এরদোয়ানের রোষে পড়ে ট্যাক্সি চালান এই ফুটবল তারকা

বিজ্ঞাপন
default-image

হাকান সুকুরকে মনে পড়ে?

ওই যে, ২০০২ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাত্র ১০.৮ সেকেন্ডে গোল করে চারদিকে তোলপাড় লাগিয়ে দিয়েছিলেন যিনি? তুরস্কের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম স্ট্রাইকার মানা হয় তাঁকে। খেলেছেন ইন্টার মিলান, ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স ও পারমার মতো ক্লাবগুলোতে। তবে নিজেকে কিংবদন্তির পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তুরস্কের ক্লাব গ্যালাতাসারাইতে খেলে। ক্যারিয়ারের ৩৮৩ গোলের অধিকাংশই করেছেন গ্যালাতাসারাইয়ের লাল-হলুদ জার্সি পরে। এখন অবসর নিয়েছেন।

অবসরের পর অধিকাংশ ফুটবলারদের মতো ধারাভাষ্য কিংবা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুকুরও সময় কাটিয়ে দিচ্ছেন, এমনটা ভাবছেন তো?

ভুল!

তুরস্কের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা নিজের দেশেই থাকেন না এখন। চলে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রে, জীবিকার জন্য ট্যাক্সি ড্রাইভারের জীবন বেছে নিয়েছেন। বইও বিক্রি করেন ।

কিন্তু কেন? এমন কী হলো যে একজন ইন্টার মিলান-ব্ল্যাকবার্নের মতো ক্লাবে পেশাদার ফুটবল খেলা একজন দুর্দান্ত খেলোয়াড়কে ট্যাক্সি চালিয়ে আর বই বিক্রি করে জীবন ধারণ করতে হয়!

সুকুর তাঁর জীবনের কাহিনি জানিয়েছেন জার্মান পত্রিকা ওয়েল্ট আম সনতাগকে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেকিপ তায়িপ এরদোয়ানের রোষানলে পড়েই তাঁর এই অবস্থা।

অবসরের পর রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছিলেন সুকুর। ‘বন্ধু’ এরদোয়ানের রাজনৈতিক দল ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’র টিকিটে একবার তুরস্কের সংসদ সদস্যও হয়েছিলেন। এই বন্ধুই সুকুরের প্রথম বিয়েতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, রীতিমতো বিয়ের অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন।

বন্ধুত্বে ফাটল ধরা শুরু করে ২০১৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে। সেদিন এরদোয়ানের দল থেকে পদত্যাগ করেন সুকুর। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। কিন্তু ঘটনার সূত্রপাত এরদোয়ানের সন্দেহ। তিনি সন্দেহ করেছিলেন তাঁর বন্ধু সুকুর বিরোধী পক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। সন্দেহের বশেই তিনি সুকুরকে বের করে দেন তাঁর দল থেকে।

default-image

কী নিয়ে সন্দেহ জেগেছিল তুরস্কের প্রেসিডেন্টের মনে? দেশটিতে আগে নিয়মিত স্কুলের পাশাপাশি ভবিষ্যতের চাকরি পরীক্ষার জন্য ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুত করতে আলাদা স্কুলের (ক্র্যাম স্কুল) ব্যবস্থা ছিল। অনেকটা বাংলাদেশের বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের মতো। সে নিয়মটা হুট করে বন্ধ করে দেন এরদোয়ান। যার বিরোধিতা করেন এরদোয়ানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মোহাম্মদ ফতুল্লাহ গুয়েলেন। এই গুয়েলেনের সঙ্গেও সুকুরের বেশ সুসম্পর্ক ছিল। ব্যস, এরপর এরদোয়ানের বন্ধু থেকে শত্রু হয়ে গেলেন সুকুর।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এরদোয়ান ও তাঁর ছেলের দিকে ইঙ্গিত করে অবমাননাকর টুইট করেছেন— এই অভিযোগে সুকুরের নামে ওয়ারেন্ট জারি হয়। সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছেন, দেশবিরোধী কাজ করছেন, গুয়েলেনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ২০১৬ সালে অভ্যুত্থান করে এরদোয়ানকে হটানোর জন্য পরিকল্পনা করেছেন— এমন অনেক অভিযোগই করা হয় সুকুরের বিরুদ্ধে। তখনকার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে সুকুর বলেন, ‘আমার স্ত্রীর কাপড়ের দোকানে পাথর ছোড়া হতো, রাস্তাঘাটে আমার বাচ্চাদের হেনস্তা করা হতো। তারা আমার বাবাকে বন্দী করেছে, আমার সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। অথচ কেউই প্রমাণ দেখাতে পারবে না, যে অভ্যুত্থানে আমার ভূমিকা ছিল। আমি বেআইনি কিছু করিনি। আমি বিশ্বাসঘাতক কিংবা জঙ্গি নই।’ ২০১৭ সালে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান সুকুর।

প্রথমে ক্যালিফোর্নিয়ার এক ক্যাফেতে চাকরি নেন তিনি। পরে দেখতে পান, চাকরি নেওয়ার পর থেকে সে ক্যাফেতে সন্দেহজনক লোকজনের আনাগোনা বেড়ে গেছে। তা দেখে নিজের জীবন বাঁচাতে চাকরি ছেড়ে দেন সুকুর। এরপর থেকেই উবার ড্রাইভার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি, বই বিক্রি করা শুরু করেন জীবন যাপন করার জন্য।

এরদোয়ানের জন্যই যে তাঁর এই অবস্থা, সেটা স্বীকার করেছেন তিনি, ‘এরদোগান আমার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছেন। আমার বাক্‌স্বাধীনতা, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার, কাজ করে জীবন কাটানোর অধিকার— সব।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন