default-image

বাংলাদেশে ‘ক্রীড়া-তারকা’ বলতে সবাই ক্রিকেটারদেরই বোঝে। সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল, মাশরাফি বিন মুর্তজারাই এদেশের ক্রীড়াঙ্গনের মহীরূহ। বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের ফাইনালে ওঠা ফুটবলারদের সামনে এসেছে দারুণ এক সুযোগ। ঘরের মাঠে আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতাটি জিতে নিজেদের ক্রিকেটারদের উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার। দেশের ফুটবলাররাও এটা খুব ভালোমতোই জানেন। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে তাঁদের মুখেও ঘুরে ফিরে এলো এই প্রসঙ্গটিই।
থাইল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল জেতার পরপরই নিজেদের জীবনে একটা বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন এমিলি-জাহিদ-নাসির-মামুনুল-রায়হান কিংবা জামাল ভূঁইয়ারা। সেমিফাইনালের আগে টিম হোটেলে তাঁদের অবস্থান ছিল আর দশজন অতিথির মতোই। কিন্তু থাইল্যান্ডকে হারিয়ে ফেরার পর দেখলেন পারিপার্শ্বিকতাটা পুরোপুরিই পাল্টে গেছে। সবাই তাঁদের লক্ষ্য করছে। অটোগ্রাফ-ফটোগ্রাফ-সেলফির আবদার আর এদিক-ওদিক থেকে ছুটে আসা শুভকামনা আর স্তুতিবাক্য ঘিরে ধরেছে তাঁদের। সংবাদ-মাধ্যমের কর্মীদের ভীড়ে মুখ লুকিয়েও চলতে হচ্ছে অনেককে। অানুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন শেষে হোটেলে ফিরে কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফ যেমন একঅর্থে পালিয়েই বাঁচলেন। গম্ভীর মুখ করে লি​ফটের দিকে এমন গতিতে হেঁটে গেলেন যেন কাউকেই চেনেননা। ফুটবললের স্টারডম কী তবে আবার ফেরত এলো এদেশে!
একটা সময় ছিল যখন ফুটবলাররাই ছিলেন এদেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের স্বপ্নের তারকা। ফুটবল ফেডারেশনের আজকের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ছিলেন এদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় তারকা। গোটা সত্তর, আশির দশক এবং নব্বইয়ের দশকের কিছু সময় সালাউদ্দিনের মতোই তারকাখ্যাতি উপভোগ করেছেন, এনায়েত, সালাম মুর্শেদী, বাদল রায়, শেখ মোহাম্মদ আসলাম, মোহাম্মদ মহসিন, আশীষ ভদ্র, ওয়াসিম ইকবাল, কায়সার হামিদ, রিজ​ভী করিম রুমি,মোনেম মুন্না, রুম্মান বিন ওয়ালি সাব্বিররা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফুটবলের টানা ব্যর্থতা আর ক্রিকেটের বিশ্বকাপ যাত্রা আর টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তি বদলে দেয় গোটা দৃশ্যপটই। ফুটবলাররা চলে যান পেছনের বেঞ্চিতে, আর ক্রিকেটাররা দখল করে নেন তাদের জায়গা। কিন্তু পরিস্থিতি বোধহয় আবার ঘুরে যেতে বসেছে। বঙ্গবন্ধু কাপটা জিতে গেলে তারকাখ্যাতির মঞ্চে বোধহয় ক্রিকেটারদের সঙ্গে জোর লড়াইই হবে এদেশের ফুটবলারদের।
কাল ​টিম হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়ে ক্রিকেটারদের প্রসঙ্গ টানলেন অনেক ফুটবলারই। তবে তারকাখ্যাতির ব্যাপার নয়, ওটা নিয়ে তাঁরা ভাবছেন না। তাঁদের ভাবনাটা অন্য জায়গায়, ক্রিকেটারদের মতোই দেশবাসীকে আনন্দে ভাসাতে চান ফুটবলাররা। এ ব্যাপারে ডিফেন্ডার রায়হান হাসানের মন্তব্যটি প্রণীধানযোগ্য, ‘ক্রিকেটাররা এদেশের মানুষকে অনেকবারই আনন্দে ভাসিয়েছে। অনেকবার ভেবেছি, আমরা ফুটবলাররা তাদের কিছুই দিতে পারি না। কিন্তু এখন সুযোগ এসেছে দেশবাসীকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার। বঙ্গবন্ধু কাপ জিতে​ ক্রিকেটারদের মতোই আমরা আনন্দ উপহার দিতে চাই দেশের মানুষকে।’
ছয়-সাত বছর ধরে জাতীয় ফুটবল দলে খেলছেন অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম। কাল হোটেল সোনারগাঁওয়ের লবিতে দারুণ এক উপভোগ্য সময়ের মুখোমুখি হলেন ​জাতীয় দলের অধিনায়ক। ছবি তোলার আবদার মেটাতে হল তাঁকে। এটা খুব বিশেষ কিছু না হলেও এক ভক্ত তাঁর শিশুপুত্রকে মামুনুলের কোলে তুলে দিয়ে যা বললেন, তাতে তো মন ভরে যাওয়ার কথা মামুনুলের। ভক্ত তাঁর শিশুপুত্রকে বললেন, ‘বাবা খুব ছোটবেলায় এই লবিতেই কায়সার হামিদ, রুম্মান বিন ওয়ালি সাব্বিরদের কোলে চেপে ছবি তুলেছি। আজ তুমি ছবি তুলছ কায়সার-সাব্বিরদের যোগ্য উত্তরসূরির কোলে উঠে।’ মামুনুল কেন, আশেপাশের অনেকেই একটু আবেগাক্রান্ত হয়ে গেলেন। ছবি তুলে সংবাদকর্মীদের দিকে ফিরে মামুনুল বললেন, ‘এমন ভালে​বাসার প্রতিদান না দিয়ে কী পারা যায়?’
জাহিদ হাসান এমিলির কথাই ধরুন। এই মুহূর্তে শুধু বাংলাদেশেই নয় গোটা উপমহাদেশেরই অন্যতম অভিজ্ঞ ফুটবলার তিনি। দশ বছর ধরে জাতীয় দলে নিয়মিত। খেলেছেন ষাটের মতো আন্তর্জাতিক ম্যাচ। কিন্তু ক্যারিয়ারের প্রায় সিংহভাগ সময়েই পর্দার আড়ালেই থেকে যেতে হয়েছে তাঁকে। কোনো দিন সাকিব-মুশফিকদের সঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়নি এক নিঃশ্বাসে। ব্যাপারটা মন ভারাক্রান্ত তাঁর সবসময়ই করে। কিন্তু মনের গহীনে একটা হীনমন্যতা তাঁকে সব সময়ই কুড়ে খেয়েছে, দেশের মানুষকে বলার মতো কিছু দিতে পারেননি তিনি। কাল হোটেলে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এবার দেশবাসীকে কিছু দিতে চাই। আমরা তো তাঁদের বলার মতো কিছুই দিকে পারলাম না।, ‘দশ বছরে দেশবাসীকে কী দিয়েছি? কিছুই নয়। এই মুহূর্তে যে সুযোগ হাতে এসেছে, সেটা হয়ত ক্যারিয়ারে আর কোনো দিন আসবে না। এই সুযোগ হেলায় হারাতে চাই না। দেশবাসীকে আনন্দে ভাসাতে চাই।’
জাহিদও বলছেন একই কথা। একই কথা জামাল ভূঁইয়া, নাসির চৌধুরী, ইয়াসিন খান, ইয়ামিন মুন্না, গোলরক্ষক শহীদুল আলম সোহেল—প্রায় সবারই। দেশের মানুষকে আনন্দে ভাসাতে চান। ক্রিকেটাররা যেমন ভাসান প্রায়ই। সেটা শরীরের শেষ রক্ত-বিন্দু দিয়ে হলেও। এমন সুযোগ আবার কবে আসবে কে জানে!

বিজ্ঞাপন
ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন