default-image

‘বন্ধু’র সঙ্গে স্বর্গে ফুটবল খেলতে চেয়েছেন পেলে। ডিয়েগো ম্যারাডোনা কি সেই অপেক্ষায় থাকবেন? নাকি মৃত্যুর ওপারের রহস্যময় ওই জগতে এরই মধ্যে বল নিয়ে কারিকুরি শুরু করে দিয়েছেন?

কল্পচোখে যখনই দেখতে চাইছি, ম্যারাডোনা এখন কী করছেন, যে ছবিটি চোখে ভেসে উঠছে, তাতে হয় তাঁর আকাশমুখী মাথায় বল নাচছে, নয়তো বাঁ পায়ে। আহ্, জাদুকরি সেই বাঁ পা!

খেলা ছেড়েছেন সেই কবে! ছাড়ার পরও কত কিছুই না করেছেন! কথায়, কাজে, সম্ভবত তার চেয়েও বেশি অকাজে নিত্যদিনই তিনি খবর। ম্যারাডোনা কোথাও গেছেন আর কোনো ঝামেলা বাধাননি, কই, এমন তো মনেই পড়ছে না। তারপরও সবকিছু ছাপিয়ে সবার মনে অনপনেয় যে ছবিটা আঁকা, তা ফুটবল পায়ে ম্যারাডোনার। আশ্চর্যই বলতে হবে, যাঁরা তাঁকে খেলতে দেখেননি, এমনকি তাঁদের মনেও।

ফুটবল ইতিহাসে বিখ্যাত বাঁ পা বললে প্রথমেই মনে পড়বে ফেরেঙ্ক পুসকাসকে। ‘ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্স’ নামে অমর হয়ে থাকা পাঁচের দশকের সেই হাঙ্গেরি দলের প্রাণভোমরা। ‘দ্য গ্যালোপিং মেজর’-এর ৮৫ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৮৪ গোল এখনো বিস্ময় জাগায়, কিন্তু স্পর্শের দূরত্বে গিয়েও তাঁর বিশ্বকাপ হাতে নেওয়া হয়নি।

জাদুকরি বাঁ পায়ের আধুনিকতম সংস্করণ লিওনেল মেসিকেও পুড়িয়েছে একই দীর্ঘশ্বাস। ডিয়েগো ম্যারাডোনার বাঁ পা এখানেই একমেবাদ্বিতীয়ম হয়ে যায়। কোনো ফুটবলারকে যাচাইয়ের চূড়ান্ত যে কষ্টিপাথর বিশ্বকাপ, সেখানেই ম্যারাডোনা দেখা দিয়েছেন পরিপূর্ণ মহিমায়। এক অর্থে যেখানে তিনি পেলের চেয়েও এগিয়ে। সংখ্যায় অবশ্যই নয়, পেলের তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড কেউ ছুঁতে পারেননি, কোনো দিন কেউ পারবেন না বলে ঘোষণা দিয়ে দেওয়ায়ও কোনো ঝুঁকি দেখি না। কিন্তু প্রায় একক কৃতিত্বে ট্রফি জিতে একটা বিশ্বকাপকে নিজের নামাঙ্কিত করে রাখার কীর্তিতে পেলেও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী নন। এখানে ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা হতে পারে শুধু ১৯৬২ বিশ্বকাপের গারিঞ্চার।

বিজ্ঞাপন

তুলনা হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ম্যারাডোনাই একটু এগিয়ে থাকেন। ১৯৬২ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলের আকাশে গারিঞ্চাই একমাত্র তারা ছিলেন না, কিন্তু ১৯৮৬ বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা? সেই দলকে ‘ম্যারাডোনা ও আরও দশজন’ বললে বাকিদের প্রতি হয়তো অবিচার হয়, তবে ভ্যালডানো-বুরুচাগারাও মনে হয় না তাতে খুব বেশি আপত্তি করবেন। সত্যিটা তাঁদের চেয়ে ভালো আর কেই-বা জানে!

‘জেকিল অ্যান্ড হাইড’-এর আদর্শ ফুটবলীয় উদাহরণ ম্যারাডোনার বিপরীত দুই রূপেরই সাক্ষী হয়ে আছে বিশ্বকাপও। বিশ্বকাপেই তাঁর ফুটবলীয় জিনিয়াসের চূড়ান্ত প্রকাশ (১৯৮৬), আবার ডোপিংয়ের কারণে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কৃতও হতে হয়েছে তাঁকে (১৯৯৪)। ঘটনার ঘনঘটাময় বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার থেকে শুধু বিশ্বকাপটা আলাদা করে নিলেও তো কত নাটক! হাত দিয়ে গোল করেছেন (১৯৮৬), আবার হাত দিয়ে গোল বাঁচিয়েছেনও (১৯৯০)। বিশ্বকাপ জেতার পর খেলনা পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা শিশুর মতো তাঁকে উল্লাসে মেতে উঠতে দেখেছে বিশ্ব, আবার বিশ্বকাপ জিততে না পারার দুঃখে মাঠেই কাঁদতে দেখেছে কোটি কোটি মানুষ। দর্শকের চোখও শুকনো থাকেনি।

এত কিছুর ভিড়েও শুধুই একটি ম্যাচ দিয়ে ম্যারাডোনাকে বোঝাতে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেই কোয়ার্টার ফাইনালটাই যথেষ্ট। বছর দুয়েক আগে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের অধিকার নিয়ে যুদ্ধ হয়ে গেছে দুই দেশের। তারই ছায়ায় অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে শুরু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অগ্নিগর্ভ সেই কোয়ার্টার ফাইনালে ৪ মিনিটের ব্যবধানে দুটি গোলে যেন প্রতীকী হয়ে ফুটে ওঠেন মানুষ ডিয়েগো ম্যারাডোনাও। একটিতে মূর্ত লাতিন চাতুর্য, আরেকটিতে লাতিন সৃষ্টিশীলতা। প্রথমটি পরিষ্কার প্রতারণা, দ্বিতীয়টি ফুটবলীয় উৎকর্ষের চরমতম প্রকাশ। মাঝমাঠে বল পাওয়ার পর একের পর এক প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে বিমূঢ় করে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার শেষ গোলকিপারকেও কাটিয়ে করা গোলে। যেটিকে এখন সবাই জানে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে।

প্রথম গোলটার নামকরণের কাজটা করেছেন নিজেই। হাত দিয়ে গোল করার পর ম্যাচ শেষে সেটির উৎস হিসেবে ‘কিছুটা আমার মাথা আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত’ বলাটাও কেন যেন মনে হয় শুধু ম্যারাডোনার পক্ষেই সম্ভব। ‘হ্যান্ড অব গড’ কথাটাকে ফুটবলের পরিভাষায় ঢুকিয়ে দেওয়ার কৃতিত্বটা তাঁরই। ইংরেজরা যেটির জন্য ম্যারাডোনাকে কখনো ক্ষমা করেনি, এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরও নয়। সেই বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটজয়ী ইংলিশ স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকারই যেমন শোকবার্তায়ও যে খোঁচা দেওয়ার সংযম দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন।

ওই ম্যাচের গোল দুটির কথা বলতে গিয়ে ম্যারাডোনার লাতিন পরিচয় টেনে আনার কারণ আছে। লাতিন আমেরিকায় না জন্মালে ম্যারাডোনা কখনোই ম্যারাডোনা হতে পারতেন বলে মনে হয় না। ওই দুঃসাহসী মন তো সন্দেহাতীতভাবে লাতিন রক্তের উত্তরাধিকার। যার প্রকাশ শুধু ফুটবল মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফুটবলারই তাঁর প্রথম পরিচয়, কিন্তু শুধু ফুটবলের কারণেই তো আর ম্যারাডোনা ম্যারাডোনা হননি। হয়েছেন মাঠে ও মাঠের বাইরের সবটা মিলিয়েই। ফুটবলের কারণেও ম্যারাডোনাকে মানুষ মনে রাখত, কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে পুরো বিশ্ব এমন উথালপাথাল হয়ে যেত না। এই ম্যারাডোনা বল পায়ে এমন সব অত্যাশ্চর্য কাণ্ড করতে পারতেন, যাতে তাঁকে অতিমানব বলে ভুল করাটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। আবার সেই ম্যারাডোনাই মাঠের বাইরে এমন সব কাণ্ড করতেন, যা নিয়ে শিরোনাম হতো: গড, উইথ ফিট অব ক্লে। এতে ম্যারাডোনা রোল মডেল হতে পারেননি সত্যি, কিন্তু তাঁর অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে নিশ্চিতভাবেই যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা। ম্যারাডোনার মধ্যে দোষে-গুণে নিজেদের খুঁজে পেয়ে তাঁকে আরও হৃদয়ে টেনে নিয়েছে মানুষ।

বিজ্ঞাপন

নাপোলিতে খেলতে গিয়ে ইতালিয়ান ফুটবলে হরিজন সেই ক্লাবকে লিগ জিতিয়ে, ইউরোপীয় শিরোপা এনে দিয়ে অভিজাত শ্রেণিতে তুলে এনেছেন; সেখানেই আবার সখ্য গড়ে তুলেছেন ইতালিয়ান মাফিয়াদের সঙ্গে। কোকেনাসক্তির শুরু হয়তো আগে থেকেই, তবে তা চরমে ওঠে নাপোলিতে খেলার সময়েই। তাঁর ফ্ল্যাটে কোকেন রাখার দায়ে ইতালিয়ান পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হতে হয়েছে তাঁকে। মাদকাসক্তির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেই হয়তো মেজাজ–মর্জির কোনো ঠিকঠিকানা ছিল না। কখন কী করে বসবেন, নিজেও তা সব সময় জানতেন বলে মনে হয় না। সাংবাদিকদের সঙ্গে ঝামেলা তো ছিল প্রায় নৈমিত্তিক ঘটনা, যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত (নাকি কুখ্যাত) তাঁদের দিকে এয়ারগানে গুলি ছোড়া। বিতর্কের তালিকা এমনই দীর্ঘ যে, তা নিয়ে কথা বলতে গেলে এই লেখা আর শেষ হবে না।

আবার সেই ম্যারাডোনারই অন্য আরেক রূপও কি দেখেনি বিশ্ব! তাঁর বাহুতে আঁকা উল্কিতে বিপ্লবের সমার্থক চে গুয়েভারার মুখচ্ছবি। সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু সমাজতন্ত্রের প্রতীক ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে। অন্যায়–অবিচারের বিরুদ্ধে সব সময়েই সোচ্চার হয়ে উঠেছে তাঁর কণ্ঠ। ইউরোপের প্রাইম টাইমে খেলা দেখাতে মার্কিন মুলুকে ১৯৯৪ বিশ্বকাপের ম্যাচ যখন দুপুরে আয়োজন করল ফিফা, মনে মনে ক্ষোভে ফুঁসেছেন সব ফুটবলারই। কিন্তু প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছিলেন শুধু একজনই। কে কী ভাবল, তা নিয়ে একটুও চিন্তা না করে মনের কথাটা বলার আগে কখনোই দুবার ভাবেননি। পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকাটা কখনোই তাঁর অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল না।

লিখতে লিখতে মনে হচ্ছে, শুধু ফুটবলেই আটকে রাখাই–বা কেন, সব খেলা মিলিয়েই এমন চরিত্র আর কই! ভাবতে গিয়ে শুধু মোহাম্মদ আলীর নামটাই মনে আসছে। তবে বিদ্রোহী চরিত্রে আলীর সঙ্গে মেলানো গেলেও আলীর তো মাঠের বাইরে এত কেচ্ছাকাহিনি ছিল না। শেষ পর্যন্ত ডিয়েগো ম্যারাডোনা তাই এক এবং অদ্বিতীয়ই হয়ে থাকেন। যাঁকে নিয়ে জীবনানন্দের ওই কবিতার লাইনটা খুব খেটে যায়:

এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।

মন্তব্য করুন