বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

শুধু এটুকু বললে প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটা পিঠই সামনে আনে। আরেক পিঠে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ফুটবলের যুদ্ধ—আইবেরিয়ান ডার্বি। আবাহনীর কোচ পর্তুগিজ মারিও লেমোস ও মোহনবাগানের স্প্যানিশ হুয়ান ফেরান্দো—আইবেরিয়ান পেনিনসুলার দুই দেশের মানুষ। তবে ডার্বিতে নামার আগেই শক্তি হারিয়ে বসে আছেন লেমোস। বেঞ্চ থেকে বদলি নামানোর মতো ভালো খেলোয়াড় তো তাঁর হাতে নেই-ই, নিয়মিত একাদশের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দেরও পাচ্ছেন না আবাহনী কোচ।

default-image

মোহনবাগানের বিপক্ষে দলকে ৪-২-৩-১ ছকে খেলাবেন লেমোস। একাদশ সাজাতে গিয়েই যেন তিনি ঘেমে–নেয়ে একাকার হওয়ার অবস্থা। চোটের কারণে দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার দরিয়েলতন গোমেজের না খেলাটা প্রায় নিশ্চিত। তাঁর জায়গায় আবাহনীর জার্সিতে অভিষেক হতে পারে স্বাধীনতা ক্রীড়া সংঘ থেকে ধারে নেওয়া বসনিয়ার স্ট্রাইকার নেদো তুর্কোবিচের। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা রাইটব্যাক পজিশন নিয়ে। নিষেধাজ্ঞার কারণে খেলতে পারবেন না সুশান্ত ত্রিপুরা, অন্য রাইটব্যাক মনিরের চোট। উপায় খুঁজতে গিয়ে ফরোয়ার্ড মেহেদি হাসানকে রাইটব্যাকে খেলানোর কথা ভাবছেন লেমোস।

default-image

লেমোসের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণটা দিক হলো প্রতিপক্ষের পায়ে বল থাকলে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে না পড়ে আগে নিজেদের রক্ষণের সংগঠন ঠিক করা। হঠাৎ করে মেহেদি একাদশে অপরিচিত জায়গায় ঢুকে সেই কৌশলে কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় আছেই। এভাবে জোড়াতালির রক্ষণভাগ দিয়ে সর্বশেষ মৌসুমে আইএসএলে ৩৯ গোল করা মোহনবাগানকে কীভাবে ঠেকাবে, তা মনে করলেই আবাহনী–সমর্থকদের আঁতকে ওঠার কথা।

লেমোসের প্রতিপক্ষ ফেরান্দোর হাতেও নেই গুরুত্বপূর্ণ দুই ফরোয়ার্ড রয় কৃষ্ণা ও লিস্টন কোলাসো। কিন্তু তাঁর দলের শক্তির গভীরতা এত বেশি যে, কে আছে কে নেই, এ নিয়ে ভাবার তাঁর সময়ও নেই।

default-image

২০১৯-২০ মৌসুমে এটিকে মোহনবাগানকে চ্যাম্পিয়ন করে মোহনবাগান–সমর্থকদের চোখের মণি হয়ে উঠেছিলেন আন্তোনিও হাবাস। কিন্তু সর্বশেষ মৌসুমের শুরুতে খেই হারিয়ে হাবাসের সাজানো বাগান হয়ে পড়ে ছন্নছাড়া। প্রথম ৬ ম্যাচে মাত্র ৮ পয়েন্ট পাওয়ায় চাপের মুখে পদত্যাগ করে বসেন কড়া হেড মাস্টারখ্যাত হাবাস। সে চেয়ারে আরেক স্প্যানিশ ফেরান্দো বসে বাগানে ফুটিয়েছেন ফুটবল ফুল। হাবাসের শেষ দিকে জিততে ভুলে যাওয়া মোহনবাগান ফেরান্দোর অধীন হারের স্বাদ ভুলে গেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেরান্দো টানা ১৩ ম্যাচ ছিলেন অপরাজিত, এর মধ্যে জিতেছেন ৮ ম্যাচে। সব মিলিয়ে আজকের আগে ফেরান্দোর অধীন ১৮ ম্যাচে ১০ জয় ও ৬ ড্রয়ের বিপরীতে মোহনবাগানের হার মাত্র ২টি।

default-image

হাবাস ও ফেরান্দো দুজনই স্প্যানিশ হলেও খেলার কৌশল পুরোপুরি ভিন্ন। স্প্যানিশ ফুটবল বললেই যেমন ছোট পাসে আক্রমণ সাজানোর ছবি ভাসে চোখে, হাবাসের ফুটবল ডিএনএতে সেটি ছিল না বললেই চলে। রক্ষণাত্মক মানসিকতার এই কোচ ইংলিশ ফুটবলের মতো বাতাসে লম্বা পাসে খেলাতে পছন্দ করতেন। প্রতিপক্ষের গোলমুখ খুলতে পাল্টা আক্রমণই ছিল তাঁর ভরসা। আর ফেরান্দোর ফুটবল গতানুগতিক স্প্যানিশ ঢঙেরই—বল দখলে রেখে আক্রমণে ওঠো।

কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড়নির্ভর নয়, দলীয় রসায়নের ওপরেই জোর ফেরান্দোর। পরিসংখ্যান তা বলবে। আইএসএলে লিগে তৃতীয় মোহনবাগান, অথচ তাদের কেউই সর্বোচ্চ গোলদাতার ৮ জনের মধ্যে নেই।

কৌশলের ক্ষেত্রে অবশ্য ফেরান্দো অনেক নমনীয়—প্রতিপক্ষ দলের শক্তি ও নিজের দলের অবস্থান বুঝেই কৌশল সাজান ৪১ বছর বয়সী স্প্যানিশ কোচ। সাধারণত ৪-২-৩-১ বা ৪-৩-৩ ছকে খেলাতে পছন্দ করলেও বর্তমানে দলকে ৩-৫-২ ছকে খেলাচ্ছেন তিনি। আইএসএলে সর্বশেষ ম্যাচে এই ছকেই হারিয়েছেন হায়দরাবাদ এফসিকে, এএফসি কাপে প্লে-অফের প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কার ব্লু স্টারের বিপক্ষেও মোহনবাগানের ছক ছিল এটিই। লঙ্কান ক্লাবটিকে তো মোহনবাগান একেবারে উড়িয়ে দিয়েছে ৫-০ গোলে।

default-image

আজ আবাহনীর বিপক্ষেও ফেরান্দো সে একই কৌশল বেছে নিতে যাচ্ছেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তাঁর একাদশ দেখলেই বোঝা যায়, আক্রমণাত্মক মানসিকতার খেলোয়াড়দের পছন্দ করেন তিনি। নিয়মিত গোলকিপার আরমিন্দার সিংয়ের চোট থাকায় গোলপোস্টের নিচে ১৯ বছর বয়সের তরুণ আরশ সাইখ অবশ্য দেখা যেতে পারে।

এই মৌসুমে কেবল ব্লু স্টারের বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচেই খেলেছেন সাইখ। স্বাভাবিকভাবে এই গোলকিপারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অনভিজ্ঞতা। তাঁর সামনে তিন সেন্টারব্যাক হিসেবে থাকবেন ভারতীয় জাতীয় দলের দুই ডিফেন্ডার প্রীতম কোটাল ও শুভাশিস বোস, সঙ্গে থাকবেন স্প্যানিশ তিরি। নিচ থেকে পাসের মালা গেঁথে আক্রমণ শুরু হয় স্প্যানিশ ডিফেন্ডার তিরির পা থেকেই। সর্বশেষ আইএসএলে মোহনবাগানের খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯২৯টি পাস খেলেছেন তিনি। রক্ষণভাগ সামলানোতেও জুড়ি নেই তাঁর।

default-image

তবে বাকি দুজনের মধ্যে অধিনায়ক প্রীতম হলেন প্রথাগত রাইটব্যাক আর শুভাশিস হলেন প্রথাগত লেফটব্যাক। স্বভাবগতভাবেই মাঠের মাঝের অংশ ফাঁকা রেখে টাচলাইনের দুই প্রান্তে ধরে ওপরে ওঠে যাওয়ার প্রবণতা তাঁদের। এই সুযোগ কাজে লাগানোর মতো আছেন আবাহনীর কোস্টারিকান ফরোয়ার্ড দানিয়েল কলিনদ্রেস। আন্তর্জাতিক মঞ্চ কীভাবে মাতাতে হয়, এ অঞ্চলের ফুটবলে ২০১৮ বিশ্বকাপে খেলা ফুটবলারের চেয়ে সেটা আর কেই–বা জানেন! ২০১৯ সালে এএফসি কাপে কলিনদ্রেসের নেতৃত্বেই মালদ্বীপের টিসি স্পোর্টসকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল বসুন্ধরা।

ফেরান্দোর ৫ মিডফিল্ডারের একজন রাইট উইংব্যাক প্রবীর দাস। নিজের দলের আক্রমণের সময়ে তিনি বেশ ভালো হলেও প্রতিপক্ষের আক্রমণের সময় ঠিকমতো নিচে নেমে আসতে না পারার বদনাম আছে তাঁর। বাঁ প্রান্তে ২১ বছরের তরুণ কিয়ান নাসিরির খেলার সম্ভাবনাই বেশি। নিজেকে পুরোদস্তুর উইঙ্গার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে রক্ষণে তাঁর মনোযোগটা কম।

হুয়ানের রক্ষণভাগের সবচেয়ে বড় ছায়া ২৩ বছর বয়সী ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার দীপক টাংরি। মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের জন্য ত্রাস তো অবশ্যই, দল বল হারিয়ে ফেললে ট্রানজিশনের (রক্ষণ থেকে দ্রুত আক্রমণে ওঠা) সময় উইং ব্যাকদের ফেলে রাখা জায়গাও পূরণ করতে পারেন দ্রুত। আবাহনীর সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার রাফায়েল অগুস্তোর জন্য বড় হুমকি তিনিই।

default-image

মোহনবাগান দলটার প্রাণভোমরা সর্বশেষ ফিনল্যান্ডের হয়ে ইউরো কাপে খেলা মিডফিল্ডার জনি কাউকো। ফেরান্দো মোহনবাগানের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রাণ ফিরে পেয়েছে কাউকোর সৃজনশীলতা। তাঁর সঙ্গে জুটি বেঁধে মাঝমাঠ থেকে দলের খেলা নিয়ন্ত্রণ করছেন ফরাসি মিডফিল্ডার উগো বুমোস। তাঁদের সৃজনশীলতার সৌজন্যেই সর্বশেষ আইএসএলে ৮ হাজার ৮৬২টি পাস খেলেছে মোহনবাগান। এর মধ্যে বুমোসের রক্ষণ সামলানোতেও জুড়ি নেই। পুরোদস্তুর বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার।
বুমোসকে মোহনবাগান দলের হৃৎপিণ্ডও বলা যেতে পারে। টানা ৯০ মিনিট সমানতালে খেলে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়েই বলুন, আর প্রতিপক্ষের ডিবক্সে ঢুকে শট নেওয়া—সব কাজের কাজি এই মিডফিল্ডার।

default-image

ফেরান্দোর স্ট্রাইকিং জুটি অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড উইলিয়ামস ও ভারতীয় জাতীয় দলের ফরোয়ার্ড মানভির সিং। সর্বশেষ ম্যাচে ৫ গোলের ৩টি এই ফরোয়ার্ড জুটির পা থেকে। এর মধ্যে মানভিরের গোল ২টি। ফিজির স্ট্রাইকার কৃষ্ণার অনুপস্থিতিতে শুরু থেকেই খেলার সুযোগ হচ্ছে উইলিয়ামসের। গত বছর বসুন্ধরা কিংসের এএফসি কাপের আন্ত আঞ্চলিক পর্বে খেলার স্বপ্নটা ধূলিসাৎ করে দিয়েছিলেন এই উইলিয়ামসই। পরের পর্বে খেলতে বসুন্ধরার প্রয়োজন ছিল জয়। গোল করে এগিয়ে গিয়ে সে কাজ করেও রেখেছিল বসুন্ধরা। কিন্তু উইলিয়ামস গোল করে ১-১ গোলে ড্র করে মোহনবাগানকে নিয়ে যান পরের রাউন্ডে। তাঁর সঙ্গী মানভির আছেন দুর্দান্ত ছন্দে। আইএসএলেও এবার ৬ গোল করেছেন ভারতীয় ফরোয়ার্ড।

default-image

তবে আজ বোধ হয় ফেরান্দোর সবচেয়ে বড় শক্তি সল্টলেকের ৫০ হাজারের ওপর দর্শকের উপস্থিতি। তাঁদের মোহনবাগান, বাগান...গর্জনে নাবিব নেওয়াজ, টুটুল হোসেনদের কান ধরে যাওয়ার মতো অবস্থা হতে পারে। তবে ২০১৯ সালে এই মাঠে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ বাছাইয়ের বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে যেভাবে ‘লেটস গো ইন্ডিয়া’ গর্জন থামিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ, আজ মোহনবাগানকে এলোমেলো করে দিতে আবাহনীর প্রেরণা হতে পারে সেটিই। সেদিন জিততে জিততে শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে ১-১ গোলে ড্র করেছিল বাংলাদেশ, আজ আবাহনীর সমর্থকেরা চান জয়।

ভুল! পুরো বাংলাদেশই চায় ভারতের ক্লাবের বিপক্ষে ফুটবল মাঠে জয় হোক বাংলাদেশের ক্লাবের। আবাহনী-মোহনবাগানের আড়ালে ম্যাচটি যে বাংলাদেশ-ভারতেরও!

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন