা ভালো বা খারাপ পারফরম্যান্স, সেসব দেখেননি।

বার্সার বিপক্ষে সে ম্যাচে বিরতির সময় কৌশলগত কিছু ভুল করেও নিজের জায়গা নড়বড়ে করেছেন আনচেলত্তি। এমনই যে, বিরতি থেকে ফেরার দুই মিনিটের মধ্যেই রিয়াল গোল খাওয়ায় আবার সেই কৌশল বদলাতে হয়েছে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে প্রায় নিঃশর্ত এই হারে স্বাভাবিকভাবেই পেরেজের টনক নড়ার কথা।

অতীত বলছে, এমন অসহায় হারের পর খুব কম কোচই টিকেছেন রিয়ালের ডাগআউটে। ২০১৫ সালে ঘরের মাঠে বার্সার কাছে ৪-০ গোলে হারের পর ছাঁটাই হন রাফায়েল বেনিতেজ। ২০১৮ সালে ক্যাম্প ন্যুতে সেই বার্সার কাছেই ৫-১ গোলে হারের পর হুলেন লোপেতেগিকেও যেতে হয়। কয়েক মাস পর চ্যাম্পিয়নস লিগে আয়াক্সের কাছে ৪-১ গোলে হারের পর সান্তিয়াগো সোলারিকেও বরখাস্ত হতে হয়।

default-image

এমনকি রিয়ালে আনচেলত্তির প্রথম দফায় ইতালিয়ান কোচ রিয়ালকে চ্যাম্পিয়নস লিগের ১০ম (লা দেসিমা) শিরোপা জেতানোর বছরখানেক যেতে না যেতেই তাঁকে ছাঁটাই করেছেন পেরেজ। ২০১৫ সালে মৌসুমের মাঝপথে আতলেতিকোর কাছে ৪-০ গোলের হার মেনে নিতে পারেননি পেরেজ।

তাই ইতিহাস ফিরে আসার সম্ভাবনাই বেশি। সেটা চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা লা লিগা জেতার পরও হতে পারে। ওই যে, কথা ছিল আপৎকালীন পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে হবে, সেটি হলেও বার্সার বিপক্ষে বড় ব্যবধানের হার বুঝিয়ে দেয় দলের খেলার মধ্যে ফোকরগুলো ভরাট করা যায়নি। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় তা অবশ্য করাও যায় না।

মৌসুম শেষে আনচেলত্তিকে যদি ছেড়েই দেওয়া হয়, তাহলে রিয়ালের দায়িত্ব নিতে পারেন কে? বিবিসি এই প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে।

তিন কোচের নাম উঠে আসে সবার আগে। পিএসজি কোচ মরিসিও পচেত্তিনো, বায়ার্ন মিউনিখের কোচ ইউলিয়ান নাগলসমান এবং রিয়ালেরই কিংবদন্তি ক্লাবটির ‘বি’ দলের দায়িত্বে থাকা রাউল গঞ্জালেস। পচেত্তিনো বহু আগে থেকেই রিয়ালের প্রতি আগ্রহী। নাগালসমানকে পেরেজ পছন্দ করেন। ‘বি’ দলের হয়ে ভালো করা রাউলকেও বিবেচনা করছেন অনেকে।

যে-ই আনচেলত্তির জায়গায় আসুন না কেন, তাঁকে ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। করিম বেনজেমা, লুকা মদরিচ, টনি ক্রুস ও দানি কারভাহালের মতো বর্ষীয়ান তারকাদের বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে ধীরে ধীরে। গ্যারেথ বেল, ইসকো ও মার্সেলোদের রিয়াল ছাড়ার পথও বের করতে হবে। মাঝমাঠে ফেদে ভালভার্দে ও এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গাকেও আরও ভালোভাবে ব্যবহার করতে হবে। মদরিচ-ক্রুস-কাসেমিরোর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে আনচেলত্তির মূল একাদশে খুব কমই ঠাঁই হয় কামাভিঙ্গার।

default-image

আর হ্যাঁ, কিলিয়ান এমবাপ্পের কথাও মাথায় রাখত হবে!

পিএসজির ফরাসি তারকাকে বহু বছর ধরেই কেনার চেষ্টা করছে রিয়াল। এবার জুলাইয়ে পিএসজিতে এমবাপ্পের চুক্তির মেয়াদ শেষে রিয়াল সে চেষ্টায় সফল হতে পারে। কোচের ব্যাপারে তাঁর পছন্দ-অপছন্দও বড় প্রভাব ফেলতে পারে রিয়ালের আগামী মৌসুমের ডাগআউটে। এমনকি বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের তারকা আর্লিং হরলান্ডের পেছনেও রিয়াল ঘুরছে বলে শোনা যায়।

সোজা কথায়, টাকাপয়সায় ম্যানচেস্টার সিটি ও পিএসজির চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও পেরেজ তাঁর ক্লাবকে ইউরোপের অভিজাতদের কাতারে ধরে রেখেছেন, সব সময়ই রাখার লক্ষ্যেই সেরা তারকাদের পেছনে ছুটছেন। এ কারণে আগামী মৌসুমে রিয়ালের একাদশ খোলনলচে পাল্টে যেতে পারে।

বদলে যেতে পারেন ডাগআউটের মানুষও!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন