বিজ্ঞাপন
default-image

অথচ ফুটবল যাত্রাটা এতটা মসৃণ ছিল না জর্জিনিওর। কিন্তু ফুটবল ক্যারিয়ারটাকে বাঁচিয়ে রাখতে লড়াই করতে হয়েছে জর্জিনিওকে। তাঁর ফুটবলে আসা মা মারিয়া তেরেসা ফ্রেইতাসের উৎসাহে। ফ্রেইতাস নিজে ফুটবল খেলতেন এবং নিজের প্রতিভাটা তিনি ছেলে জর্জ ফ্রেল্লো ফিলিও, যিনি জর্জিনিও নামে বেশি পরিচিত, তাঁর মধ্যে সঞ্চালন করেছেন।

নিজের ফুটবলার হওয়ার ইচ্ছা বাঁচিয়ে রাখতে জর্জিনিওকে তাঁর শহর থেকে ১০০ মাইল দূরে পাড়ি জমাতে হয়েছিল। সেখানে তিনি আরও ৫০ বালকের সঙ্গে সঙিন এক ক্রিকেট একাডেমি গুয়াবিরুবা স্পোর্টস সেন্টারে ফুটবল খেলতেন। দিনে তিনবার একই খাবার দেওয়া হতো সেখানে। কখনো কখনো লড়াই–ক্লান্ত জর্জিনিও ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার কথাই ভেবেছিলেন। তবে সেখানে কষ্ট সহ্য করে থেকে যাওয়ার পুরস্কার জর্জিনিও পেয়েছেন ১৫ বছর বয়সে। ইতালির ক্লাব হেল্লাস ভেরোনা জর্জিনিওর সঙ্গে চুক্তি করে।

default-image

ইতালিতেও জীবন অতটা সহজ ছিল না। সপ্তাহে মাত্র ২০ ইউরো করেই পেতেন। একবার তো চিরজীবনের জন্য ফুটবলটাই ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন জর্জিনিও। তবে কিছুদিন পর আর্থিক সংকট কেটে গেলে জর্জিনিও তাঁর প্রতিভার ঝলক দেখাতে শুরু করেন ভেরোনায়। সাবেক কোচ আন্দ্রেয়া মান্দোরলিনির যত্নে নিজেকে একজন দক্ষ পেশাদার ফুটবলার হিসেবে গড়েও তুলতে পেরেছেন জর্জিনিও।

জর্জিনিওর সেই সময়টার কথা এখনো মনে আছে মান্দোরলিনির, ‘আমি প্রথম যখন ওকে দেখি, খুব পলকা ছিল। এমন মনে হতো যে ও বাতাসের সঙ্গে উড়ে যাবে।’ এরপর জর্জিনিওর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠাও চোখের সামনেই দেখেছেন মান্দোরলিনি, ‘তা যা–ই হোক, ও কঠিন পরিশ্রম আর আত্মত্যাগের মাধ্যমে প্রথমে সামর্থ্যবান হয়ে ওঠে। এখন তো ও অসাধারণ এক খেলোয়াড়।’

default-image

জর্জিনিও একদিন যে এমন শিখরে পৌঁছাবেন, সেটা আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন মান্দোরলিন, ‘এটা ওর প্রাপ্যই ছিল। আমি সব সময়ই বিশ্বাস করতাম যে একদিন ও শীর্ষ খেলোয়াড়দের একজন হবে। ওকে যেভাবে খেলতে বলা হতো, সেভাবে খেলেই কোচকে সন্তুষ্ট করত।’

সিনিয়র ক্যারিয়ারেও শুরুর দিকে সমালোচনাই বেশি সইতে হয়েছে জর্জিনিওকে। কিন্তু সেটা তাঁর প্রাপ্য ছিল না বলেই মনে করেন মান্দোরলিনি, ‘আমি মনে করি, ওর সমালোচনা করাটা অন্যায্য ছিল। সে হয়তো ঝলক দেখানো খেলোয়াড় নয়, কিন্তু দলে ওর গুরুত্ব অনেক। এটা ওর খেলার সহজ ধরনের জন্যই। জর্জিনিও যে কারও সঙ্গেই খেলতে পারে। ও খুব প্রতিভাবান আর বিনয়ী। যেকোনো কোচের অধীনে যেকোনো পদ্ধতির খেলার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য আছে ওর।’

default-image

ভেরোনা ছেড়ে ২০১৪ সালে জর্জিনিও নাম লেখান নাপোলিতে। সেই সময় একটু কষ্ট পেয়েছিলেন মান্দোরলিনি। তবে শিষ্যর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখে খুশিও হয়েছিলেন, ‘ওকে আমি আমার দলে রাখতে চেয়েছিলাম। তাই ও ভেরোনা ছেড়ে নাপোলিতে যাওয়ায় আমি একটু বিরক্ত হয়েছিলাম। আমি ওকে লুইস ভুইতনের একটি স্যুটকেস দিয়ে বলেছিলাম যে নিজের ফুটবলটা নিয়ে বিশ্বভ্রমণ করতে হবে।’

২০১৪ সালে জর্জিনিও যখন নাপোলিতে নাম লেখান, দলটির কোচ ছিলেন রাফায়েল বেনিতেজ। তবে তিনি নিজের ফুটবল নিয়ে উড়তে শুরু করেন পরের বছর থেকে, মরিসিও সারি নাপোলির কোচ হয়ে আসার পর। জর্জিনিওকে একজন প্লেমেকার হিসেবে গড়ে তোলেন সারিই। ২০১৮ সালে সারি যখন নাপোলি ছেড়ে চেলসির কোচ হয়ে যান, সঙ্গে করে নিয়ে যান প্রিয় শিষ্য জর্জিনিওকেও।

চেলসিতে জর্জিনিওর শুরুর সময়ে অনেকেই এটা বলতেন যে তিনি শুধু দলে আছেন তাঁর গুরু কোচ বলে। এমনকি সেই সময় একটা ডাকনামও পেয়ে গিয়েছিলেন জর্জিনিও—সারির ছেলে! তবে ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড চেলসির কোচ হওয়ার পরও জর্জিনিও ছিলেন নিয়মিত। এমনকি তাঁকে দলের সহ-অধিনায়ক বানিয়ে দেন ল্যাম্পার্ড।

default-image

নতুন কোচ টমাস টুখেলের অধীনে চেলসি একটা পর্যায় পেরিয়ে আরও ওপরের পর্যায়ের ফুটবল খেলছে। আর এখনই ইংল্যান্ডের ফুটবল সমর্থকেরা জর্জিনিওর দক্ষতাটা ভালো করে উপলব্ধি করতে পারছে। চেলসির সাবেক স্ট্রাইকার মার্ক হিউজ বলেছেন, ‘সে দারুণ ধারাবাহিক এক খেলোয়াড়। সে খেলাটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তার পাসিংয়ের অ্যাঙ্গলটাও দারুণ। সে এমন সব পাস দিতে পারে, যেটা প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কাছ থেকে তার খেলোয়াড়দের আলাদা করে দেয়।’

জর্জিনিওর প্রশংসা করতে গিয়ে এখানেই রাশ টানেননি মার্ক হিউজ। তিনি বলে চলেন, ‘সে ফুটবল খেলাটা বোঝে। আপনি দেখবেন যে ইতালির ফুটবলাররা খুব চতুর হয় এবং ট্যাকটিক্যালি খুব ভালো। তারা জানে, ভিন্ন পদ্ধতিতে মানিয়ে নিতে কী লাগে। কোচ কী চায়, সেটা তারা বুঝতে পারে এবং সেই অনুযায়ী খেলতে পারে।’

জর্জিনিওর পরিবার আর সাবেক কোচরা অবশ্য শুধু তাঁর খেলার কারণেই তাঁকে নিয়ে গর্বিত নন। জর্জিনিও এখনো যে মানুষ হিসেবে বিনয়ী আর অসাধারণ আছেন, এটাই ভালো লাগে তাদের কাছে। চেলসির সাবেক ডিফেন্ডার মারিও মেলচিওট বলেছেন, ‘সে এমন একজন, যে কিনা নিজের সঙ্গে আলো নিয়ে আসে। সে সব সময়ই হাসিখুশি থাকে। সে মজার মানুষ। সে আপনাকে আপন মনে করে জড়িয়ে ধরবে। সে সত্যিকারের একজন ভালো মানুষ।’

এই ভালো মানুষটা কি ইতালিতে এবারের ইউরোতে ভালো কিছু এনে দিতে পারবেন? সময়ই দেবে এর উত্তর।

ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন