default-image

বাংলাদেশের ফুটবলে কোনো তারকা নেই। এ দেশের ফুটবলে এমন একজনও খেলোয়াড় নেই, যাঁর খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে ভিড় করবেন দর্শকেরা-এমন কথাবার্তা বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে চাউর বেশ অনেক দিন ধরেই। সালাউদ্দিন, সালাম, বাদল রায়, আশীষ ভদ্র, আশরাফউদ্দিন চুন্নু কিংবা ওয়াসিম, রুমি, সাব্বিরদের খেলা দেখতে দর্শকেরা যেভাবে স্টেডিয়ামে আসতেন, আজকের ফুটবলে তেমন একজন তারকার অনুপস্থিতিই বাংলাদেশের ফুটবলকে পিছিয়ে দিয়েছে বলে ধারণা অনেকের। এমন ধারণা সত্য হলেও হালে পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। জাতীয় ফুটবল দলে এমন বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় আছেন, যাঁরা বাংলাদেশের ফুটবলে তারকা-খরা ঘোচাতে আবির্ভূত হতে পারেন ত্রাণকর্তা হয়েই।
বাংলাদেশের ফুটবলে যাঁদের সত্যিকারের তারকা হিসেবে অভিহিত করা হয়, এঁদের বেশির ভাগেরই খেলা এই প্রজন্ম দেখেনি। সত্তর-আশি-নব্বইয়ের দশকে প্রযুক্তিগত দুর্বলতা থাকার কারণে সালাউদ্দিন, সালাম, বাদল রায়দের খেলা কোনো মাধ্যমেই সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের আর্কাইভে এই তারকাদের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য সংরক্ষিত আছে কি না, সে প্রশ্ন উঠলেও বিটিভি যে তার আর্কাইভ সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করবে না, সেটা ধরেই নেওয়া যায়। সালাউদ্দিন, সালামদের খেলার বিষয়ে এই মুহূর্তে ভরসা বলতে কেবল ক্রীড়াপ্রেমীদের ভাঙা ভাঙা স্মৃতিই।
১৯৯৯ সালে সাফ গেমসে সোনা জিতেছিল বাংলাদেশ। ২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দক্ষিণ এশীয় শ্রেষ্ঠত্ব নিজেদের করা গিয়েছিল। গৌরবদীপ্ত এই দুটো স্কোয়াডের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ই বলতে গেলে এ দেশের ফুটবলের শেষ প্রজন্মের তারকা। জুয়েল রানা, আমিনুল হক, আলফাজ আহমেদ, আরিফ খান জয়, মতিউর মুন্না, হাসান আল মামুন কিংবা রজনী কান্ত বর্মণদের পর দীর্ঘ একটা বন্ধ্যা। মামুনুল ইসলাম, জাহিদ হোসেন, জাহিদ হাসান এমিলি, হেমন্ত ভিনসেন্ট বিশ্বাস, রায়হান হাসান, জামাল ভূঁইয়ারা এই দীর্ঘ বন্ধ্যা কাটিয়ে ওঠার পথে দারুণ কিছু সংযোজন-এ কথা কিন্তু বলে দেওয়াই যায়।
মামুনুল-এমিলি কিংবা জাহিদদের কথা আপাতত ঊহ্য থাক। বেশ কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় এরা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মোটামুটি তারকাই। হালে ইন্ডিয়ান সুপার লিগে অ্যাটলেটিকো ডি কলকাতার হয়ে মাঠের বাইরে বসে থাকলেও মামুনুলকে কিন্তু অ্যাটলেটিকো দলে নিয়েছিল তাঁর তারকাখ্যাতির বিচারেই। এমিলি, জাহিদও ফুটবলার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু দেশের মানুষ এবারের বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে অবাক বিস্ময়ে উপভোগ করছে বেশ কয়েকজন তরুণ-তুর্কির ফুটবল। এঁদের সবার মধ্যেই কিন্তু হাল আমলের জনি, সাব্বির কিংবা ওয়াসিম ইকবাল হয়ে ওঠার সব গুণাবলিই আছে। রায়হানের কথাই ধরুন। পার্শ্ব রেখা থেকে রায়হান প্রতিপক্ষের গোলমুখে যে লম্বা লম্বা থ্রোগুলো ফেলেন, সেটা কিন্তু অসম্ভব উপভোগ্য এক ব্যাপারই। অতীতের আবুল হোসেন কিংবা আলমগীর হোসেনদের লম্বা থ্রোগুলো এ দেশের ফুটবলপ্রেমীরা দেখেছেন, রায়হানকে কিন্তু এঁদের চেয়ে কোনোভাবেই পিছিয়ে রাখা যায় না। আরেকটা কথা বলে রাখা ভালো, রায়হান কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলের বয়সভিত্তিক পাইপলাইনের অন্যতম আবিষ্কার। বয়সভিত্তিক প্রায় প্রতিটি ধাপ পেরিয়েই জাতীয় জাতীয় দলে আবির্ভূত তিনি। ডেনমার্কপ্রবাসী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলার জামাল ভূঁইয়ার নৈপুণ্য ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে সবার। ডেনিশ লিগের একটি বিশেষ টায়ারে খেলা জামাল এই মৌসুমে নাম লিখিয়েছেন বাংলাদেশ লিগে। বঙ্গবন্ধু কাপে তাঁর যা পারফরম্যান্স, তাতে কেবল জামাল ভূঁইয়ার খেলা দেখতেই যে ঢাকার ঘরোয়া ফুটবলে দর্শকের ঢল নামবে, সেটা তো বলে দেওয়াই যায়।
হেমন্ত হালের ফুটবলে দারুণ এক আবিষ্কার। গত বছর গোয়ায় ভারতের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে আন্তর্জাতিক অভিষেক হওয়া এই হেমন্ত কিছুদিন আগে হল্যান্ডের আমস্টারডাম ফুটবল একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। প্রতিটি দিন, প্রতিটি নতুন ম্যাচে তিনি নিজেকে নিয়ে যাচ্ছেন অন্য উচ্চতায়। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে তাঁর দুর্দান্ত গোলটি অনেক দিন স্মৃতিতে ধারণ করবেন এ দেশের ফুটবলপ্রেমীরা। বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন সেনসেশন হয়ে ওঠার প্রাথমিক কাজটা হয়েই গেছে, হেমন্তর এখন কেবল প্রস্ফুটিত হওয়ার পালা। ফুটবল মাঠে দর্শক টেনে আনার ক্ষমতা আছে এই হেমন্তরও।
আরও অনেকেই তারকা হয়ে উঠতে পারেন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পেনাল্টি ঠেকানো দীর্ঘদেহী গোলরক্ষক শহীদুল আলম সোহেলের দিকে কিন্তু নজর আছে দর্শকদের। একজন বিকল্প কানন-মহসিন কিংবা বিপ্লব-আমিনুল খুঁজে ফেরা ফুটবলপ্রেমীদের কাছেও তিনি হয়ে উঠতে পারেন দারুণ এক তারকা। থাইল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করে ঘরে ঘরে উচ্চারিত নাম নাসির। এই ম্যাচের আগে তাঁকে চিনতেন কজন? দর্শকেরা নিশ্চয়ই এখন ঘরোয়া ফুটবলেও মাঠে যাবেন নাসিরের পা থেকে আরও একটা গোল দেখতে।
সবকিছু জায়গামতোই আছে। এখন চাই কেবল সাফল্য। চাই বঙ্গবন্ধু কাপ জিতে এ দেশের মানুষকে এক যুগ পর ফুটবল আনন্দে মাতাতে। রায়হান-হেমন্ত-জামাল ভূঁইয়ারা কিন্তু আছেনই। এঁদের হাত দিয়ে দেশের ফুটবলের সুদিন ফিরতে বোধ হয় খুব বেশি দেরি নেই।

বিজ্ঞাপন
ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন